Home » শিল্প-সংস্কৃতি » সিনেমার প্রতিবাদী কিংবদন্তী – ওরসন ওয়েলস (প্রথম পর্ব)

সিনেমার প্রতিবাদী কিংবদন্তী – ওরসন ওয়েলস (প্রথম পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

Last 6হলিউডের সিনেমা জগতে ওরসন ওয়েলস একজন কিংবদন্তীর নাম। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই শুরু করেছিলেন তার অভিনীত এবং পরিচালিত পৃথিবী বিখ্যাত ছবি ‘সিটিজেন কেন (১৯৪১)। যাত্রার শুরুতেই যিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন হলিউড এবং বিশ্ব সিনেমা জগতকে। শুধু ছবি নয়, একাধারে, মঞ্চ এবং রেডিওতেও তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় শিল্পকর্মী। শেক্সপীয়রের বিখ্যাত নাটকগুলোর অসাধারণ চিত্রায়ন করেছেন। অনেকের তোপের মুখে পড়েছেন তার বামপন্থী এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আগ্রহের কারণে। হলিউড ঘারানার বিপরীতে গিয়ে সিনেমা নির্মাণ তার জন্যে ছিলো একটি চ্যালেঞ্জেলের মতো। সবকিছু অতিক্রম করে, শেষ পর্যন্ত তিনি একজন সার্থক অভিনেতা এবং নির্মাতা হয়ে রইলেন। গত ৬ মে ছিলো তার জন্মশতবার্ষিকী। তার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৪ জুন মহান এই শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ডেভিড ওয়েলস এবং জোয়ান লরিয়ের তার চলচ্চিত্র কর্মের উপর একটি ওয়েবসাইটে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হলো।

খুব অল্প বয়স থেকেই ওরসন ওয়েলস অভিনেতা এবং চলচিত্রকার হিসেবে আবির্ভূত হন। মঞ্চ এবং রেডিওর সাফল্যের পর ১৯৩০ এর দশকেই তিনি হলিউড স্টুডিওর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং নির্মাণ করে তার প্রথম ছবি ‘সিটিজেন কেন’, যখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ। কিন্তু হলিউড স্টুডিওর প্রধানদের সঙ্গে বিভিন্ন বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়ে এবং কমিউস্ট বিরোধিদের মুখোমুখি হবার পর, ১৯৪৭ সালে তিনি পাড়ি জমান ইউরোপে। বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি এবং স্বতন্ত্রভাবে বেশকিছু সিনেমা নির্মাণের পর আমেরিকায় ফিরে আসেন ১৯৫০ এর মাঝামাঝি সময়ে। জীবনের শেষ সময়গুলো খুব একটা সার্থক না হলেও, যে তেরটি ছবি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তার মধ্যে আটটি ছবি তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখে সিটিজেন কেন (১৯৪১), দা ম্যাগনিফিশেন্ট অ্যাম্বারসানস (১৯৪১), দা লেডি ফ্রম শাংহাই (১৯৪৭), ম্যাকবেথ (১৯৪৮), ওথেলো (১৯৫২), মিস্টার আরকাদিন (১৯৫৫), পাচ অফ এভিল (১৯৫৮) এবং চিমস অ্যাট মিডনাইট (১৯৬৫)

ওয়েলস অনেক অসমাপ্ত ছবি এবং কাজ রেখে গিয়েছিলেন যেমন, মবি ডিক, কিং লিয়ার, দা মার্চেন্ট অফ ভেনিস ইত্যাদি। অনেক চিত্রনাট্য লেখায় তার সহযোগিতার খবর পাওয়া যায়। চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত ছবি, ‘মসিও ভার্দু (১৯৪৭)’ তার মধ্যে অন্যতম। এই ছবির মূল ভাবনা এবং গল্প প্রদানে তার অবদানের কথা আজও স্মরণ করা হয়। চার্লস ফস্টার কেন নামের সম্ভ্রান্ত এবং ধনশালী প্রেসকর্মী, বিক্ষুব্ধ নাবিক মাইকেল ওহারা, ক্ষতিসাধক মূলধন বিনিয়োগকারি গ্রেগরি আর্কাদিন, নিষ্ঠুর পুলিশ হ্যাং কুইনল্যানের মতো চরিত্ররা সৃষ্টি হয়েছে ওয়েলসের হাত ধরে। সৃষ্টি করেছেন, বর্বর চরিত্র ম্যাকব্যেথ, দন্ডপ্রাপ্ত ওথেলো এবং হাস্যরসাত্মক এবং বিয়োগান্তক চরিত্র জন ফাইস্টাফকে। এরকম অজশ্র চরিত্র সৃষ্টিকারী একজন সৃষ্টিশীল নির্মাতা ছিলেন ওরসন ওয়েলস। তার মতো কাব্যিক, অনুভূতিপ্রবণ এবং সামাজিক সমালোচনামূলক পরিচালক আমেরিকার সিনেমার ইতিহাসে খুব দুর্লভ।

তবে তার প্রথম ছবি, ‘সিটিজের কেন’ সর্বশ্রেষ্ঠ না হলেও, সিনেমার ইতিহাসে সব থেকে বহুল আলোচিত একটি ছবি। চার্লস ফস্টার কেন (ওয়েল) যিনি মিডিয়া মোঘল অর্থাৎ মিডিয়ায় আলোচিত একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত পত্রিকার মালিক এবং পরাক্রমশালী পুঁজিপতি উইলিয়াম র‌্যানডফ হার্স্ট ও অন্যান্য পরাক্রমশালী ধনাঢ্য আমেরিকাদের মাঝে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, কেনের জীবন, তার সময়কাল ইত্যাদি ছবিতে তুলে আনে। ছবিটি শুরু হয়েছে, ১৯৪১ সালে জাঁকালো সমাধির পাশে বিশাল বাসভবনে কেনের মৃত্যুশয্যা থেকে, যেখানে কেন তার পূর্বপরিচিতদের সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে মানুষেরা কেমন হয়, তার কথপোকথন শুরু করেন। ছবিতে অজশ্র ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করা হয়। প্রথম ফ্ল্যাশব্যাক শুরু হয় ১৮৭১ থেকে, যেখানে দেখা যায় কেনের মা কলোরেডোর একটা বোর্ডিং হাউজে যাচ্ছেন, একটা সোনার খনির বিষয়ে চুক্তির বিষয়আশয় নিয়ে। কেনের মা যিনি একজন দৃঢ়চিত্ত নারী, স্বামীর প্রচন্ড বিরোধিতার সত্তেও যিনি তার ছেলে, কেনকে পাঠাবেন দূরে, একজন শীতল, অননমনীয় চরিত্রের ব্যাংকার মি.থ্যাচারের কাছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক আঁদ্রে বাঁজা ছবিটির উপর আলোচনা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, ওয়েলস তার ছোটবেলা নিয়ে খুব আচ্ছন্ন ছিলেন। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয়, তার এই আচ্ছন্নতা ছিলো, তিনি যে রূপ বা গঠনের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন তার উপর বা সেসব চরিত্রদের উপর। আমাদের মতে সেই রূপ বা গঠন ছিলো, তার ছোটবেলার সময়কার ক্রমে বেড়ে ওঠা শিল্প উৎপাদনমুখী ও বাণিজ্যিক আমেরিকা। ওয়েলসের প্রথম দুটি ছবির (সিটিজেন কেন, দা ম্যাগনিফিশেন্ট অ্যাম্বারসানস) শুরু ১৮৭০ এর দশকে, যে দশকে আমেরিকার গ্রহযুদ্ধ শুরু হয় এবং যে দশক থেকে আমেরিকা বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে দ্রুত ক্ষমতা অর্জন করছিলো। কেনের বাবা যখন বিড়বিড় করে বলেন, ‘ব্যাংকের আইডিয়া তার ছেলের অভিবাবক হতে চলেছে’, তখন দর্শকদের বুঝতে অসুবিধা হয়না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আমেরিকানদের জীবনে তত্ত্বাবধায়ক এবং নিয়ন্ত্রণকারীর ভূমিকা অবতীর্ণ হতে চলেছে, যা তাদের বহুদূর একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।

কিন্তু ওয়েলস সত্যিই কি বিলুপ্ত আমেরিকান জীবনের প্রতি নস্টালজিক ছিলেন? ইতিহাস সচেতন ওয়েলসের এই বিশ্বাস ছিলো যে, আমেরিকা ইচ্ছে করলেই তার অর্ধগ্রামীণ জীবন, যে জীবন ছোট ছোট শহুরে জীবন আর পরিবারিক ব্যবসা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা ধরে রাখতে সক্ষম। উল্লেখিত দুটো ছবিতেই এসব জীবনের পশ্চাদপদতা এবং ক্ষুদ্রতা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, কেনের বাবা যখন বলেন, ‘এই শিশুর (শিশু কেন) দরকার শুধু ওকে পেটানো’। কেনের মা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, ‘সেজন্যেই তোমার কাছ থেকে ওকে দূরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে’। এখানে এসে বোঝা যায়, আধুনিক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ওয়েলসের ভেতর উভয়বলতা কাজ করেছে, যা তার ‘দা ম্যাগনিফিশেস্ট অ্যামবারসান্স’এ আরো স্পষ্টতা পায়। সত্যি বলতে কি, বিশশতকের আমেরিকা, শিল্পকারখানা, গাড়ি এবং অন্ধকার ঘেরা শহরের মতো ছিলো, যা বেশ ভীতিপ্রদ এবং ওয়েলস, ঐতিহাসিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই সময়ের আমেরিকার উপর গুরুত্বারোপ করেন। যা সিটিজেন কেনে তার কিছু ইঙ্গিত আমরা পাই। যেমন, দুনীর্তিগ্রস্ত মি.থ্যাচারকে কেন জানান, একজন পত্রিকার লোক হিসেবে তার অভীষ্ট লক্ষ্য হলো, কর্মজীবী মানুষের জন্যে কিছু করা, আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, আমি সেই মানুষ যে তা করতে পারে। তুমি দেখো, আমার টাকা আর যথেষ্ট সম্পদ আছে। আমি যদি এসব সুবিধাবঞ্চিতদের জন্যে কিছু না করি, অন্য কেউ না কেউ করবে। হতে পারে সে আর্থিক বা সম্পদের দিক থেকে দুর্বল। সেটা হলে, আরো বেশি খারাপ হবে’। ছবির অনেক পরের দিকে, কেনের অনেকদিনের বন্ধু এবং সহযোগী জেড লেলান, মদ্যব অবস্থায় কেনকে সতর্ক করেন , ‘তোমার সুবিধাবঞ্চিতরা যখন একত্রিত হবে, তখন তাদের সুবিধাগুলো, তাদের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে। আমি জানিনা, তুমি তখন কি করবে। হয়তো কোনো দ্বীপে চলে যাবে, যেখানে বানরদের রাজা হয়ে বসবে’।

চার্লস কেনের ভাবাবেগের প্রয়োজনগুলো অর্থনীতি আর সম্মানের বেদির উপর বলি দিতে হয় যা ছবির মূল সুর। কেন ধীরে ধীরে বস্তুসামগ্রী বা মানুষের মালিক হয়ে উঠতে থাকলেন। ছবির শেষে বেশকিছু পাথর, যা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, সেসব পাথরের অন্তমিল খুঁজে বেড়ান, যা আমেরিকান স্বপ্নের চমৎকার এক রূপক আকারে প্রকাশিত হয়। টাকার পাহাড় গড়ার পেছনে আমেরিকানরা কেবলই ছুটছে, যে স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন থেকে তারা নিস্তার পায় না। ছবিটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের এক সমব্যাথাহীন নায়কের উপস্থাপন ঘটায়। একটা দৃশ্যে কেন, বার্নস্টাইনকে বলেন, ‘আমি যদি অর্থশালী না হতাম, তাহলে অবশ্যই একজন বড় মাপের মানুষ হতে পারতাম’। এসব সত্তেও হার্স্ট তার ক্ষমতা দেখানোর জন্যে সিটিজেন কেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং ব্যর্থ হন, ছবির যে অংশটি কখনো জনসম্মুখে দেখানো হয়নি। মার্চ, ১৯৪১, এফ.বি.আই. এর একটি রিপোর্টে লেখা হয়, ‘সিটিজেন কেন, ছবিটি আর কিছুই না, শুধু কমিউনিস্ট মতবাদের একটি প্রচারণা, যে মতবাদ আমেরিকার বিরুদ্ধে যায়’।।

(চলবে…)