Home » অর্থনীতি » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৭)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৭)

মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী রাজনীতিতে বিভক্ত বিশ্ব

আনু মুহাম্মদ

Last 3সোভিয়েত পার্টির সাথে বিতর্কের এক পর্যায়ে কী কী ধরন থাকলে কোনো ‘বিপ্লবী পার্টি’ আর বিপ্লবী পার্টি থাকতে পারে না তার বিষয়ে চীনা পার্টির প্রকাশনায় বিশদ বলা হয়েছিলো। সেগুলো যদি তালিকা হিসাবে উপস্থিত করি তাহলে তা হবে এরকম, () সর্বহারা বিপ্লবী পার্টি না হয়ে কোনো পার্টি যদি বুর্জোয়া সংস্কারবাদী পার্টি হয়, () মার্কসবাদী লেনিনবাদী পার্টি না হয়ে কোনো পার্টি যদি সংশোধনবাদী পার্টি হয়, () সর্বহারা শ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনী না হয়ে কোনো পার্টি যদি বুর্জোয়া শ্রেণীর লেজুড়ে পরিণত হয়, () সর্বহারা শ্রেণী ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে কোনো পার্টি যদি শ্রমিক অভিজাতদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, () আন্তর্জাকিতাবাদী না হয়ে যদি কোনো পার্টি জাতীয়তাবাদী হয়, () কোনো পার্টি যদি নিজের চিন্তা নিজে না করতে পারে, গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা দ্বারা নিজের দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রবণতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জনে সক্ষম না হয়, () মার্কসবাদলেনিনবাদের বিশ্বজনীন সত্যকে কিভাবে প্রয়োগ করতে ও নিজদেশের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে সমন্বিত করতে হয় তা না জানে এবং তার পরিবর্তে কেবল অন্যের কথা কপচায়, () কোনোরকম বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদেশী অভিজ্ঞতার অনুসরণ করে, () বাইরের কিছু ব্যক্তির ছড়ি ঘোরাবার সঙ্গে সঙ্গে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে এবং মার্কসবাদলেনিনবাদ ছাড়া সংশোধনবাদ, গোঁড়ামিবাদ ইত্যাদি সবকিছুরই জগাখিচুড়িতে পর্যবসিত হয় তবে এরকম পার্টি বিপ্লবী সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণকে নেতৃত্ব দানে পুরোপুরি অক্ষম হবে, বিপ্লবের বিজয় অর্জনে অক্ষম হবে এবং সর্বহারা শ্রেণীর মহান ঐতিহাসিক লক্ষ্যসাধনে সম্পূর্ণ অক্ষম হবে।’ (পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৪৫৫)

তালিকার ১ থেকে ৫ পর্যন্ত বিষয়গুলো বলা হয়েছে সোভিয়েত পার্টির উদ্দেশ্যে। আর ৬ থেকে ৯ পর্যন্ত বিষয়গুলো বলা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেইসব পার্টির উদ্দেশ্যে যারা মস্কোকে অন্ধভাবে অনুসরণ করছিলো। চীনা পার্টি সোভিয়েত পার্টি সম্পর্কে যেসব অভিযোগ করেছিলো কয়েকবছরের মধ্যে তার অনেক অভিযোগ চীনা পার্টির বিরুদ্ধে উত্থাপন করে আলবেনিয়ার পার্টি। এর মধ্যে বিপ্লবী আন্দোলনের দুটো কেন্দ্র সৃষ্টি হয়েছে। পুরো বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলন বিভক্ত হয়ে গেছে দুই পরস্পর বিদ্বেষী শিবিরে, পিকিংপন্থী এবং মস্কোপন্থী। পরের বছরগুলোতে আমরা লক্ষ্য করি তালিকার ১ থেকে ৫ পর্যন্ত অভিযোগগুলোর অনেকটাই চীনা পার্টির জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে। আর ৬ থেকে ৯ পর্যন্ত উত্থাপিত ধরনগুলো মস্কোপন্থী পার্টিগুলোর সাথে সাথে পিকিংপন্থী পার্টিগুলোর মধ্যে একইভাবে দেখা যাচ্ছে।

৬০ দশকের মাঝামাঝি মস্কোপিকিং বিরোধের উত্তেজনা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানে পার্টি তখন ছিলো গোপন। পূর্বাঞ্চলেও তাই ভাঙনের শব্দ কর্মীরা শুনেছেন অনেক পরে। শেষভাগে এসে অন্যান্য দেশের মতো পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতেও মস্কোপিকিং বিভাজন প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষকসহ শ্রেণী ও গণসংগঠনগুলো প্রথমে বিভক্ত হয়। পরে পার্টিও মস্কো ও পিকিংপন্থী এরকম ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে দাঁড়ায়। খোদ কেন্দ্রের ভূমিকার পার্থক্যের কারণে এই দুই পন্থী পার্টিগুলোর মধ্যে আবার একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে মস্কো তার অনুসারী পার্টিগুলোর প্রতি তার দায়িত্ব পালনে বরাবর সচেষ্ট ছিলো। বস্তুগত সমর্থন ও তাত্ত্বিক দিশাদানে মস্কোর কোন ঘাটতি দেখা যায়নি, আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও সক্রিয় ছিলো। কিন্তু সম্পদের অভাব কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাববলয় তৈরিতে অনাগ্রহ যে কারণেই হোক পিকিংএর পক্ষ থেকে পিকিংপন্থী পার্টিগুলোকে এরকম সমর্থন দিতে দেখা যায়নি। তার ফলে মস্কোপন্থী পার্টিগুলোতে ভাঙন দেখা যায়নি, কিন্তু পিকিংপন্থী পার্টিগুলো একের পর এক ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে। তারা একদিকে ‘মার্কসবাদলেনিনবাদের বিশ্বজনীন সত্যকে কিভাবে প্রয়োগ করতে ও নিজদেশের বাস্তব অনুশীলনের সঙ্গে সমন্বিত করতে হয় তা না জেনে পরিবর্তে’ কেবল পিকিং এর কথা কপচিয়েছে, উপরন্তু ‘কোনোরকম বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদেশী অভিজ্ঞতার অনুসরণ করেছে’ এবং ‘বাইরের কিছু ব্যক্তির ছড়ি ঘোরাবার সঙ্গে সঙ্গে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করেছে’ অন্যদিকে এবিষয়ে কোন কেন্দ্রীয় সমর্থন বা দিকনির্দশনাও পায়নি। কর্তা খোঁজা লোকজনের কর্তার অভাবে তাই পিকিংপন্থীরা এক থেকে দুই, দুই থেকে চার এইভাবে ভাঙ্গতে থাকে। বিপ্লবের নামে নানা লাইনের জন্ম হতে থাকে।

আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক এই বিতর্ককালে চীনে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের মধ্যেকার বিরোধ কমেনি, বরং ভেতরে ভেতরে আরও দানা বাঁধছিলো। উল্লম্ফনের অভিজ্ঞতার পরে মাও সেতুং কিছুটা কোণঠাসা, তাঁর সমালোচক ও বিরোধী অংশই তখন কেন্দ্রীয় কমিটিতে শক্তিশালী। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক। মাও সেতুং এর আহবানে সারাদেশে, বিশেষত তরুণদের মধ্যে, দেখা গেলো ‘নতুন জাগরণ’।।

(চলবে…)