Home » আন্তর্জাতিক » চীন কি জয়ী হলো নেপালে?

চীন কি জয়ী হলো নেপালে?

Last 5বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর নেপালে সাহায্য পাঠানোর ব্যাপারে চীন ও ভারত প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। পেশী শক্তি নয়, বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এই যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছিল? এ নিয়ে ফরেন পলিসিতে লিখেছেন শেরিং শাখ্য (কানাডা রিসার্চ চেয়ার, রিলিজিয়ন অ্যান্ড সোসাইটি, ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান রিসার্চ, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) এবং অশোক গুরুং (সিনিয়র ডিরেক্টর, ইন্ডিয়া চায়না ইনস্টিটিউট, দি নিউ স্কুল, নিউ ইয়র্ক)

২৫ এপ্রিল ভয়াবহ একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে চীনের ক্ষুদ্রতম প্রতিবেশী নেপালে। তিন দিক থেকে ভারতে ঘেরা নেপাল সাম্প্রতিক সময় চীনের বিপুল প্রভাবের বিষয়টি অনুভব করছিল : ২০১৪ সালে দেশটির বিদেশী বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎস হিসেবে ভারতকে ছাড়িয়ে যায় চীন, নেপালের পর্যটন শিল্প বেশি বেশি চীনা পর্যটক ও পর্বোতারোহীকে আতিথ্য দিচ্ছে, এবং খুব সম্ভবত চীনা চাপেই নেপালি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দেশে অবস্থানকারী প্রায় ২০ হাজার তিব্বতির ওপর অব্যাহত গতিতে নির্যাতন বাড়িয়ে চলেছে।

চীনে প্রায়ই ভয়াল ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এবার তারা নেপালে ভূমিকম্প ঘটার সাথে সাথেই অনুসন্ধান ও উদ্ধার দল পাঠায়। তাদের সাথে আসে চিকিৎসা সরবরাহ এবং অন্যান্য সহায়তা। কিন্তু তাইওয়ানের উদ্ধার সহায়তা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নেপাল, যদিও চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষাপটে শেরিং শাখ্য ও অশোক গুরুংয়ের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

শেরিং শাখ্যএর বিশ্লেষণ : উত্তর দিকের শক্তিশালী প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে পারার ভীতিটি নেপালকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, এমনকি এই সঙ্কটের সময়ও সে চীনের কথিত ‘মূল স্বার্থে’র বিষয়টি অগ্রাহ্য করতে পারেনি। আর এ কারণেই সে তাইওয়ানের সরকারি সাহায্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অথচ এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার সম্পদ ও অভিজ্ঞতা উভয়ই আছে তাইওয়ানের। এমন খবরও পাওয়া গেছে, দেশটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর উদ্ধার দলকে চীনা আকাশসীমার কাছাকাছিও উড়তে নিষেধ করে, যদিও ভূমিকম্পে সেখানেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল, চীন ও নেপালের মধ্যবর্তী সীমান্তেই ত্রাণ সহায়তা দরকার ছিল খুব বেশি।

ত্রাণ কার্যক্রমে চীন ও ভারত উভয়ের সাড়াই ছিল প্রশংসনীয় ও সময়োচিত। ভূমিকম্পের মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই কাঠমান্ডু ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে একটি জরুরি টাস্ক ফোর্স পাঠিয়ে দেয় বেইজিং।

কয়েক দশক ধরেই নেপালের অন্যতম দাতা দেশ চীন। ১৯৬০এর দশক থেকে ভারতের পাশাপাশি চীন হলো নেপালের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম উৎস। তবে ভারতের চেয়ে চীনের প্রতি নেপালিদের অনেক বেশি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে এলিটদের মধ্যে চীনের ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টির কারণ সাহায্য নয়, বরং কাক্সিক্ষত পণ্যের উৎস হিসেবে ভারতের স্থান দখল করতে পারার জন্য। নেপালি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চীনের মোবাইল মেসিজিং অ্যাপ ‘উইচ্যাট’ সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। অথচ কয়েক দশক আগে তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালি অংশে ধারণা ছিল তিব্বতিরা গরিব ও অনুন্নত, অথচ এখন তাদের ধারণা আগেরটির বিপরীত।

চীনা সহায়তা এবং বিলাস ও অন্যান্য পণ্যের বাজার নিয়ে উদ্বেগ সত্ত্বেও নেপালচীন সম্পর্ক মূলত সরকার ও এলিটদের মধ্যেই সীমিত। নেপাল ও চীনের মধ্যে জনসাধারণ পর্যায়ে যোগাযোগ বলতে গেলে নেই। নেপালের ভূমিকম্প ভারতীয়দের মধ্যে যে উদ্বেগ সৃষ্টি এবং দুর্দশাগ্রস্তদের সহায়তার জন্য যে সহানুভূতি দেখা দিয়েছিল, অনেক নগরী যেভাবে উৎকণ্ঠিত হয়েছিল, তেমন কোনো অনুভূতি দেখা যায়নি চীনা জনসাধারণের মধ্যে।

নেপালের সাথে ভারতের রয়েছে উন্মুক্ত সীমান্ত। লাখ লাখ নেপালি ভারতে কাজ করে, হিমালয়জুড়ে অনেক গ্রুপের মধ্যে এমন অনুভূতিও রয়েছে যে, ভারত ও নেপাল উভয়টিই তাদের দেশ। নেপালে এমন পরিবার পাওয়া কঠিন, যাদের কোনো না কোনো সদস্য ভারতে বাসবাস করে না কিংবা সেখানে গিয়ে পড়াশোনা করছে না। দুই দেশের মধ্যে হিন্দু সংস্কৃতিগত মিলও রয়েছে। এই দিক থেকে বেশির ভাগ নেপালির কাছে চীন এখনো দূরের, অপরিচিত সংস্কৃতি ও সমাজ। কিন্তু চীনের দূরত্ব ও অপরিচিত হওয়াটাই এবং সেইসাথে সম্ভ্রম উদ্রেককারী ভাবমূর্তিই দক্ষিণ দিকের প্রতিবেশীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

অশোক গুরুংএর বিশ্লেষণ

ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বিপর্যয় উপলব্ধি করার প্রস্তুতি নেপাল সরকারের ছিল না। মোটামুটিভাবে নেপালিরা বুঝতে পেরেছিল, চীনা, ভারতীদের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহায়তা তাদের গ্রহণ করতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বোঝা যাচ্ছে যে, তাইওয়ানের থেকে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার জন্যই যে ভূমিকম্পপরবর্তী তাইপের সহায়তা নিয়ে কাঠমান্ডু অস্বীকার করেছে।

চীনের সাথে নেপালের সম্পর্ক ২০০৬ থেকে উন্নত হতে থাকে। ওই সময় নেপাল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। একই সময় চীনের আধুনিক অর্থনীতির উত্থান এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূমিকা গ্রহণের আকাক্সক্ষা জাগে। তখনই প্রায় ৩০ কোটি চীনা মধ্যবিত্ত নেপাল ভ্রমণ করতে শুরু করে। এখন নেপালে আগত বিদেশী গ্রুপগুলোর মধ্যে চীনারাই বৃহত্তম। অনেক অভিযাত্রীই হিমালয়ের ওপাশের স্থানটি দেখতে আগ্রহী। আবার অনেকে বৌদ্ধের জন্মস্থানটি খুঁজে দেখতে চায়।

চীনা সাহায্যকে নেপালিদের ইতিবাচকভাবে দেখার কারণ হলো, এই দেশটি অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছে। চীনারা এই খাতে বেশ ভালো কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে, নেপালিদের দৃষ্টিতে ভারত হলো বড়ভাই, যদিও তাদের সাথে তাদের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভাষাভিত্তিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক জটিল। এই সম্পর্কে যেমন ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, সেইসাথে বেশ ভালো পরিমাণই সন্দেহ ও উত্তেজনাও রয়েছে। অনেকেই এটাকে বেশ দুর্বল ছোটভাইয়ের প্রতি বড়ভাইয়ের অনেকটা নির্মম আচরণ হিসেবে অভিহিত করে।।