Home » বিশেষ নিবন্ধ » ডুবন্ত ঢাকা, অচল ঢাকা :: কিসের প্রতীকী রূপ

ডুবন্ত ঢাকা, অচল ঢাকা :: কিসের প্রতীকী রূপ

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 3কয়েকদিন আগে টানা বর্ষণে গোটা ঢাকা শহর ডুবে গিয়েছিল। অনেকে ভ্যানে করে পাচ তারকা হোটেল সোনারগাঁওয়ে গিয়েছিলেন। তারা অভিজাত শ্রেণীরই মানুষ। গাড়ি চলাচলের জন্য অচল ঢাকা। এমনিতে যানজট ঢাকার নিত্যদিনের সমস্যা। যানজটে কেবল যে কয়েক কোটি টাকার গাড়ির মালিকরাই ঘন্টার পর ঘন্টা আটকা থাকে তাইই নয়, সাধারণ গরিব মধ্যবিত্তেরও দুর্ভোগের শেষ নেই। তার উপর গত আগস্ট মাসে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট এমনভাবে ডুবেছিল যে, ঢাকাকে মনে হয়েছিল ডুবন্ত ঢাকা। এটা কি কোনো কিছুর প্রতীকী রূপ? আমাদের শাসন ব্যবস্থাই কি ডুবতে বসেছে?

বর্ষাকালে বিশেষ করে শ্রাবন মাসে টানা বর্ষণ বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। তবু ঢাকা কেন ডুবলো? কারণ পানি বেরিয়ে যাবার পথ ছিল না। অথচ ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান খুবই চমৎকার। ঢাকার চারদিকে ঘিরে রয়েছে চারটি নদী। শীতলক্ষা, বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদী। বুড়িগঙ্গা একেবারে শহরের গা ঘেষে। কিন্তু নদী পারে বাতাস খাওয়ার জন্য কেউ যাবেন না। এমনিতেই নদীর পারে বেড়ানোর জায়গা বলে কিছু নেই। (কলকাতায় কিন্তু এখনো লোকে গঙ্গার ধারে বেড়াতে যায়)। তার উপর বুড়িগঙ্গার কালো বিষাক্ত পানি থেকে যে দুর্গন্ধ বের হয় তাতে বেড়ানোর শখ মিটে যাবে মিনিটেই। বুড়িগঙ্গা এখন বিষাক্ত নদীতে পরিণত হয়েছে।

নদী ছাড়াও শহরের ভেতরে ছিল প্রায় অর্ধশত খাল। তার অর্ধেকের বেশি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ইটপাথর দিয়ে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য ঢাকার সবুজ মাঠ ও পুকুর যেভাবে দখল হচ্ছে তেমনি খালও দখল হচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে। নদীর পারের স্থাপনাও নদীকে সঙ্কুচিত করে তুলেছে। কিন্তু প্রভাবশালী লোকের অতি লোভ শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। নদীখাল দিয়ে যে পানি নিষ্কাশন হতো, এখন তা হয় না। তাই ডুবছে ঢাকা শহর। ডুবাচ্ছে কারা? ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত কিছু প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি। বর্তমান সরকারের আমলে এবং অতীত সরকারের আমলে একইভাবে দখলি কারবার চলে আসছে। তাদের কীর্তিকলাপ শুধু ঢাকাকেই ডুবাচ্ছে না, সরকার ও প্রশাসনকেও ডোবাচ্ছে। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট হঠাৎ করে পানির তলায় ডুবে যাওয়াকে প্রতীকী অর্থেই বুঝতে হবে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর আবার ঢাকা শহর অচল হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি’র উপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছিল। ফলে ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছিলেন।

পরের দিন ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে এবং পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে এবার অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রাস্তায় নামেন এবং রাস্তা অবরোধ করেন। ফলে গোটা ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়েছিল। এবারও তারা আক্রান্ত হন। রাত আটটার দিকে একদল যুবক ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েছিল। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের ছেলেরা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে আক্রমণ চালিয়েছিল যাতে ড. জাফর ইকবালের স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকাসহ অনেক শিক্ষক গুরুতর আহত হয়েছিলেন। লেখক ও অধ্যাপক জাফর ইকবাল হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘জয়বাংলা শ্লোগানের এতো বড় অপমান কখনো দেখিনি’। অবশ্য জয়বাংলা শ্লোগানের এই রকম অপমান এবং মুক্তিযুদ্ধের এই মহান শ্লোগানের আড়ালে অপকর্ম চালিয়ে যাবার ঘটনা অনেক আছে। সেটাই আরেকবার দেখলাম গত ১০ সেপ্টেম্বর।

প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ভ্যাট দেবে প্রতিষ্ঠান, ছাত্ররা নয়। কিন্তু অর্থনীতির সামান্য নিয়ম যারা জানেন, তারা এটাও জানেন যে, শেষ পর্যন্ত এর ভার গিয়ে পড়বে ছাত্রদের উপর। অর্থাৎ ছাত্র বেতন বাড়িয়ে দেবে কর্তৃপক্ষ।

যাই হোক, আজকের আলোচ্যসূচি ভিন্ন। কখনো কখনো ঢাকা শহর ডুবে যায়, কখনো বা অচল হয়ে পড়ে। এ জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করলে চলবে না। কারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। বাম সংগঠনগুলো গার্মেন্টসের শ্রমিকদের নিয়ে আন্দোলন করলেও এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার বিরোধী ছোট সমাবেশ ও মানববন্ধন করলেও তারা এখনো বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। মৌলবাদী দলগুলো গোপন সন্ত্রাসী পথ নিয়েছে। সব দিক মিলিয়ে মনে হয়, সরকার আপাতত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। অবশ্য জনপ্রিয়তার অভাব রয়েছে। ফলে সরকার ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে।

হঠাৎ জলবদ্ধতা অথবা ছাত্র আন্দোলনের কারণে সরকার ডুবে যাবে বা অচল হয়ে পড়বে এই রকম নিবুর্দ্ধিতার কথা আমি বলবো না। তবে ডুবে যাওয়া ও অচল হয়ে পড়াকে ভবিষ্যতের কোন অশুভ ইঙ্গিতের জন্য প্রতীকী রূপে ভাবা যেতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কারণে সরকার ডুববেও না, পড়বেও না, অচলও হবে না। কিন্তু নিজের অভ্যন্তরীণ কারণে, সেই অভ্যন্তরীণ শক্তি যারা জমি দখল, খাল দখল, নদী দখল করছে অথবা নিজের দলের সেই মাস্তান বাহিনী যারা জয়বাংলার মতো মহান শ্লোগান দিয়ে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের ভারে প্রশাসন ডুবতে পারে বা অচল হয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা খুব অমূলক নয়। আশা করি প্রতীকী রূপে যা দেখছি, তা প্রতীকী রূপেই থাকুক, বাস্তবে যেন না হয়।।