Home » রাজনীতি » জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রীর কেন কোনো আস্থা নেই

জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রীর কেন কোনো আস্থা নেই

আমীর খসরু

Dis 1ক্ষমতাসীনদের বর্তমান তত্ত্বগত অবস্থান হচ্ছে ‘অল্পস্বল্প গণতন্ত্র এবং একটু বেশি মাত্রার উন্নয়ন’। ক্ষমতাসীনদের অনেক উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বেশিমাত্রায় গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তাহলো উন্নয়ন। আর এ কারণে উন্নয়নের নানা ফিরিস্তিও দেয়া হয়। এখন ওই একই বক্তব্য ছোটখাটো নেতাকর্মীদের মুখেও শোনা যায় এবং এটি সম্ভবত সংক্রমিত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের সর্বত্র। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে যে প্রচেষ্টাটি জারি রয়েছে, তাহচ্ছে সিঙ্গাপুরের লি কোয়ান ইউ এবং মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তুলনা করা। তারা এই তুলনাটি করলেও ওই দুই দেশের দুই শাসকের সময়কালের আইনের শাসন, সবার জন্য ন্যায্য বিচার ও বিচার পাওয়ার সংস্কৃতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আর এসব বিষয়গুলো আমাদের দেশে উপেক্ষিত এবং অনুপস্থিত। অর্থাৎ অবস্থাটি এমন যে, লি কোয়ান ও মাহাথিরের দীর্ঘসময়ের অগণতান্ত্রিক শাসনে উদাহরণটুকু গ্রহণ করা হবে, বাকিটুকু বাদ দিয়ে। এর সুবিধাটা হচ্ছে, ওই দু’জনকে ব্যবহার করে তাদের মন্দ দিকগুলোকে গ্রহণ এবং ভালো দিকগুলোকে বর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করা। এছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

উন্নয়নের কথা যদি ধরাই হয় তাহলে প্রথমত অতিসম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতেই হবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, বাণিজ্য দফতর ও সে দেশের বৈদেশিক কৃষি বিভাগ যৌথভাবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ রিপোর্ট ২০১৫ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, দুর্নীতিই বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধানতম বাধা। রিপোর্টে বলা হয়, দুর্নীতি অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক যে লেনদেন তাতে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই থেকে তিন শতাংশ হারে। এছাড়াও রিপোর্টে রাজনৈতিক সংঘাতসহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশে যে দেশীবিদেশী বিনিয়োগ কমেছে সে সম্পর্কে অনেক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে এবং আলোচনাও হয়েছে বিস্তর।

এ সপ্তাহেই একটি জনমত জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে মার্কিনী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআই। ওই জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রে যতো সমস্যাই থাকুক না কেন শতকরা ৮১ শতাংশ মানুষ ওই গণতন্ত্রকেই সমর্থন করেছেন। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের ২৫৫০ জন মানুষের উপরে পরিচালিত ওই জরিপে দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ মানুষ মনে করেন যতো সঙ্কটই থাকুক না কেন, অন্য যেকোনো ব্যবস্থার তুলনায় গণতন্ত্রই উত্তম।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী শতকরা ৬৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। যদিও ২২ শতাংশ এই ব্যবস্থার বিপক্ষে।

জরিপে দেশের প্রধান সমস্যা কি তা জানতে চাইলে উত্তরদাতাদের বড় অংশই দুর্নীতির কথা বলেছেন। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসাবে দেখেছেন অনেক উত্তরদাতা।

সব জরিপের তথ্য ও ফলাফল যে এক ধরনের হবে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে বিভিন্ন জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে একটি ধারণা পাওয়া যায় যে, জনগণ আসলে কি চাচ্ছেন বা তাদের মনের কথাটি কি। ২০১৩ সালে প্রথম আলো এবং ওআরজি কোয়েস্ট যে জনমত জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে অধিকাংশ উত্তরদাতা মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। ওই রিপোর্টগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, জনগণ গণতন্ত্রকেই অন্যান্য যে কোনো তত্ত্ব বা প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার তুলনায় বেশি সমর্থন করেন। ২০১৩ সালের ১১ মে প্রকাশিত জরিপে দেখা যায় যে, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক তার পক্ষে। ওই একই বছর ১০ অক্টোবর প্রকাশিত জনমত জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ৮২ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। ২০১১ এবং ২০১২’র জরিপেও একই মতামত পাওয়া যায়। তাহলে ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সময়ের জরিপগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক তা চাচ্ছেন এবং তারা গণতন্ত্রের পক্ষে।

এসব জরিপে আরও একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর গত দেড় বছরে সরকার এবং আওয়ামী লীগের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে। আইআরআই’এর জরিপ অনুযায়ী, এতে অংশ নেয়াদের মধ্যে শতকরা ৬৬ ভাগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ৬৭ ভাগের ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সমর্থন রয়েছে। ২০১৩ সালে যে জরিপ দুটো করা হয়েছিল প্রথম আলো এবং ওআরজি কোয়েস্টএর পক্ষ থেকে তাতেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে বলা হয়েছে।

এই জরিপ পর্যালোচনায় পরস্পর বিরোধী কিছু তথ্য উঠে আসলেও দুটো বিষয় স্পষ্ট যে, অধিকাংশ মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষে ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার চান। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু ২০১৩ সালের জরিপের ফলাফলের পরেও ক্ষমতাসীন সরকার এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন। ওই জরিপে তার এবং দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে এসেছিল। কিন্তু এতে প্রধানমন্ত্রী নিবৃত্ত হননি। বর্তমান জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে।

এসব বিষয়গুলো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের কোনো জরিপের উপরেই কোনো আস্থা নেই। বর্তমান জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল উল্লেখযোগ্য মাত্রায় জনপ্রিয়। যদি জরিপে আস্থাই থাকতো তাহলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হতো। আস্থা না থাকার বিষয়টিও এই জরিপের মধ্যেই রয়েছে। আর তাহলো শতকরা ৮১ ভাগ মানুষ গণতন্ত্র চান, ওই ব্যবস্থার ভুলত্রুটি সত্ত্বেও। আর শতকরা ৬৭ ভাগ মানুষ চাচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। আর এ দুটোতেই বিশ্বাস নেই প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের। তাহলে প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে কোনো জরিপের উপরে আস্থা থাকবে কিভাবে? আস্থা থাকার তো কোনো কারণই নেই।।