Home » অর্থনীতি » আইন ভেঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের নির্বিচার মূল্যবৃদ্ধি

আইন ভেঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের নির্বিচার মূল্যবৃদ্ধি

এম. জাকির হোসেন খান

Dis 3ক্ষমতাসীনরা কথায় কথায় আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার কথা বললেও কোনো প্রকার স্বচ্ছতা ছাড়াই গত জানুয়ারিতে গ্যাসবিদ্যুতের বাতিল হয়ে যাওয়া গণশুনানিকে ভিত্তি করে, গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনা না করে, একতরফাভাবে বিদ্যুতের দাম ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং গ্যাসের দাম ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের ৩৪() ধারায় বলা হয়েছে, ‘লাইসেন্সী ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিস্তারিত বিবরণসহ, কমিশনের নিকট উপস্থাপন করিতে পারিবে এবং কমিশন, আগ্রহী পক্ষগণকে শুনানী দেওয়ার পর, ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাবসহ সকল তথ্যাদি প্রাপ্তির ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে আদেশ দিতে হবে’। জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ প্রস্তাবের ব্যাপারে কমিশন তাদের মূল্যায়ন প্রতিবদনে বলেছিলো, দাম বাড়ানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। তাহলে কোন যুক্তিতে এখন দাম বাড়ানো হলো তার কোনো ব্যাখ্যা তারা দেয়নি। এভাবেই দুদকের ন্যায় বিইআরসিকেও দলদাসে পরিণত করা হয়েছে। জানুয়ারিএপ্রিল সময়ে বিরোধী জোটের আন্দোলন কর্মসূচী থাকায় ক্ষমতাসীনদের আশংকা ছিল যে, দাম বৃদ্ধি করলে নাগরিকরা বিরোধীদের প্রতিবাদ বিক্ষোভে জড়িত হবে তাই সরকার তখন বিরত থাকে দাম বৃদ্ধি হতে। আর এখন তো বিরোধী দল আরো কোনঠাসা। আর এ সুযোগে হঠাৎ করেই গ্যাসবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হলো।

সরকার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও গত এক বছরে তা ১২০ ডলার থেকে নেমে প্রতি ব্যারেল এখন ৫০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। একটি হিসাবে বলা হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সরকার শুধু অতিরিক্ত রাজস্ব পাবে চার হাজার ১২১ কোটি টাকা। ক্ষমতাসীনরা আরো যুক্তি দিচ্ছে যে, আগের বছরগুলোর লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তেলের দাম কমানো হয়নি। অথচ বাস্তবতা হলো, যে বছরগুলোতে লোকসান দেখাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা সে বছরগুলোতে কি পরিমাণ শুল্ক আদায় হয়েছে তার হিসাব কিন্তু দিচ্ছেনা। তেলের দাম না কমিয়ে সরকার নগদ আয়ের দিকে নজর দিলেও দাম কমিয়ে বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য করে হ্রাসকৃত দাম নির্ধারণ করলে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও জীবনযাত্রার ওপর যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব গুণিতক আকারে পড়তো তা ‘বাঘা বাঘা’ অর্থনীতিবিদ সমৃদ্ধ ক্ষমতাসীনরা বুঝতেই পারলোনা তা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য। উল্লেখ্য, ২০১৩১৪ সালে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ২০১৪১৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ বছরেই ১৬ হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে সরকারের। তাছাড়াও রিফাইনারি শিল্প এতদিন কেনো না করে পরিশোধিত তেল আমদানিতে অধিক অর্থ ব্যয় করলো তার জবাব নেই। আর বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ার কথা বললেও জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলে অনায়াসে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব ছিল।

বিইআরসি আইন অনুযায়ী, যদি কোন কোম্পানি লাভে থাকে তাহলে সেই কোম্পানি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না। অথচ বর্তমানে সবগুলো গ্যাস বিতরণ কোম্পানি এবং পিডিবি লাভে থাকলেও তা ধামাচাপা দিয়ে দাম বৃদ্ধির কাজটি করেছে। যখন কোন কোম্পানি লাভে রয়েছে তখন কমিশনের আইন অনুযায়ী দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো বা সরকার কমিশনের অনুমোদন ব্যাতীত গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে না। শুধুমাত্র একটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেই হঠাৎ দাম বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। উল্লেখ্য, দাম বৃদ্ধিকে যৌক্তিক করার জন্য বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করতে কুন্ঠাবোধ করেনি পিডিবি। পিডিবি’র বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবে ৮৮ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে সবগুলো কেন্দ্র গড়ে ৮৮ শতাংশ হারে বা সময় চলবে বলে দাবি করলেও একই পিডিবি আগের বার দাম বাড়ানোর সময় ৭০ শতাংশের মধ্যে প্লান্ট ফ্যাক্টর থাকার কথা বলেছিল। উল্লেখ্য, যে সংবাদ সম্মেলনে স্বনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম আবারো বাড়ার প্রস্থাব করলো একই কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে ২২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়স ২৫ থেকে ৫০ বছর। যথাসময়ে সংস্কার না করায় এসব কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে’। তাহলে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক যে, কোনটা সত্য?

প্রকৃতপক্ষে দাম বৃদ্ধির এ ঘোষণার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্প সহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে নিমজ্জিত পিডিবিকে রক্ষার নামে দুর্নীতির দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছে জনগণের কাঁধে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)’র আইনের ৩৪()() অনুযায়ী ট্যারিফ নির্ধারণ ভোক্তার স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা থাকলেও তা বিবেচনা তো করা হয়নি, উল্টো সংসদীয় কমিটি আবারো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ক্ষমতায় থাকলে বা সংবিধান অনুযায়ী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলে স্বনির্বাচিত এ সংসদ সদস্যরা কোনোদিনই এ ধরনের নাগরিক স্বার্থ বিরোধী প্রস্তাব দিতে পারতোনা। ক্ষমতাসীনরা রীতিমতো জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, অবস্থাটা অনেকটা এরকমই যে, আমি দাম বাড়াবো, পারলে দাম বৃদ্ধি ঠেকাও।।