Home » প্রচ্ছদ কথা » ক্ষমতাসীনদের সব দায়ভার গিনিপিগ জনগণের

ক্ষমতাসীনদের সব দায়ভার গিনিপিগ জনগণের

শাহাদত হেসেন বাচ্চু

এক.

Coverভূমধ্যসাগর তীরে পড়ে থাকা শিশু আয়লানের নিথর দেহ আরেকবার উন্মোচন করে দিয়েছে ধনবাদী বিশ্বব্যবস্থার কূৎসিৎ চেহারা, পাশাপাশি মেলে ধরেছে পৃথিবীতে মানবতাবাদীর সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। মৃত আয়লান উপড়ে নিয়েছে দেশকালের সীমানা, খুলে দিয়েছে বন্ধ দরোজা তার দেশের অসহায় আশ্রয় প্রার্থী হাজার হাজার শরণার্থীদের জন্য। এখন দেশছাড়া মানুষরা আশ্রয় পাবেন, তারা যেখানে পৌঁছতে চেয়েছিলেন, আপাত: স্বপ্নের দেশে। পেছনে রেখে যাচ্ছেন তাদের স্বজনদের সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, লেবানন, ইয়ামেনসহ রক্তপাতময় অনিরাপদ এক বিশ্বে, যা মূলত: বিশ্ব মোড়লদের ভাগাভাগির শিকার।

বাংলাদেশেও ২০১৪ শেষ হয়েছিল, ওরকম একটি শিশু জিয়াদের করুন মৃত্যু ও নিথর মৃতদেহ নিয়ে, যা উন্মোচিত করে দিয়েছিল রাষ্ট্রের অমানবিক চেহারা। শোকাতুর অসহায় পিতাকে হাজতে পুরে দিয়ে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছিল এই রাষ্ট্রে সাধারণের কোন স্থান নেই, রাষ্ট্রটি এখন কতিপয়ের। রাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে, তখন রাষ্ট্র নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। নাগরিকদের সাথে, বিশেষ করে দুর্বল নাগরিকদের সাথে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। আরেকভাবে দেখতে গেলে রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা!

এই দেশ, এই জনগণ যা কিছু স্বপ্ন দেখেছিল ফিকে হতে সময় নেয়নি। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে তা এখন দঃস্বপ্নে পরিণত। এই দেশ স্বপ্ন দেখেছিল গণতন্ত্রের, সেটি পর্যবসিত হয়েছে বিরোধী দলবিহীন কর্তৃত্ববাদী শাসনে। অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন চলে গেছে নির্বাসনে, একদলীয় একক নির্বাচনে ভোট দেবার সুযোগটিও তারা হারিয়ে ফেলেছে। পছন্দমত প্রার্থীকে ভোট দিতে পারছেনা, অসহায় তাকিয়ে দেখছে তার ভোট ছাড়াই একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে শাসনকর্তা বনে গেছেন। একজন নয়, শ’য়ে শ’য়ে। এই দেশ আইনের শাসন চেয়েছিল, সকলের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ হবে স্বপ্ন দেখেছিল। আইনের শাসনের বদলে কায়েম হয়েছে ভয়ের শাসন। কর্তৃত্ব আর ভয় হাঁটছে হাত ধরাধরি করে। পোশাকধারীদের ক্রসফায়ারগুমঅপহরণ আর দুর্বৃত্তের ছোঁড়া গুলি, পেট্রোল বোমা, কাটা রাইফেল, আর্জেস গ্রেনেড কেড়ে নিয়েছে লক্ষাধিক প্রাণ। চিরদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে গেছে শত শত।

এই দেশ স্বপ্ন দেখেছিল ন্যায্যতারন্যায় বিচারের। শুরুতেই সে দেখেছে একদলীয় শাসনের নামে রাষ্ট্র তার হাতছাড়া হয়ে গেছে, যার মালিকানা তার হওয়ার কথা ছিল। তারপর ওই শাসককে সপরিবারে খুন করছে, উল্টে দিচ্ছে সবকিছু, কুক্ষিগত করছে জোর করে। কতিপয়ের রাষ্ট্র কতিপয়তন্ত্র কায়েম করছে। আবার ‘গণতন্ত্র’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছে – ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। শ্লোগান দিয়ে, রক্ত দিয়ে কতিপয়তন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে। এরপরেও আবার কায়েম হয়েছে তাদের পছন্দে, তাদের ভোটে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র হয়ে গেছে বিশেষ পরিবারের মা ও ছেলের। কতিপয়তন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি। মাঝখানে আবারও অসাংবিধানিক শাসন এসেছে বেসামরিক লেবাসে, এবার গোটা জনগণকে মাইনাস করে দিতে। সেখান থেকে সাময়িক মুক্তি মিললেও গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে আবারও সেই দ্বিতীয় বিপ্লবের আকাঙ্খায় একক কর্তৃত্বে, যেখানে তার কথা বলাও বারণ।

দুই.

অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহন ছাড়া একটি নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি কতটা দায়িত্বহীন হয়ে ওঠে, কর্তৃত্ববাদী শাসনই তার বড় প্রমান। এতে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে দুর্বল নাগরিকরা। সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরকার আরেকবার জনগণের ইচ্ছেকে নিষ্ঠুরভাবে উপেক্ষা করল। ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। ২০১৪ সালে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছিল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলির আবদারে। প্রতিবার দাম বাড়ানোর পেছনে একটি কুযুক্তি থাকে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কথা বলা হলেও এবার আর সেটি বলা যাচ্ছে না। কারন তেলের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্ত জনগণ এর কোন সুফল পায়নি। এরকম একটি সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত। জনগণের কোন দুরবস্থায়ই নিম্নমধ্য আয়ের খেতাবধারী এই সরকার পরোয়া করছে না। বরং ‘মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে’প্রধানমন্ত্রীর এই বাণী জনগণের পকেট কেটে ফাঁকা করে দিতে সম্ভবত: মহল বিশেষকে প্রণোদনা যুগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে গ্রাহক পর্যায়ে ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিতে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউনিট প্রতি এক টাকা বাড়লে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ক্ষেত্র ভেদে চাপ পড়ে ১০ থেকে ২৬ টাকা পর্যন্ত।

চারদলীয় জোট সরকারের সময় (২০০৫০৬) জুড়ে বিদ্যুতের সেই অসহনীয় পরিস্থিতির কথা মনে আছে সকলের। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে আশা করা হয়েছিল, ব্যবস্থার উন্নয়নে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আস্থায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে পাশ কাটিয়ে দলীয় ও পেটোয়া লোকজনদের রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ করে দেয়া হয়। সংসদে আইন করে ইনডেমনিটিও দেয়া হয়। এর ফলে তারা আইনের উর্ধ্বে চলে যায়। এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলাও যায়নি, জবাবদিহিতার তো কথাই ওঠে না। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন ও সরকারপক্ষীয় সকলেই খুশি, কারন জড়িতরা সকলেই লাভবান, জনগণ যতই চড়া মূল্য দিক।

বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এজন্যই মনে করে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম আরো বাড়ানো উচিত। এই সংসদীয় কমিটির সকলেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, যে নির্বাচনে দেশের অর্ধেক ভোটারের অংশগ্রহন ছিল না। অবশ্য জনগণের অংশগ্রহন থাকলে কাঠামোগতভাবে দুর্বল সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তে খুব যে একটা ইতরভেদ হত তা কিন্তু নয়। কমিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রয় মূল্যের ফারাকের তথ্য দিয়ে বলছে, সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে এবং এটি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে।

সংসদীয় কমিটির কাছে প্রশ্ন সরকার উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে কথাটি সত্যি, কিন্তু কার কাছে? সরকার কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিতরন কোম্পানিগুলির কাছে। আর জনগণ কেনে সরকারের উৎপাদন খরচেরও বেশি দামে। কমিটির তথ্য বিভ্রাট রয়েছে। তাদের মতে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বর্তমানে ৬ টাকা ৬৮ পয়সা এবং সরকার বিক্রি করে ৪ টাকা ৭১ পয়সা দরে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সবশেষ হিসেব অনুযায়ী সঠিক তথ্য হচ্ছে, প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা ২৪ পয়সা এবং বিতরনকারীদের কাছে সরকার বিক্রি করছে ৪ টাকা ৬৭ পয়সা দরে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার বিক্রি করবে ৪ টাকা ৯০ পয়সা আর জনগণ কিনবে ৬ টাকা ৩৩ পয়সা দরে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে ৯ পয়সা বেশি। মাঝখান থেকে লাভবান হবে বিতরণ কোম্পানিগুলি আর রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কোম্পানিগুলি।

তিন.

আর্থিক খাতের দুর্বৃত্তায়ন এক ধরনের রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা পেয়ে আসছে এই দেশে সব কালে। সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালীদের কাছের লোক বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি এদের নাগাল পায়না। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অনুযায়ী দুর্নীতিকে যেসব সংস্থার চ্যালেঞ্জ করার দায়িত্ব সেখানে বসিয়ে দেয়া হয় মেরুদণ্ডহীন, নীতিবাগীশ ও বাকসর্বস্ব মানুষদের, যারা চেয়ার টিকিয়ে রাখতে অপরাধীদের কাছে নতজানু হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেণ। দুর্বৃত্তপনার নিজস্ব ব্যাকরণ অনুযায়ী তাদের অনৈতিকতার একটি অংশের সাথে রাষ্ট্রীয়রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বলদর্পী অংশকে জড়িয়ে ফেলে। এর ফলে অনৈতিকতার একটি সবল প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সকল সরকারীবেসরকারী আর্থিক খাতে এসব দুর্বৃত্তরা প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটকে পকেটে পুরে নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখেছে, কোথাও কোন বাধা বা জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না।

যে কোন মূল্যে বিদ্যুৎ চাইএই আওয়াজ তোলার পেছনে ছিল সূদুরপ্রসারী একটি কৌশল। যে কোন মূল্যেই, টেন্ডার ছাড়া একক চুক্তিতে বেসরকারি খাতে অতিশয় চড়া মূল্যে, ব্যক্তি মালিকানায় রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে। সরকারী জমিতে, সরকারী পয়সায় ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানী সরবরাহ করে স্থাপিত রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুন যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে জনগণকে। ২০০৯ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০১৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ২৪ পয়সা। কুইক রেন্টাল থেকে যে বিদ্যুৎ আসছে তার উৎপাদন খরচ ইউনিট প্রতি ৮ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত।

এই চাপ সামলাতে একটি পোষ্য এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথাকথিত গণশুনানীর মাধ্যমে সরকার ৪ বছরে ৫ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। আর সংসদীয় কমিটিও মনে করছে বিদ্যুতের দাম আরো বাড়ানো উচিত। ভোটের বাজারে ক্ষমতাসীন দল ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন, তাদের চড়া দাম দিতে হয়নি ক্ষমতায় আসীন হতে, সেজন্যই বিদ্যুতের দামের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য। পেঁয়াজের দাম আকাশ ছুঁয়েছে আকাশ। জনগণের যতই নাভিশ্বাস উঠুক প্রধানমন্ত্রী তো জানেন, তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে! সুতরাং, হে গিনিপিগ জনগণ, সব দায়ভার যে তোমাকেই নিতে হবে।।