Home » রাজনীতি » ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট শূন্যতার বিপদ

ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট শূন্যতার বিপদ

আমীর খসরু

Dis 3কার্যক্রম, বাস্তবায়ন ও চর্চা পর্যায়ের অভিজ্ঞতার নিরীখে যতোদিন যাচ্ছে ততোই গণতন্ত্রের ধারণা এবং সংজ্ঞাগত পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনটি সূচিত হয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যানেজার হিসেবে সরকারটিতে জনঅংশীদারিত্ব কতো বেশি সম্ভব থাকবে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই। বহুদিন ধরে এই পর্যায়টি চলছে। ক্ষুদ্র রাষ্ট্র থেকে এ ব্যবস্থাটি যতোই বড় হতে শুরু করে ততোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তনপরিবর্ধন সূচিত হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা বা রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই জনঅংশীদারিত্বের প্রশ্নটির ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থাটি বড় আকারে সামনে চলে আসে। আর প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার নানা সুফলের সাথে বেশ কিছু কুফলও জনগণকে মোকাবেলা করা শুরু করতে হয়। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার প্রথমদিককার রাজনীতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরাই এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থাটি অধিকাংশের শাসন ব্যবস্থা না হয়ে আবার সেই স্বল্পসংখ্যকের শাসনেই পরিণত হচ্ছে। দিন যতো গেছে ততোই প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থাটি আসলে কতিপয়ের শাসনে পরিণত হয়েছে। আর যতোটা না এটা পরিণত হয়েছে এর উদ্যোক্তাদের কারণে, তার চেয়েও ঢের বেশি এর বাস্তব প্রয়োগকারী শাসকদের কারণে। প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থাটি যখন পুরো মাত্রায় ভোট বা নির্বাচনকেন্দ্রীক হয়ে পড়েছে তখনই চলমান প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বনাশের সূচনা। নির্বাচনই শেষ কথা নয়, নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ বা ওই ব্যবস্থা শুরুর দুয়ার মাত্র। এ কথা বহুবার আলোচনা করা হয়েছে যে, পুরো গণতান্ত্রিক হতে গেলে মানুষের বিভিন্ন অধিকারের সাথে সাথে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, শাসন ব্যবস্থা সবার জন্য এক এবং অভিন্নসহ বিচার প্রার্থী, আইনের শাসনের বিষয়কে নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিতে জনঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য শাসন কাঠামোয় ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। এই ভারসাম্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার। এ জন্য শাসকদের চিন্তাচেতনার বিশালত্ব এবং মেধামননের পরিপক্কতা যেমন প্রয়োজন তেমনি তাদের মনোজগতে কতিপয়ের বা একার শাসনের বিষয়টি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর ব্যতিক্রম হলেই পুরো ব্যবস্থাটি পুরোমাত্রায় উল্টোপাল্টা এবং গোলমেলে হয়ে পড়ে, গণতন্ত্র স্বাভাবিক কারণেই বিদায় নেয়। এমনটা যদি হয় তা হয়ে পরে ভারসাম্যহীনতার এক চরম পরিস্থিতি।

বাংলাদেশে এই ভারসাম্যহীনতার পরিস্থিতিটি সৃষ্টি করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকদিন ধরে। শাসকদের পক্ষ থেকে এই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির নানাবিধ চেষ্টা এবং কলাকৌশল প্রয়োগ ও অধিকতর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এই অবস্থাটি এখনো জারি রয়েছে। ভারসাম্যহীনতার চেষ্টাটি হয়েছে কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মাথায় রেখে বিরোধী মত, পথ, পক্ষ ও দলকে বিনাশ ও নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার মধ্যদিয়ে। নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুয়ারে প্রবেশের প্রথম ধাপ অর্থাৎ সেই নির্বাচন ব্যবস্থাটিকেই অকার্যকর করার মধ্যদিয়ে মন্দের ভালো যে নির্বাচনী ব্যবস্থাটি ছিল তা পুরোপুরি বিদায় করে দেয়া হয়েছে। আর এই বিদায়ের মধ্যদিয়ে প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীলতা অনিবার্যভাবে বিদায় নিয়েছে।

এর ফলে সৃষ্ট ভারসাম্যহীনতা এবং ভারসাম্যহীনতার কারণে বিশাল যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন মোকাবেলা করতে হচ্ছে ওই শূন্যতা সৃষ্টিকারীদেরই। সাধারণ মানুষ অবশ্য এই শূন্যতা সৃষ্টির বিপক্ষে মানসিকভাবে অবস্থান নিয়ে রেখেছেন। কারণ এই ভারসাম্যহীনতাজনিত শূন্যতা সৃষ্টির যে কলাকৌশলগুলো অর্থাৎ বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, গণপিটুনি, খুন, হত্যাসহ বিচারহীনতা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতির শিকার হয়েছেন নিদারুণভাবে। তবে এটা ইতিহাসের শিক্ষা যে, শূন্যতা বলে কিছু থাকে না, অর্থাৎ শূন্যতা থাকতে পারে না। অধিকাংশ মানুষের জন্য ভালো হোক বা মন্দই হোক শূন্যতা যেকোনো পন্থায় বা পদ্ধতিতে পূরণ হয়ে যায়। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির আছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতাজনিত শূন্যতা তৈরি হওয়াটা এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। ভারসাম্যহীনতা যখন সৃষ্টি হয় তখন ওই ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টিকারী এবং এর উদ্যোক্তারা এই ভেবে সন্তোষ প্রকাশ করে যে, পুরো শাসন ব্যবস্থার কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নিরঙ্কুশ হয়েছে। যখন চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে শূন্যতার সৃষ্টি হয় তখন শাসক বা শাসকবর্গ অধিকতর আনন্দিত, উৎফুল্ল হয় এই ভেবে যে, তার বা তাদের সামনেপেছনে, ডানেবামে তিনি বা তারা ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হচ্ছে এই, তারা কখনো এমনটা ভাবে না যে, শূন্যতা কতো ভয়াবহ এমনকি তাদের নিজেদের জন্যও। ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে যে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও লোভ পায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং অনিবার্য কারণে।

দুই.

এতোক্ষণ যে আলোচনা হয়েছে তা ইতিহাসের পাঠ এবং ইতিহাসেরই শিক্ষা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়াবলী এবং ব্যবস্থা বিশ্লেষণেও দেখা যায়, এই ধরনের একটি ভারসাম্যহীনতাজনিত শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনো ক্ষমতাসীনদের অনেকেই মনে করছেন ভিন্নভাবে। তাদের ধারণা, দেশে স্থায়ীভাবে একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং এই স্থিতিশীলতা তারা যতোদিন পর্যন্ত চাইবেন, ততোদিন পর্যন্তই চলবে। সে মতে, উচ্চকিত কণ্ঠে তারা বক্তৃতাবিবৃতিও দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক ভারসাম্য না থাকলে যে সংকটগুলো দেখা দেয় তার লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কিছুকাল আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে এবং বর্তমানে তা বেশ স্পষ্টই বলা যায়। চোখকান খোলা যেকোনো সচেতন মানুষই এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বুঝতে পারবেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকায় এখন নিজেরাই নিজেদের সাথে বিরোধিতায় নেমেছেন। ক্রসফায়ারের ঘটনায় আওয়ামী লীগের অবস্থান এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে বিভিন্ন দলের পারস্পরিক আক্রমণাত্মক বক্তব্যও এ থেকে আলাদা নয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গত কিছুদিন ধরে কিছু আশংকার কথা প্রকাশ্যেই বলছেন। সবশেষ তিনি ২৬ আগস্ট এক আলোচনা সভায় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন ভয়ংকর কিছু ঘটতে পারে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ না থাকলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে।হেলায় ফেলায় বসে থাকার সুযোগ নেই। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করলে অন্যরা সুযোগ নেবে। ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে দলের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে কাজ করুন’।

এর আগে আরেকদফায় সৈয়দ আশরাফ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ‘খাই খাই’ ভাব পরিত্যাগ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘১৫ আগস্টে কি আমাদের ব্যর্থতা ছিল না? বড় দল হয়েও আমরা বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। এই যে ঘটনা ঘটে গেল, গোয়েন্দারা জানলো না, পুলিশ জানলো না, তার দল জানলো না। এটা হতে পারে না। আমি মনে করি এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। এর পেছনে আছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি। আমরা তো বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। দ্বিতীয়বার যদি এ ধরনের পরিস্থিতি আসে আমরা কি পারবো? আমরা কি প্রস্তুত? আমার তো মনে হয় না। দল ক্ষমতায়? ’৭৫এ তো আমাদের দলই ক্ষমতায় ছিল। আমরা কি রক্ষা করতে পেরেছি’?

সৈয়দ আশরাফ ধীরস্থির চরিত্রের মানুষ এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রাজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনিই বোধ করি সম্ভবত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একমাত্র না হলেও অন্যতম যিনি ভারসাম্যহীনতাজনিত রাজনৈতিক শূন্যতার বিপদ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারছেন। আর পারছেন বলেই প্রকাশ্যে এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে সবাইকে সচেতন করে দিচ্ছেন।

কিন্তু সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যে সাধারণ মানুষ অসহায় এবং বিচলিত বোধ করছেন। কারণ শূন্যতা যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করেছেন তারাই যখন এমন কথা বলেন তখন অসহায়, বিচলিত, শংকিত না হয়ে কোনো উপায় নেই। এটা মনে রাখতে হবে শূন্যতা সৃষ্টির জন্য এই সাধারণ মানুষকে কোনোক্রমেই দায়ী করা যাবে না। বরং তারা সব সময় মনেপ্রাণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির বিপক্ষে এবং সৈয়দ আশরাফ যে আশংকার কথা বলছেন তা যেন সত্য না হয় তা কায়মনোবাক্যে কামনা করেন।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সময় এখনো শেষ হয়ে গেছে তেমনটা বলা না গেলেও সময় যে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে তা বলা যায়। তবে এখনো সময় আছে। সবার অংশগ্রহণমূলক একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই এর একমাত্র সমাধান। আর এর মাধ্যমেই সচল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা আবার সজিবতা লাভ করতে পারে। এটাও হতে পারে যতো দ্রুত সম্ভব সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই। কিন্তু সৈয়দ আশরাফের আশংকা প্রকাশের মধ্যে যে শংকা এবং উদ্বেগ আছে, তা বোঝার বোধবুদ্ধিটুকুও ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এ বেলায় এসে আর অবশিষ্ট আছে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েই গেছে।।