Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ষষ্ঠদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (ষষ্ঠদশ পর্ব)

টনি ব্লেয়ার বললেন, ব্যাপারটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও অচলাবস্থার

অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (ষষ্ঠদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

এসএফও’তে ওয়ারডল উল্লেখ করেন, ওইসিডি কনভেনশন ঘুষ প্রদানের ঘটনাকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিবেচনা করে ছাড়া দিয়ে যাচ্ছে। এই কারণে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলেও আভাস দেন। গোল্ডস্মিথ তাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন। বিএই তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও নথির বাক্সগুলো দেখাতে শুরু করে। নথির বিষয়বস্তু দেখার পর এসএফও’র তদন্তকারীরা মান্টিয়াগো, বুখারেস্ট, জোহানেসবার্গ, প্রাগ এবং দারএসসালামের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। এসএফও’র তদন্তকারীদের উদঘাটিত তথ্য থেকে জানা যায়, সৌদিদের জন্য বরাদ্দকৃত ৬ কোটি পাউন্ডের গোপন তহবিল এবং আরও ১০০ কোটি পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হয়ে গেছে। এসব অর্থ যাদের কাছে গেছে তাদের মধ্যে অন্তত দুজন ব্যক্তি হচ্ছেন ওয়াফিক সাইদ এবং মোহাম্মদ সাফাদি। এরা উভয়েই সৌদি রাজপরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

অভিযোগ আসে যে, যুবরাজ বন্দর বছরে ১০ কোটি পাউন্ড করে নিজেই সরাসরি গ্রহণ করতেন ওয়াশিংটনের রিগস ব্যাংকের মাধ্যমে। এ অর্থের অনুমোদন দিত যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অস্ত্র বিক্রয় শাখা ডেমো। এই খবরটি বিস্ফোরকের মতো কাজ করে। বন্দরকে দেয়া অর্থ বিষয়ে ডেমো প্রধান এলান গারউড এবং তার সৌদি বাণিজ্যিক পরিচালক স্টিফেন পোলর্ডকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এই জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাকর ও অপ্রীতিকর।

এসএফও সুইস কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সুইস কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ব্যাংকের রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করছে। তবে তারা একজন একাউন্টধারী হিসেবে সাইদকেও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করে। সব কিছুই দ্রুত ভন্ডুল হয়ে যেতে শুরু করে। বিএই’র প্রধান নির্বাহী মাইক টার্নার প্রকাশ্যেই জানান, টাইফুন বিক্রয় চুক্তিটি সঙ্কটের মুখে পড়েছে। পার্লামেন্ট সদস্যদের সাবধান করে দেয়া হলো। তাদের নির্বাচনী এলাকার কাজকর্মও স্থবির হয়ে পড়ল। কমনস নেতা জ্যাক স্ট্রর নির্বাচনী এলাকা ব্ল্যাকবার্নের কাছেই বিএই’র একটি কারখানা ছিল। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপাত স্বাধীন অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথে কথা বলেন।

এ অবস্থায় চাপের মুখে পড়ে ওয়ারডল ল্যাংডেলের আইনি সমর্থন নিয়ে একটি আপোষরফায় সম্মত হন। কথা হয়, তিনি ছোট আকারের গোপন লেনদেনগুলোর ব্যাপারে বিএই’র চেয়ারম্যান ডিক ইভান্সের কাছ থেকে একটি অপরাধমূলক স্বীকারোক্তিপত্র পাবেন। বিনিময়ে বন্দর, সাইদ এবং সাফাদির বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রমগুলো বাতিল করে দেয়া হবে। গোল্ডস্মিথ প্রথমে এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু এ দফায় বিএই’র সমর্থকরা তাদের আগের ভুলটি করতে চাইলেন না এবং তদ্বিরেরও কোনো সুযোগ রাখলেন না। ধারণা করা হয়, বন্দর ডাউনিং স্ট্রিটের সাথেই সরাসরি যোগাযোগ করেছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরেই টনি ব্লেয়ার গোল্ডস্মিথকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, ব্যাপারটি কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থ বিপন্ন হওয়াই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও এখন একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

ব্লেয়ারের কথা থেকে মনে হলো, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, আল কায়দা সম্পর্কিত কোনো গোয়েন্দা তথ্যই আর এখন থেকে সৌদি আরব সরবরাহ করবে না। ফলে আল কায়দার সন্ত্রাসীরা ব্রিটিশদের ওপর যেকোনো স্থানেই হামলা চালাতে পারে।

ওয়ারডল প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে যান। প্রধানমন্ত্রী তাকে জানিয়ে ছিলেন, জীবন এখন হুমকির মুখে। এসএফও’র পরিচালক হিসেবে তার চার বছরের চুক্তি তখন শেষ হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময়েই তার চুক্তির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় অ্যাটর্নি জেনারেলের টেবিলেই ছিল। ওয়ারডল নতিস্বীকার করলেন এবং সৌদি তদন্তটি বাতিল করে দেয়ার ব্যাপারে রাজি হলেন। তার বক্তব্যটিই প্রতিধ্বনিত করে গোল্ডস্মিথ পার্লামেন্টকে জানালেন, বড় ধরনের জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আইনের শাসনকে পাশ কাটাতে হয়েছে। ওয়ারডল আত্মসমর্পণ করার পরই কেবল গোল্ডস্মিথ পরিচালক পদে তার চাকরির মেয়াদটি নবায়ন করেছিলেন, তবে সেটি মাত্র এক বছরের জন্য।।

(চলবে…)