Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৬)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৬)

ভারতের সাথে যুদ্ধ এবং সোভিয়েত পার্টির সাথে বিরোধের বিস্তার

আনু মুহাম্মদ

Last 3বিরাট উল্লম্ফনের ওঠানামা, সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ককালেই সোভিয়েত পার্টির সাথে বিরোধ ও বিতর্ক শুরু হয়। ঠিক একই সময়ে ভারতের সাথে সীমান্ত বিরোধ থেকে যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৫০ সালে চীনের গণমুক্তি বাহিনী তিব্বত দখলে নেয়। ১৯৫৬৫৭ সালে ঐ অঞ্চলে একটি সড়ক নির্মাণ করে আকসাই চিন নামক স্থানে সীমান্ত চৌকি স্থাপন করে। এই সড়ক ও চৌকি নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত।

এর মধ্যে ১৯৫৪ সালে চীন ও ভারত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য পাঁচটি নীতিতে একমত হয়, যা পরে ‘পঞ্চশীলা নীতি’ নামে পরিচিতি পায়। এই পাঁচটি নীতি হলো: ‘() পারস্পরিক ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিষয়ে পরস্পরের শ্রদ্ধা; () পারস্পরিক অনাক্রমণ নীতি; () পরস্পরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা; () পারস্পরিক স্বার্থে সমতা ও সহযোগিতা; এবং () শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।’ এই নীতিমালার সঙ্গে পরে আরও বহু দেশ ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয়। এই নীতি সম্প্রসারিত করে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বানদুংএ এশিয়া আফ্রিকা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা হতে থাকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে, নয়া ঔপনিবেশিক থাবা থেকে কীভাবে বাঁচা যায় তার পথ অনুসন্ধান চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় উপরোক্ত নীতিমালার ওপর ভিত্তি করেই কয়েকবছরের মধ্যে ১৯৬১ সালে জন্ম নেয় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। এর নেতৃত্বে ছিলেন চীনের চৌ এন লাই, ভারতের জওহরলাল নেহেরু, ইন্দোনেশিয়ার সুকার্নো এবং যুগোশ্লাভিয়ার টিটো। সুকার্নো অবশ্য এধরনের নীতিমালার প্রস্তাব করেছিলেন আরও আগে, ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামকালেই।

ভারত ও চীনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলোচনা ভালোই অগ্রসর হচ্ছিলো। তখন ‘হিন্দীচীনি ভাই ভাই’ এই শ্লোগানটিও বেশ জনপ্রিয় ছিলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভারত ও চীনের শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হযে দাঁড়ালো তিব্বত প্রশ্ন। ১৯৫৯ সালে তিব্বতের ধর্মীয় নেতা ১৪তম দালাইলামা চীন বিরোধী বিদ্রোহে পরাজিত হয়ে লাসা থেকে পালিযে ভারতে এলেন। নেহেরু সরকার তাঁকে আশ্রয় দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটলো এবং একপর্যায়ে যুদ্ধের মুখোমুখি হলো বিশ্বের দুটি বৃহৎ দেশ। অর্থাৎ হিমালয় সীমান্তে ৩,২২৫ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিরোধ যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে থাকলেও তিব্বত প্রশ্নটি এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। চীন ১৯৬২ সালের ২০ অক্টোবর লাদাখ এবং ম্যাকমোহন লাইন বরাবর অগ্রসর হলে যুদ্ধ শুরু হয়। চীন বেশকিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ঠিক একমাস পরে নিজেরাই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ঐসব অঞ্চল থেকে সরে এলে যুদ্ধ শেষ হয়। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েরই অবস্থান ছিলো কমবেশি প্রত্যক্ষ প্রচ্ছন্নভাবে ভারতেরই পক্ষে। এরপর থেকে চীনের সাথে সোভিযেত ইউনিয়নের দূরত্ব বাড়তে থাকে, ভারতের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।

১৯৬৩ সালের ৩০ মার্চ সোভিযেত ইউনিযনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে একটি পত্র দেয়। সেই পত্রের উত্তরে চীনা পার্টি দীর্ঘ জবাব দেয়। চীনা পার্টি ১৯৫৭ ও ১৯৬০ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহিত ঘোষণা ও বিবৃতির ভিত্তিতেই বরাবর নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বিতর্কের প্রথম দিকে ভাষাও ছিলো বন্ধুত্বপূর্ণ। এই চিঠির এক পর্যায়ে সোভিয়েত পার্টিকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে: ‘বর্তমান বিশ্বের মূল দ্বন্দ্বগুলি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাগুলির অবসান হওয়া উচিত : () যে ধারণা সমাজতান্ত্রিক শিবির ও সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের শ্রেণীগত মর্মবস্তু অস্বীকার করে এবং এই দ্বন্দ্ব যে আসলে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্রগুলির বিরোধ, তা বুঝতে ব্যর্থ হয়; () যে ধারণা একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকেই স্বীকৃতি দেয় এবং যে ধারণা পুঁজিবাদী দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণী ও পুঁজিপতি শ্রেণীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব, নিপীড়িত জাতিসমূহ ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠীর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, এবং এইসব দ্বন্দ্বের ফলে যেসব সংগ্রাম দেখা দেয় সেগুলিকে অবহেলা করে কিংবা যথোচিত গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করে; () যে ধারণা অনুসারে, দেশে দেশে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লব ছাড়াই, পুঁজিবাদী দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণী ও পুঁজিপতি শ্রেণীর মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলির সমাধান হতে পারে,এবং নিপীড়িত জাতিগুলির বিপ্লব ছাড়াই নিপীড়িত জাতি ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব সমাধান হতে পারে; () যে ধারণা একথা অস্বীকার করে যে, বর্তমান পুঁজিবাদী দুনিয়ার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলির ফলে নিশ্চিতভাবেই এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি নিজেরাই তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে পড়ে, এবং যে ধারণা দাবি করে যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলির মীমাংসা, এমনকি অবসানও, ‘বৃহৎ একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলির আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা’ই সম্ভব, এবং () যে ধারণা অনুসারে, সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা দুটির মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলি ‘অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা’র মাধ্যমে নিজে থেকেই লোপ পাবে, এবং এই ব্যবস্থা দুটির মধ্যেকার দ্বন্দ্বগুলির অবসানের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য মৌলিক দ্বন্দ্বগুলিও নিজে থেকে লোপ পাবে, আর তখন দেখা দেবে এক ‘যুদ্ধহীন দুনিয়া’, সে দুনিয়ায় থাকবে শুধু ‘সর্বাঙ্গীন সহযোগিতা’।’

(চলবে…)

তথ্যসূত্র

১। আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত মহাবিতর্ক ১ম খণ্ড (সোভিয়েত ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শগত মহাবিতর্কের দলিল সংকলন), পিপলস বুক সোসাইটি, কলকাতা।