Home » অর্থনীতি » একদিকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা অন্যদিকে রফতানির স্বপ্ন

একদিকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা অন্যদিকে রফতানির স্বপ্ন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 4বাংলাদেশে এখন হয়তো না খেয়ে মারা যাবে না মানুষ। কিন্তু আধাপেটা খেয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অধিকাংশ মানুষকে। স্থানীয় পর্যায়ে করা একাধিক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক দি ইকনোমিষ্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গীন অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলছে, বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তায় নিচের সারিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইআইইউ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেক্স ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সূচকে ১০৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৯তম। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নে এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২২টি দেশের মধ্যে ২১তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যদিও সূচকে এ বছর বাংলাদেশের স্কোর গত বছরের চেয়ে দশমিক ৯ বেড়ে ১০০এর মধ্যে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪। তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তিতে করে সূচকটি প্রণয়ন করেছে ইআইইউ। এগুলো হলোক্রয়ক্ষমতা, খাবারের প্রাপ্যতা এবং খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়ার মতো দরিদ্র দেশগুলোয় উচ্চ মাত্রায় ‘খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা’ বিরাজ করছে। দেশগুলোর মানুষের আয় বাড়লে তা খাদ্যপ্রাপ্তি ও খাদ্য নিরাপত্তায় অধিক ব্যয় করতে হয়।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন বহুল আলোচিত একটি প্রসঙ্গ। প্রত্যেকটি দেশই চাচ্ছে কিভাবে তাদের নাগরিকের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ইস্যুটি আরো বেশি গুরুত্ববাহী। কারণ আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা ত্বরান্বিত করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের অবশ্যই জনগণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জনগণকে অভুক্ত রেখে আর যাই হোক কোনো দেশের সত্যিকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে না। এখন অর্থজগত হলো, খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আমরা কি বুঝি? খাদ্য নিরাপত্তা বলতে এমন একটি অবস্থাকে বুঝায় যেখানে একজন মানুষ বাজারে গিয়ে তার সামর্থের মধ্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যটি ক্রয় করতে পারে। অর্থাৎ খাদ্যের জন্য তাকে কোনো ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে না। বাজারে খাদ্যের উপস্থিতি থাকলেই জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সে খাদ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। বাজারে যেমন গুনগত মান সম্পন্ন খাদ্যের সহজলভ্যতা থাকবে তেমনি সেই খাদ্য কেনার সাধারণ মানুষের সামর্থ বা অধিকার থাকতে হবে। এই শর্তগুলোর কোনোটির অনুপস্থিতি থাকলেই তাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলা যাবে না। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সাধারণ দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সম্পৃক্ত। বাজারে যেমন কোনো পণ্যের উপস্থিতি থাকতে হবে তেমনি সেই খাদ্য ক্রয়ের সামর্থও থাকতে হবে।

শস্যে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বনির্ভর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে স্বল্প চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটা ভারসাম্যও বিরাজ করছে। তবে অনাহার, অপুষ্টি ও অনিরাপদ খাদ্য স্বনির্ভরতার পাশেই স্থান করে নিয়েছে। সরকারের তথ্যই বলছে, দেশের একচতুর্থাংশ পরিবার এখনো অনাহারে থাকছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর প্রায় অর্ধেকই অপুষ্টিতে ভুগছে। আর বাজারে প্রাপ্ত খাদ্য ও পণ্যের ৫০ শতাংশেরই বেশি নিরাপদ নয়। সব মিলিয়ে এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, ভেজাল ও মানহীন খাদ্য সরবরাহ বেড়ে যাওয়া এবং নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব ফেলেছে। এ সময় সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও তা সমতাপূর্ণ না হওয়ার কারণে খাদ্য ক্রয়ে সাধারণ মানুষের সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে খাদ্য ঘাটতি ও অপুষ্টির বিষয়টি থেকেই গেছে।

ইউএসএআইডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১১ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার খাদ্য ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার মাঝে মধ্যেই খাদ্য ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। গ্রামীণ পরিবারগুলো এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে বেশি। দেশে এখনো শিশুসহ নারীরা উচ্চ অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশই অপুষ্টির শিকার। এছাড়া ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। অন্যদিকে ১৫৪৯ বছর বয়সী ২৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী অপুষ্টির শিকার।

কয়েক বছরে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়েছে সরকার। কমানো হয়েছে অন্যতম কৃষি উপকরণ সারের দামও। সরকারের এসব প্রণোদনায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে। তবে তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে নয়। এ কারণে কমে গেছে খাদ্যের মাথাপিছু প্রাপ্যতা। খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি শ্লথগতিতে হওয়ায় খাদ্যপ্রাপ্তি অনেকটাই এখনো আমদানিনির্ভর। গত অর্থবছরে দেশে রেকর্ড চালগম আমদানি করা হয় ৫২ লাখ ৭৪ হাজার টন। এটি প্রাক্কলিত নিট খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ। এছাড়া ডালজাতীয় পণ্য, ভোজ্যতেল ও চিনির চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করা হচ্ছে আমদানি করে। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড পলিসি মনিটরিং ইউনিটও বলছে, দেশে খাদ্যশস্যের (ধান ও গম) উৎপাদন বাড়লেও কমেছে মাথাপিছু প্রাপ্যতা।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার অর্থবছরে (২০০৯১০) দৈনিক জনপ্রতি ধান ও গমের নিট প্রাপ্যতার পরিমাণ ছিল ৬০৯ গ্রাম। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪১ গ্রামে, যা দেশের ইতিহাসে জনপ্রতি খাদ্যশস্য প্রাপ্যতায় সর্বোচ্চ। এর পরের অর্থবছরগুলোয় অবশ্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এ হার। এ সময় খাদ্যশস্যের উৎপাদন ধীরগতিতে বাড়ায় মাথাপিছু খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা কমে যায়। ২০১১১২ অর্থবছরে দৈনিক জনপ্রতি খাদ্যশস্য প্রাপ্যতার পরিমাণ ছিল ৫৮২ গ্রাম ও পরের অর্থবছরেও তা একই ছিল। তবে গত অর্থবছরে দৈনিক জনপ্রতি খাদ্যপ্রাপ্তির পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৮ গ্রাম। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে ২৮ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি, যা নিট খাদ্যশস্য উৎপাদনের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০০৯১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের অন্যতম উপখাত শস্য ও শাকসবজি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশের ওপর। কিন্তু এ জোয়ার আর ধরে রাখতে পারেনি সরকার। ২০১২১৩ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোঠায় অর্থাৎ দশমিক ৫৯ শতাংশে নেমে আসে, যা চলতি অর্থবছরে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

সরকার বলছে, দেশের খাদ্য উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ বেড়েছে। এমন কি দেশ এখন খাদ্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এমন কি কোনো কোনো সময় সরকার খাদ্য রফতানির চিন্তা করছেন বলেও শোনা যায় এগুলো আসলে রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি ব্যতীত আর কিছুই নয়। কারণ বাংলাদেশ এখনো খাদ্য রফতানি করার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। কারণ দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা যায় নি। শুধু তাই,বাংলাদেশ এখনো সীমিত পরিসরে হলেও খাদ্য আমদানি করছে। বিশেষ করে বেসরকারি পর্যায়ে এখনো খাদ্য পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। আর সরকারি ভাবে খাদ্য উৎপাদনের যে পরিসংখ্যান প্রদর্শন করা হচ্ছে তার বাস্তবতা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ প্রায়শই এ ধরনের পরিসংখ্যানকে বাড়িয়ে দেখানো হয়। এটা আমাদের সরকারগুলোর একটি সাধারণ প্রবণতা যে,তারা কোনো সাফল্যের বিষয় হলে তা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাতে চায়। আর ব্যর্থতার বিষয় হলে তা কমিয়ে দেখাতে চায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সরকার আমলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে এমন একটি ধারনা প্রচার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়,বাংলাদেশ অচিরেই খাদ্য পণ্য রপ্তানি করতে যাচ্ছে এমন কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সত্যি কি আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়েছি? আমরা কি খাদ্য পণ্য রফতানি করার মতো অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি? বিশেষ করে আমরা কি সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমর্থ হয়েছি? ইচ্ছে করলে আমরা দেশের বেশির ভাগ মানুষকে না খাইয়ে রেখে খাদ্য রপ্তানি করতে পারি। কিন্তু সেটি কি উচিৎ হবে? আমাদেরকে খাদ্য পণ্য রপ্তানি বা খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করার আগে নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের নাগরিকদের অভুক্ত রেখে খাদ্য রফতানির বিলাসিতা করার কোনো মানে থাকতে পারে না। দেশে কি পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে তা নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংস্থার হিসাবে বিরাট ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন,সরকার নিজের কৃতিত্ব দেখানোর জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন খাদ্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান(বিআইডিএস) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দেশে বর্তমানে যে খাদ্য পণ্য উদ্বৃত্ত আছে তা রফতানি করার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় সেই গবেষণার ফলাফলকে উদ্ধৃত করে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে সেখানে তারা বলেছে, দেশে বর্তমানে ২৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। বংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর ২ কোটি ৬৪ লাখ টন চাল খাবার হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু বিআইডিএস তাদের গবেষণা পত্রে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর ২ কোটি ৮৬ লাখ টন চাল গ্রহণ করে। তাদের প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, সরকারিভাবে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয় তাতে উৎপাদিত খাদ্যের পরিমাণ ৫ হতে ৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেখনো হয়। অন্যদিকে, খাদ্যের ভোগ ১৫ শতাংশ কম দেখনো হয়। ফলে চালের প্রকৃত উৎপাদন এবং ভোগের মধ্যে ২০ শতাংশের মতো ব্যবধান পরিলক্ষিত। দেশের সর্বশেষ আদম শুমারি অনুসারে, মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৬৫ লাখ। একজন মানুষ দৈনিক ৪৬৩ গ্রাম চাল খাবার হিসেবে গ্রহণ করে।।