Home » রাজনীতি » আতঙ্কের পরিবেশ, তবু আস্থা মানুষের প্রতি

আতঙ্কের পরিবেশ, তবু আস্থা মানুষের প্রতি

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 2প্রবীণ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার নতুন লেখা ‘ফ্রম টু ইকোনমিকস টু টু নেশনস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘ওই সব দিনে ফিরে গেলে (অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে) ভাবি, কিভাবে এসব কথা সেদিন বলতাম। এসব কথা বলার সময় ডানবাম চিন্তা করতাম না।কিন্তু এখন কোনো লেখা লিখতে গেলে এটি প্রকাশের আগে এক সপ্তাহ লেগে যায় এবং পাচ বার পড়ে মত দেন রওনক (তাঁর স্ত্রী)। স্বাধীন দেশের অন্য সবার মতো আমাকে আজকাল প্রতিটি শব্দ নিয়ে ভাবতে হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পাকিস্তানের শাসনামলে আমরা টেবিলে বসেই দুই ঘন্টায় যে কোনো কিছু লিখতে পারতাম’।

কথাগুলো একটু বিস্ময়কর ঠেকে বৈকি। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মতো পণ্ডিত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকেও দুই ঘন্টার লেখা সাতদিন ধরে ভাবতে হয়, স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে যথাযথ শব্দ নির্বাচন করতে হয়। কিন্তু কেন? কথাগুলো খুব ব্যাখ্যা না করলেও তিনি কি বলতে চেয়েছেন, তা বোঝা গেছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো বলছেন, যৌবনে বেশী চিন্তা না করে লিখতে পারতেন, এখন পরিণত বয়সে তা পারছেন না। কিন্তু কথাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ে মানেটা ধরতে পারলাম। পরিণত বয়সে যখন পরিপক্কতা অনেক বেশি তখনই বরং যথাযথ শব্দ প্রয়োগ তিনি করতে পারবেন অনেক বেশি আস্থার (কনফিডেন্স) সাথে। উপরন্তু তিনি বলছেন, তার দশাটা হয়েছে ‘স্বাধীন দেশের অন্য সবার মতো’। এই কথা দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, লেখা বা বলার ক্ষেত্রে খুব সাবধানী হতে হবে। অন্যথায় বিপদ আছে। অর্থাৎ অবাধ বাকস্বাধীনতা এখানে নেই। বিপদটা কোনদিক থেকে আসতে পারে?

আমরা দুটো আশঙ্কার কথা ভাবতে পারি। হয়তো মৌলবাদী জঙ্গীদের দিক থেকে বিপদ আসতে পারে। তাদের অপছন্দের লেখা হলে জীবনহানির আশঙ্কা থাকে, যেভাবে এই বছরে চার জন মুক্তবুদ্ধি লেখককে জীবন দিতে হয়েছে। দ্বিতীয় আশঙ্কাটি হচ্ছে, সরকারের দিক থেকে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বক্তব্যটি ভালোভাবে পাঠ করলে এটা বোঝা যায় যে, তিনি সরকারের দিক থেকে বিপদের কথাটাই ইঙ্গিত করেছেন।

বাকস্বাধীনতা এখন অনেকটাই সঙ্কুচিত। অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে সরকার। সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা অনুপস্থিত। তাই দেখি সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে (যিনি দৈহিকভাবে পঙ্গু, একটি পা তার নেই) চোখ বেধে, হাতে হাতকড়া দিয়ে গ্রেফতার করে ঢাকা থেকে ফরিদপুর নিয়ে যাওয়া হয়। অপরাধ কি? তিনি কিছু সমালোচনামূলক বক্তব্য লিখেছিলেন। আদালত তাকে প্রথমে জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিমান্ডে পাঠিয়েছিল। পরে চারদিকে হৈ চৈ শুরু হলে একই আদালত তাকে জামিন দিয়েছিল। অদ্ভূত আমাদের শাসন ব্যবস্থা।

গুম, খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যা যেখানে নিত্যদিনের সংবাদ সেখানে সাহস নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বলা ঝুকিপূর্ণ বৈকি। এমন পরিস্থিতিতে একটা আতঙ্ক বিরাজ করে। আতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে বাকব্যক্তিস্বাধীনতা খর্বিত হতে বাধ্য। গণতন্ত্র বলে কিছু থাকে না।

২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার ক্ষমতায় আসার কারণে প্রথম থেকেই সরকারের নৈতিক বৈধতার অভাব ছিল। যদিও আইনগত ভিত্তি হয়তো আছে। কিন্তু সরকার নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। জনপ্রিয়তাও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। যতো তারা জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছেন, ততো তারা দমনপীড়ন এবং পুলিশ, আমলা ও দলীয় মাস্তানদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। একই সাথে সরকার হয়ে উঠছে চরম কর্তৃত্ববাদী, যারা কোনো সমালোচনা সহ্য করতে রাজি নয়। এতে প্রকাশ্য নিন্দা বা সমালোচনা বন্ধ হতে পারে, কিন্তু জনগণের মনের ধুমায়িত ক্ষোভ কি নিভে যাবে? বরং প্রকাশ্য সমালোচনার সুযোগ দিলে তা শাসকদের জন্য লাভজনক। এই বোধ বর্তমান সরকারের নেই। অতীতেও ছিল না।

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্য নাট্যের কয়েকটি লাইন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক ও তুলনীয় হতে পারে। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে লেখা এই কাব্য নাটকটি। দুর্যোধন নিষ্ঠুর শাসক। তিনি দমনপীড়নের নীতিতে বিশ্বাসী। বাইরের নিন্দা বা সমালোচনা সহ্য করতে রাজি নন। তাকে উপদেশ দিচ্ছেন বুদ্ধিমান ধৃতরাষ্ট্র, বলছেন

ওরে বৎস, শোন / নিন্দারে রসনা হতে দিলে নির্বাসন / নিম্নমুখে অন্তরের গূঢ় অন্ধকারে / গভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে / নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ত তল / রসনায় নৃত্য করি চপল চঞ্চল / নিন্দা শ্রান্ত হয়ে পড়ে; দিয়ো না তাহারে / নিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারে / গোপন হৃদয় দুর্গে /’

এই গণতান্ত্রিক চেতনাবোধ ক্ষমতাসীন শাসকরা অনেক আগেই হারিয়ে বসে আছেন। তারা হয়তো খুব তৃপ্তিবোধ করতে পারেন এই ভেবে যে, রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত। এখন আর কোন বিরোধিতা বা সমালোচনা সহ্য করা হবে না। শাসক দলের এই মানসিকতা সংক্রামিত হয়েছে দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের মধ্যেও। তারা নিজেরা এখন লুটপাটে ব্যস্ত এবং লুটের ভাগ নিয়ে খুনাখুনিও চলছে সমানে। গোটা সমাজে এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছে চরম নৈরাজ্য।

কয়েকদিন আগে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হকসহ দশজন শিক্ষক। এই ঘটনায় ক্ষোভে ও লজ্জায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নামকরা লেখক ড. জাফর ইকবাল। দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বরে তিনি বলেছেন, ‘আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত ছিল’। তিনি আরও বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের ছেলেরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা করেছিল। যে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই স্লোগানের এতো বড় অপমাণ আমি আমার জীবনে কখনো দেখিনি’।

জয়বাংলা স্লোগানের আড়ালে অপকর্মের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ড. জাফর ইকবাল অধ্যাপনা ও লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে হয়তো বাস্তব জগতের অনেক কিছুই তার জানা নেই। এর আগেও এবং অন্যত্র এই রকম ঘটনা আরও ঘটেছে। জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে পিস্তল হাতে প্রতিপক্ষের উপর আক্রমণ, এমনকি শিক্ষককে মারধর করার ঘটনাও নতুন নয়। বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খল ছাত্রলীগ বা যুবলীগ তাদের অপকর্মকে আড়াল করার জন্য ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে জয়বাংলা স্লোগান। আসল ঢাল অবশ্য ক্ষমতা ও প্রশাসন। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও একটা বুলিতে পরিণত করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রের বিপরীতে নিকৃষ্ট পুজিবাদ ও দুর্নীতিলুটপাটের অর্থনীতি, গণতন্ত্রের বিপরীতে স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ভণ্ডামি ও হিন্দু সম্পত্তি দখল আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিকসামাজিকঅর্থনৈতিক চিত্র।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান যে ভীতির পরিবেশের ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেই পরিবেশ আসলেই প্রকটভাবে বিরাজমান। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপত্তার অভাব এতো বেশি যে, আমরা সর্বদাই এক আতঙ্কজনক পরিবেশের মধ্যে বাস করছি। আর যারা সেই আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে, জয়বাংলা স্লোগানটি তারাই আজ হাইজ্যাক করে নিয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং মুক্তিযুদ্ধের সেই মহান স্লোগানকে ‘অপমানের’ হাত থেকে বাচাতে হলে বিকল্প গণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুদ্বয় ঘটাতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, আজ না হোক আগামীকাল সেই অভ্যুদ্বয় ঘটবেই। পরশু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ চূড়ান্ত বিশ্লেষণে আমরা এই দেশের জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারি। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’।।