Home » অর্থনীতি » বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু’র ঢল :: চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শিকার শিশু আয়লান

বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু’র ঢল :: চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শিকার শিশু আয়লান

বাংলাদেশও এখন উদ্বাস্তুদের দেশে পরিণত হয়েছে

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 1৩ বছরের ছোট্ট আয়লান কুর্দি। ওই বয়সে যখন তার মাবাবার আদরে সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানায় নিশ্চিন্তে বাস করার কথা, তখন সে ডিঙ্গিতে করে উত্তাল সাগরে ভেসেছে। তারপরবাবার হাত ফসকে টুপ করে অথৈ পানিতে ভেসে গেছে। সে একা নয়, তার বড় ভাইবয়স ৫, মাও ভেসে গেছে। তার মৃত্যু একটি বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এই বয়সেই সে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে, জানান দিয়ে গেছে উদ্বাস্তু হওয়া, শরনার্থী হওয়ার ক্ষ্ট ও যন্ত্রনার কথা। তুর্কি উপকূলে ভেসে আসা তার নিথর দেহটি পাশ্চাত্যের সভ্যতাগর্বী মানুষদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের দাবানল, আর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলারের কারণে নিরীহ নাগরিকেরা হয়ে পড়েছে উদ্বাস্তু। সুখের সোনার হরিণ ধরার জন্য নয়, নিছক প্রাণ বাঁচানোর আকুতিতে এই ঢল কখনো আছড়ে পড়ছে গ্রিস, হাঙ্গেরি, তুরস্ক, ইতালির উপকূলে, কখনো মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড আর ইন্দোনেশিয়ার ভয়াল জঙ্গলে। গুলি এড়িয়ে, কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে মাসুম বাচ্চাদের নিয়ে উদ্বাস্তুদের ছুটে চলার দৃশ্য এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রধান খবর। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ যাত্রী নিয়ে নৌকার উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়া, ডুবে মরা কিংবা গভীন জঙ্গলে গণকবর আবিষ্কার এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধেও এত উদ্বাস্তেুর সৃষ্টি করেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সীমান্তে কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষ আশ্রয়ের জন্য জড়ো হয়েছেন। এই সংখ্যা ২০১৪ সালের সারা বছর মিলে ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার। আইওএম বলছে, গ্রিস কিংবা ইতালিতে পৌছানোর চেষ্টায় এই সময়ে ২ হাজার ৬শ জন ভূমধ্য সাগরে ডুবে গিয়ে মারা গেছেন। ২৭ আগস্ট লিবীয় উপকূলে যে বড় ধরনের নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছিল এবং মারা গেছেন পৌনে দু’শ অভিবাসন প্রত্যাশী, তার মধ্যে ২৪ জন বাংলাদেশীও রয়েছেন।

কিন্তু ঠাঁই মেলেনি। কোথাও তাদের আশ্রয় নেই। কাঁটাতারের বেড়া, গুলিভরা বন্দুক তাদের জন্য অপেক্ষা করেছে। সাগরের ভয়াল ঢেউ, বনের বাঘ, সাপ তো আছেই।

অথচ তারা কেউই উদ্বাস্তু বা শরণার্থী হতে চায়নি। বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে দেশ থেকে দেশে তার ফলে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বিশ্ব পরিস্থিতি। এখন চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ চলছে আফ্রিকার সুদান থেকে একেবারে আফগানিস্তান পর্যন্ত। এই যুদ্ধ শান্তিপ্রিয় মানুষকে করেছে উদ্বাস্তু ও শরণার্থী। এই যুদ্ধই কেড়ে নিয়েছে ছোট্ট শিশু আয়লানকে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন, বাশার আল আসাদ কারো আমলেই কিন্তু এসব দেশের মানুষ ইউরোপের দুয়ারে হাত পাতেনি। সেখানে গেছে, তবে বেড়াতে। তালেবানের কঠোর শাসনেও আফগানরা দেশ ছাড়েনি। বাংলাদেশের উপকূলীয় লোকজনের কেউ কেউ আগে সাগর পাড়ি দিত। এখন উত্তরবঙ্গের লোকজনও বঙ্গোপসাগর চিনেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশও এখন উদ্বাস্তুদের দেশে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট, বৈষম্য, বেকারত্ব, অনুন্নয়ন, দিনের পর দিনের যে নির্যাতননিপীড়ন চলছে, তাতে তাদের কাছে মনে হয়েছে, মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়াটা খুব খারাপ নয়। মিয়ানমারের বৌদ্ধদের উগ্রতা রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। তারা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিক।

আয়নাল কুর্দি নামের যে শিশুটির নিথর দেহ পড়েছিল সাগরতীরে, তাদের বাড়ি ছিল সিরিয়ার কোবানে। একদিকে, আসাদ বাহিনীর অত্যাচার, অন্যদিকে ইসলামিক স্টেট নামের চরমপন্থী গ্রুপের হানা, তার ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের আক্রমণ। কোনটা থেকে তারা বাঁচবে। প্রতিপক্ষ একটা হলে হয়তো কিছু একটা করা যেত। আর তাই তারা ছুটছে, বাপদাদার ভিটামাটি, চিরচেনা পরিবেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের শেষ ঠিকানা হচ্ছে সাগর। কবরটা পর্যন্ত তাদের পৃথিবীতে হলো না।

এজন্য কারা দায়ী? মানবাধিকার আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বুলি কপচিয়েই কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে তার মিশন নতুন উদ্যোগে শুরু করেছিল। এখন কিন্তু ওয়াশিংটন চুপ। নিশ্চুপ। আর ইউরোপের দেশগুলো নতুন নতুন কাঁটাতারের বেড়া বসাচ্ছে, দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করছে।

পাশ্চাত্য যা করেছে, তা আসলে ভয়াবহ অপরাধ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আগ্রাসী যুদ্ধ আর সরকার পরিবর্তনের যে খেলায় মেতেছিল, তার নির্মম পরিণতি হলো মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর মানুষদের পথের ফকির হিসেবে ইউরোপের দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দেওয়া। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হওয়ার পর থেকে সারা দুনিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল পূঁজিবাদ। পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য আর মধ্য এশিয়ার জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশগুলোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই এখন উদ্বাস্তুদের প্রধান স্রোত ইউরোপে আঘাত হেনেছে।

মার্কিনন্যাটো বাহিনীর আক্রমণে মুয়াম্মার গাদ্দাফি উৎখাত হন। গাদ্দাফির সাথে সাথে স্থিতিশীলতাও উবে যায়। দেশটি এখন তথাকথিত ‘ব্যর্থ’ রাষ্ট্রের তালিকায়। নানা গ্রুপ সেখানে ক্ষমতার লড়াইয়ে রক্ত ঝড়াচ্ছে। সাদ্দাম হোসেনকে বিদায় করার পর একটা দিনও ইরাকে শান্তি আসেনি। দেশটি এখন কয়েক খণ্ডে বিভক্ত। বাশার আল আসাদকে উৎখাতের জন্য আক্রমণ শুরু করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্ররা। বাশার উৎখাত হননি। শান্তিও নেই। তবে এসবের মধ্যে উত্থান হয়েছে আরো ভয়াবহ ইসলামিক স্টেটের (আইএস, বা আইএসআইএস)। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন গ্রুপ আর দেশকে যেসব অস্ত্র দিয়েছিল এবং এখনো দিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো দিয়েই প্রতিনিয়ত শত শত লোক নিহত হচ্ছে।

আর এই অপরাধের দায় কেউ স্বীকার করেনি। বুশ, চেনি, রামসফেল্ড, রাইস, পাওয়েলকেউ না। তাদের কাউকে বিচারের মুখে দাঁড় করানোর প্রশ্নও ওঠেনি। ওবামাও কিন্তু কম দায়ী নন। তিনিই লিবিয়া আর সিরিয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন, মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে মদত দিয়েছেন। এরা প্রত্যেকেই কি যুদ্ধাপরাধী নন?

তারা সরকার উৎখাতে যতটা উৎসাহিত হয়েছিলেন, এই ‘মানবিক বিপর্যয়’ সামাল দেওয়ার কাছে এক শতাংশও মনোযোগ নেই। গ্লোবাল ট্রেন্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তেুর সংখ্যা পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ। অথচ মাত্র এক বছর আগে ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ৯৫ লাখ, আগের বছর ছিল এর চেয়ে ২৯ লাখ কম। জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র হিসাব মতে, নির্যাতন থেকে বাঁচতে এখন প্রতিদিন গড়ে ৪২,৫০০ লোক তাদের বাড়িঘর ছাড়ছে। সবাই যে সীমান্ত অতিক্রম করছে, তাও নয়, অনেকে দেশের ভেতরেই কোথাও গিয়ে আশ্রয় খুঁজছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলোর কারণে উদ্বাস্তু সৃষ্টি হলেও তারা কিন্তু এদের গ্রহণ করছে না। ধনী আরব দেশগুলোও হাত বাড়াচ্ছে না।

সর্বশেষ এই ঢলের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, জর্দান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এসব দেশেই ছিল বেশির ভাগ উদ্বাস্তু। ২০১৪ সালে তুরস্কে ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ সালেই দেশটিতে ছিল ১৬ লাখ উদ্বাস্তু। আর সিরীয়রা এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু। তাদের আগে আফগানদের জন্য ছিল ওই পরিসংখ্যানটি। এখন প্রতি চারজন সিরীয়ের একজন অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছে। উদ্বাস্তুদের ৫১ ভাগই শিশু ও কিশোর। কোনো অপরাধ না করেই তারা নির্মম শাস্তি পাচ্ছে।।