Home » প্রচ্ছদ কথা » গণপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের কর্মকাণ্ড : গ্যাস-বিদ্যুৎ-ভ্যাট

গণপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের কর্মকাণ্ড : গ্যাস-বিদ্যুৎ-ভ্যাট

আমীর খসরু

Coverআনুষ্ঠানিক ভাবে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে, শুধু তা দিয়ে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হয় না; ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর বহু মানুষের কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যাচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে’ অমর্ত্য সেন, দ্য আইডিয়া অফ জাস্টিস।

মাত্র কয়েকদিনেই সাধারণ মানুষের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে আরও একটি বিশাল বোঝা এবং সীমাহীন চাপ। এই বোঝা এবং চাপটি একেবারেই সাধারণ মানুষের দিনযাপন ও প্রাণ ধারণের পরিস্থিতিকে পুনরায় নাজুক করে দিয়েছে। এই দেশের জনগণ গণবিরোধী এক তৎপরতার সিদ্ধান্তে এসব বোঝা এবং চাপ সহ্য করতে করতে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন যে, তাদের অবস্থা দাড়িয়েছে এমন – ‘মাথার উপরে যেন হাজার হাত পানি’। মানুষ এমনিতেই গণতন্ত্রহীনতা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, চিন্তাবিবেক, বাকব্যক্তি স্বাধীনতার অনুপস্থিতি সর্বোপরি নিজেদের সম্পদ নিজেদের চোখের সামনে লুণ্ঠন হতে দেখছে। আর এর অনিবার্য ফলাফল তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অবিরাম। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বেড়েছে, বেড়েছে গণপরিবহন ভাড়া। তার উপরে পানির দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ, এরও উপরে ভ্যাটের বিশাল ধ্বকল।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সব সময়ই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিশ্বসভায় নাকি উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ মডেল হিসেবে দাড়িয়ে গেছে, এমনটাও বলা হচ্ছে। কিন্তু সব দেখেশুনে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যবস্থার চলমান পরিবর্তনের ধারই ধারে না। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে কম। দুনিয়ার তাবৎ দেশ এর সুবিধা নিয়ে জনগণের উপরে সৃষ্ট চাপ কমাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সব সময়ই তেলের দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হতো। এবারেও তারা ভিন্ন ধারার দোহাই দিয়ে বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়েছে। পদ্ধতিটি অভিনব সন্দেহ নেই। এখন বলা হচ্ছে, অতীতের লোকসান এ্যাডজাস্ট বা সমন্বয় করা হচ্ছে। কিন্তু কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করে কখনোই বলা হয়নি যে, আগে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে কতো শত কোটি টাকা আয় হয়েছে? তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ উৎপাদক ও বিতরণ সংস্থার পেছনে কতো টাকা ব্যয় করা হয়েছিল? আর দায়মুক্তি প্রাপ্ত বিতর্কিত রেন্টাল বিদ্যুতের পেছনেই বা কতো টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে বা অতীতে হয়েছে? এমন হিসাবও কখনো দেয়া হয় না যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পিডিবিসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন খাতে কতো টাকা ব্যয় করা হয়েছে? এসব প্রশ্নে জবাব পাওয়া গেলে সব কিছুরই মিমাংসা হয়ে যেতো। কিন্তু জবাব মিলবে না এবং জবাব তারা দেবেন না এর কারণ তারা ওই মিমাংসাটি চায় না। মিমাংসাটি হয়ে গেলে লুণ্ঠনের ফাঁকফোকড়গুলো বেরিয়ে যাবে এই ভয়ে। একইভাবে গ্যাসের ক্ষেত্রে বলা চলে যে, বিদেশী কোম্পানীগুলোর সাথে কি চুক্তি হয়েছে, কিভাবেই বা চুক্তি করা হলো এবং এর শর্তাদি কি? এসব প্রশ্নগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করাও হবে না একই কারণে।

গ্যাসবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। পানির মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ চলছে।

জনগণের উপরে চাপের বোঝার আপাতত সবশেষটি করা হয়েছিল বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতনের উপরে ভ্যাট আরোপ করে। যদিও সরকার বলেছিল, ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেবে। কিন্তু অবস্থা হচ্ছে, এটা বাস্তবে কখনোই হয়নি। এই প্রেক্ষাপটেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে টানা ৬ দিন আন্দোলন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ভ্যাটের বোঝা লাঘব করতে পেরেছেন। ছাত্রদের সম্মিলিত আন্দোলন শিক্ষার্থীদের উপরে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করতে পারলেও সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর উপরে এ ব্যবস্থাটি জোরদারভাবে জারি আছে। আছে এই কারণে যে, সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে কোনো আন্দোলন নেই।

তবে শিক্ষার উপরে ভ্যাট আরোপের ক্ষমতাসীনদের একটি বয়ান আছে। বয়ানটি হচ্ছে, শিক্ষাকে তারা পণ্য হিসেবে দেখে। পণ্য হিসেবে দেখার সুবিধাটুকু হচ্ছে এই যে, শিক্ষা সাধারণের হলে তাতে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের শাসন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়। আর বাধাটা সৃষ্টি করে শিক্ষিত শ্রেণীই। তবে ভ্যাট আরোপে পুরো ব্যবস্থাটিই এমন যে, শেষ পর্যন্ত এই চাপ জনগণ বা ভোক্তার উপরেই এসে পরে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, পণ্যের উপরে ভ্যাট আরোপিত হয়, কিন্তু শিক্ষা তো কোনো পণ্য নয়। এটা সহি কথা এবং স্বতঃসিদ্ধ কথা। কিন্তু বর্তমান সরকার এবং সরকারটি যাদের ইশারায় চলে তারা শিক্ষাকে পণ্য হিসেবেই গণ্য করে। সবার জন্য শিক্ষা বা শিক্ষা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হোক এমন সার্বজনিক সত্যটিতেও ক্ষমতাসীনদের বিশ্বাস নেই। কারণ সেই ইশারাদানকারীরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ ওই সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য হচ্ছে অন্য পাচটি পণ্যের মতো শিক্ষাও পণ্য। আর এ কারণে সূক্ষ্ম কৌশলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়ে গেছে। ভ্যাট আরোপ সেই বাণিজ্যিকীকরণেরই অংশ।

অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’র ১৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় : () অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’।

ভ্যাট আরোপের যৌক্তিকতার বিষয়টি মিমাংসা এর মাধ্যমেই হয়ে যায় যে, শাসন ব্যবস্থাটি যদি জনপ্রতিনিধিত্বশীল হতো, তাহলে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের প্রশ্ন তো আসতোই না, ভ্যাটেরও কোনো প্রশ্ন ছিল না।

যে সব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তার সাথে কোনো তথ্যউপাত্ত দেয়া হয়নি এ কারণে যে, জনগণ ক্ষমতাসীনদের কথার মারপ্যাচ এবং পরিকল্পনার কূটকৌশল ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। এ কথাটি মনে রাখতেই হবে, জনগণের কাছে জবাবদিহিতামূলক কোনো সরকারের পক্ষে জনগণের বিপক্ষে যায় এমন কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব হয় না। জবাবদিহিতাহীন শাসন ব্যবস্থায়ই জনগণের বিপক্ষে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য হয়ে উঠে।

এই অনিবার্য বিষয়টিকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য ক্ষমতাসীনরা যে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে তা নয়। কাউকে কিছু না জানান দিয়ে, যুক্তিহীন ও একতরফাভাবে জনগণের উপরে যাবতীয় দায় চাপিয়ে দেয়ার জন্য তাদের প্রস্তুতি দীর্ঘদিন ধরে।

সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আড়িয়াল বিল আন্দোলন, রূপগঞ্জ, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনসহ একে একে স্বতঃস্ফূর্ত সব গণপ্রতিবাদকে জোর করে বন্ধ করে দিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আর দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করেছে। এসব ছিল জনগণের বিপক্ষে দাড়ানোর ক্ষেত্র প্রস্তুতিতের প্রাথমিক পর্যায়। সবার নিশ্চয়ই এও মনে আছে যে, গ্যাসবিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং অব্যাহত গ্যাসবিদ্যুতের নিশ্চয়তার দাবিতে অতীতে যে সব বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়েছে রাজপথে সে সবও কিভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। এও নিশ্চয়ই সবার মনে আছে যে, রাজপথে নেমে আসা একেবারেই সাধারণ নারীপুরুষের উপরে কিভাবে নির্যাতন করা হয়েছে এবং মামলার হুমকি দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদকারী সব মত, পথ, পক্ষ, দলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এবং রাষ্ট্রটিকে নিজেদের হাতের মুঠো নেয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকেও বিনাশ ও বিপন্ন করা হয়েছে।

এ কথাটিও মনে রাখতে হবে যে, জনসমাজ বা সিভিল সোসাইটিসহ সচেতন সাধারণ মানুষের চিন্তা, বিবেক, বাকব্যক্তি স্বাধীনতা রোধ করার জন্য তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এখন হরদম ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা শুধুই দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ার হাইজার বিলেনফোল্ড ঢাকা সফরকালে বলেছেন, বাংলাদেশে স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ৫৭ ধারাটি কার্যকর থাকায় দীর্ঘস্থায়ীভাবে দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এটা শুধু জাতিসংঘের কর্মকর্তাই নন, দুনিয়াজুড়ে একই কথা বলা হচ্ছে।

কিন্তু এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। সারা দুনিয়া কি মনে করছে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারা জনগণের বিপক্ষে দাড়িয়ে, জনগণের জীবনযাপন এবং প্রাণ ধারণকে কষ্টকর ও দুঃসহ করে তুলছে। বিদ্যুৎগ্যাস, গণপরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা ভ্যাট আরোপ তারই একটি অধ্যায় মাত্র। গণপ্রতিনিধিত্বহীন হলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কোনোই বাধা নেই, বরং এটাই অনিবার্য। কারণ ক্ষমতাসীনদের কাছে জনগণ কোনো মুখ্য বিষয় নয়। এ কারণে জনগণের কাছে জবাবদিহিতারও কোনো প্রয়োজন নেই।।