Home » অর্থনীতি » বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি কে? (প্রথম পর্ব)

বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি কে? (প্রথম পর্ব)

নোয়াম চমস্কি

অনুবাদ : আসিফ হাসান

Last 4ভিয়েনায় ইরান এবং পি৫+১ দেশগুলোর (জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো শক্তিধারী পাঁচটি দেশ ও জার্মানি) মধ্যকার পরমাণু চুক্তিটি বিশ্বজুড়ে বিপুল স্বস্তি ও আশাবাদ জাগিয়েছে। ‘এই ব্যাপকভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ইরানের পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের সামগ্রী সংগ্রহের সম্ভব সব রাস্তা এক প্রজন্মেরও বেশি সময় বন্ধ করার একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ফরমুলা এবং ইরানের গোপনে পরমাণু অস্ত্র লাভের সম্ভব সব উদ্যোগ সাথে সাথে শনাক্তকরণ ও নিবৃত্ত করার প্রমাণিতব্যবস্থা, যা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে’ বলে ইউএস আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশন এই চুক্তি সম্পর্কে যে মূল্যায়ন দিয়েছে, বিশ্বের বেশির ভাগই দৃশ্যত এর সাথে একমত।

অবশ্য এই সাধারণ আশাবাদের মধ্যেও চোখে পড়ার মতো ব্যতিক্রম রয়েছে। এরা হলো যুক্তরাষ্ট্র এবং এর দুই ঘনিষ্ঠতম আঞ্চলিক মিত্র ইসরাইল ও সৌদি আরব। এর একটি পরিণাম হলো এই যে, মার্কিন করপোরেশনগুলো তাদের প্রবল বিরক্তির কারণে তাদের ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষদের সাথে দল বেঁধে তেহরানে যাওয়ার ব্যাপারে বাধা পাচ্ছে। মার্কিন ক্ষমতা ও চলতি ধারণার সুপরিচিত সেক্টরগুলো ওই দুই আঞ্চলিক মিত্রের অবস্থানের সাথে একমত পোষণ করে ‘ইরানি হুমকি’র আতঙ্কে ভুগছে। এই দৃশ্যপটজুড়ে প্রায় কাছাকাছি থাকা সংযত ভাষ্যে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, দেশটি ‘বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি’ হতে যাচ্ছে। এমনকি চুক্তির সমর্থকেরা পর্যন্ত এখানে শ্রান্ত হয়ে ওই হুমকির ব্যতিক্রমী গুরুত্বের কথা বলছেন। সর্বোপরি আমরা কিভাবে আগ্রাসন, সহিংসতা, বাধা আর প্রতারণার ভয়ঙ্কর রেকর্ডধারী ইরানকে বিশ্বাস করতে পারি?

রাজনৈতিক শ্রেণীর মধ্যে বিরোধিতা এত প্রবল যে চুক্তির প্রতি থাকা ব্যাপক মাত্রার জনসমর্থন দ্রুত বদলে গেছে, এমনকি সমানভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রিপাবলিকানেরা প্রায় সর্বসম্মতভাবে এই সমঝোতার বিরোধী। চলমান রিপাবলিকান প্রাইমারিগুলো এই ঘোষিত কারণগুলো ফুটিয়ে তুলছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ভিড়ে অন্যতম বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত সিনেটর টেড ক্রুজ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরান এখনো হয়তো পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারবে এবং কোনো দিন একটিকে ‘ইলেট্রো ম্যাগনেটিক পালসে’ স্থাপন করবেযা যুক্তরাষ্ট্রের ‘পুরো পূর্বাঞ্চলের বৈদ্যুতিক গ্রিডকে সাগরে নিক্ষেপ’ করে ‘কোটি কোটি আমেরিকানকে’ হত্যা করবে।

সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দুই প্রার্থী ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ ও উইসকনসিনের গভর্নর স্কট ওয়াকার নির্বাচনে জয়ের পরপরই নাকি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পরই ইরানে বোমা হামলা চালানো হবে তা নিয়ে তর্ক করছেন। পররাষ্ট্রনীতিতে কিছুটা অভিজ্ঞতাধারী প্রার্থী লিন্ডসে গ্রাহাম চুক্তিটিকে ‘ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি মৃত্যু পরোয়ানা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার এই মন্তব্য ইসরাইলি গোয়েন্দা ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের নিশ্চিতভাবেই বিস্মিত করবে, (সাথে সাথেই আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়ে গেছে) এবং গ্রাহাম জানেন, কথাটা চরম মূর্খতা প্রকাশ পেয়েছে।

মনে রাখা দরকার যে, রিপাবলিকানরা অনেক আগেই স্বাভাবিক কংগ্রেসীয় পার্টি হিসেবে কাজ করার ভনিতা ছেড়ে দিয়েছে। শ্রদ্ধাভাজন রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার ডানপন্থী আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের নরম্যান ওরস্টেনের মতে, তারা ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে স্বাভাবিক কংগ্রেসীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চাওয়া ‘পুরোপুরি বদলে গিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা দলে’ পরিণত হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট রোন্যাল্ড রিগ্যানের আমল থেকে পার্টি নেতৃত্ব অতি ধনী ও করপোরেট সেক্টরের পকেটগুলোর মধ্যে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে যে, ইতোপূর্বে কোনো ধরনের সঙ্ঘবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করেনি কেবল এমন লোকজনের অংশবিশেষকে সংগঠিত করার মাধ্যমেই ভোট লাভ করতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছে চরমপন্থী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান (এখন সম্ভবত তারাই রিপাবলিকান ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ); সাবেক ক্রীতদাসধারী রাজ্যগুলোর অবশিষ্টাংশ; নেটিভিস্টরা, যারা শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান অ্যাঙ্গোস্যাক্সন দেশটিকে ‘তাদের’ কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে, এমন ভয়ে আক্রান্ত; এবং ওইসব লোক যারা রিপাবলিকান প্রাইমারিগুলোকে আধুনিক সমাজের মূলধারা থেকে (যদিও বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের মূলধারা থেকে নয়) অনেক দূরে সরিয়ে প্রদর্শনীতে পরিণত করছে।

অবশ্য বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে সরে যাওয়াটা রিপাবলিকানদের পুরোপুরি বদলে গিয়ে ফুলে ফেঁপে ওঠা সীমার অনেক বাইরে চলে যাচ্ছে। এই দৃশ্যপটজুড়ে (উদাহরণ হিসেবে বলছি) জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসের ‘বিজ্ঞজনোচিত’ উপসংহার নিয়ে সাধারণ সমঝোতা দেখা যায়। সেটা হলো ‘কর্মকর্তারা যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, চুক্তিটি নিয়ে ইরান প্রতারণা করছে,’ তবে ভিয়েনা চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি স্থাপনায় হামলা থেকে কোনোভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, অবশ্য যদি ইরান ভদ্র আচরণ করে তবে একতরফা সামরিক হামলার ‘সম্ভাবনা থাকবে অনেক কম।’

ক্লিনটন ও ওবামার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক আলোচক ডেনিস রস বিশেষ ভঙ্গিতে সুপারিশ করেছেন যে, ‘ইরানের অবশ্যই সংশয়হীন থাকতে হবে যে, যদি আমরা দেখি দেশটি অস্ত্রের দিকে সরে যাচ্ছে, তবে শক্তির প্রয়োগ হবেই’, এমনকি সেটা চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও যখন তাত্ত্বিকভাবে ইরান যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতা পাবে তখনো। তিনি বলেন যে, বস্তুত ‘১৫ বছরের মেয়াদের অস্তিত্বই চুক্তিটির সবচেয়ে বড় একক সমস্যা’। তিনি ওই ভয়ঙ্কর তারিখটি আসার আগেই ইসরাইলকে বিশেষভাবে সজ্জিত বি৫২ বোমারু বিমান এবং বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা সরবরাহের পরামর্শ দেন, যাতে দেশটি নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

ভয়ঙ্করতম হুমকি

পরমাণু চুক্তিটির বিরোধিতাকারীরা অভিযোগ করছেন যে, এটা যথেষ্ট নয়। অনেক সমর্থক একমত হয়ে বলছেন যে, ‘যদি ভিয়েনা চুক্তিটি যদি কিছু করার জন্য হয়ে থাকে তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অবশ্যই ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র থেকে মুক্ত করতে হবে।’ এসব শব্দের লেখক ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জরিফ আরো বলেন, ‘ইরান তার জাতীয় সামর্থ্যে এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের [বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সরকারগুলোকে নিয়ে গঠিত] বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে পথজুড়ে শান্তি ও কূটনীতির প্রতি সংশয়বাদীদের তোলা অনেক সম্ভাব্য বাধার বিষয়টি পুরোপুরি জেনেও এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত।’ তিনি আরো বলেন, ইরান ‘একটি ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেছে’ এবং এখন স্বাক্ষর করতে অস্বীকারকারী ইসরাইলের পালা।

নিশ্চিতভাবেই ভারত ও পাকিস্তানের সাথে ইসরাইল হলো তিন পরমাণু শক্তিধর দেশের একটি যার অস্ত্র কর্মসূচিকে যুক্তরাষ্ট্র উৎসাহিত করছে এবং যে দেশটি বিস্তার রোধ চুক্তিতেও (এনপিটি) স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করছে।

জরিফ পাঁচ বছর পর পর করা এনপিটি মূল্যায়ন সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেছেন। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র (তার সাথে যোগ দিয়েছিল কানাডা ও গ্রেট ব্রিটেন) আবারো মধ্যপ্রাচ্যকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ার প্রয়াসে বাধা দেয়ায় ওই সম্মেলন নিস্ফলভাবে শেষ হয়েছিল। মিসর এবং আরব রাষ্ট্রগুলো ২০ বছর ধরে এ ধরনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এনপিটি ও জাতিসঙ্ঘ অন্যান্য সংস্থায় এ ধরনের উদ্যেগে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ ব্যক্তিত্ব জয়ন্থা ধানপালা ও সার্গেও দুরাতে ‘আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশনের জার্নালে ‘এনপিটির কোনো ভবিষ্যত আছে কি?’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন : মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত (ডব্লিউএমডি) অঞ্চল গড়ার ১৯৯৫ সালের প্রস্তাব গ্রহণের সফলতা ছিল এমন এক প্যাকেজের প্রধান উপাদান যা এনপিটির সীমাহীন সম্প্রসারণকে অনুমোদন করেছিল।’ অন্যদিকে এনপিটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। এতে অটল থাকলে এটা পরমাণু অস্ত্র যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে পারে।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে বারবার বাধা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ধানপালা ও দুরাতে ইসরাইলের উল্লেখ খুবই বিনীত ও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এনপিটির পক্ষ নয় এবং এই অঞ্চলে একমাত্র দেশ হিসেবে পরমাণু অস্ত্র সম্ভারের অধিকারী বলে ব্যাপকভাবে ধারণা রয়েছে এমন একটি দেশের পক্ষে’ অতিসম্প্রতি তা করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা, ২০১০ সালে এবং আবারো ২০১৫ সালে। তারা আশা করেছেন, এবারের ব্যর্থতা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক দ্রুত অগ্রগতি এবং মধ্যপ্রাচ্যকে ডব্লিউএমডিমুক্ত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এনপিটির দীর্ঘ দিনের দুটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেবে না।’

পরমাণু অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য হতে পারত তথাকথিত ইরানি হুমকি মোকাবিলার সোজাসাপ্টা পথ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার ইসরাইলি ক্লায়েন্টকে রক্ষার লক্ষ্যে এই উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে থাকায় কোনো বড় চুক্তি আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। সর্বোপরি, কথিত ইরানি হুমকি অবসানের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের কারণে নষ্টের এটাই একমাত্র উদাহরণ নয়। এতে করে কোনটা সত্যিকার অর্থে ঝুঁকিতে তা নিয়ে আরো প্রশ্নের সৃষ্টি করছে।

এই বিষয়টি বিবেচনার জন্য এই পরিস্থিতির অকথিত অনুমানগুলো এবং যেসব প্রশ্ন প্রায় করাই হয় না, সেগুলো পরীক্ষা করা খুবই জরুরি। আসুন আমরা এসব অনুমানের মাত্র কয়েকটি বিবেচনা করি। শুরু করা যাক সবচেয়ে মারাত্মক একটি ইস্যু নিয়ে, তা হলো বিশ্বশান্তির সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি হলো ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও ভাষ্যকারদের মধ্যে এটা অতি মামুলি একটা ধারণা বিরাজ করছে যে, ইরান ভয়ঙ্করভাবে ওই শিরোপাটা পেয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে এবং সেখানকার দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় তেমনভাবে প্রকাশিত হয় না, সম্ভবত সেগুলোর কিছুটা গুরুত্ব রয়েছে। পাশ্চাত্যের শীর্ষ স্থানীয় জরিপ সংস্থাগুলোর (উইন/গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল) মতে, ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ সৃষ্টিকারী দেশের শিরোপা জিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের অবশিষ্ট ভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে। অনেক নিচে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান (খুব সম্ভবত ভারতীয় ভোটে সেটা এত ওপরে ওঠেছে)। ইরানের অবস্থান এদের অনেক নিচে; চীন, ইসরাইল, উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্তানেরও পরে।।

(চলবে…)