Home » অর্থনীতি » বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (প্রথম পর্ব)

বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (প্রথম পর্ব)

বিশ্বকে কেবল ‘অধিকার’ আর ‘ইস্যু’র চশমা দিয়ে দেখি না

Last 2অরুন্ধতী রায়। সাম্প্রতিক সময়ের পুরস্কারজয়ী অন্যতম একটি ফিকশনের লেখক। তার ‘দি গড অব স্মল থিংস’ যিনিই পড়েছেন, তিনিই পরবর্তীকালে তার লেখা রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর উৎস খুঁজে পাবেন। তার লেখাগুলো একটি অন্যটির পরিপূরক, আর সেগুলো তাকে কেবল ভারতে নয়, বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছে। তিনি অন্যদের কর্মসূচি বাস্তবায়নেও এগিয়ে আসেন। দি গড অব স্মল থিংয়ের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ১৫ লাখ রুপি তিনি ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে’ দান করেছেন। ‘সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি উচ্চকিত করার জন্য তার পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী লেখালেখির’ জন্য ২০০২ সালে ল্যানন ফাউন্ডেশন তাকে সাড়ে তিন লাখ ডলার (১ কোটি ৬৭ লাখ রুপি) প্রদান করে। তিনি ৫০টি গণআন্দোলন, প্রকাশনা সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, থিয়েটার গ্রুপ ও ব্যক্তির সাথে সংহতি প্রকাশ করে পুরস্কারের ওই অর্থ দান করে দিয়েছেন। আর তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর র‌্যায়ালটি আসে ভালোই। তিনি এই অর্থ আন্দোলন ও ব্যক্তিবর্গের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াও অব্যাহত রেখেছেন। এ কারণে অরুন্ধতী যে বিশ্বকে ধারণ করেছেন, আক্ষরিক অর্থেই তা বেশির ভাগ লেখকের চেয়ে বড়। কিভাবে তিনি অরুন্ধতী রায় হলেন, তাকে কোন বিষয়টা উদ্দীপ্ত করে, কিভাবে তিনি লেখালেখি শুরু করলেন, তা নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেছেন সাবা নকভির সাথে। আউটলুক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ওই সাক্ষাতকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

প্রশ্ন : আপনি লেখক হলেও বেশ কিছু অধিকার (রাইটস) আদায় এবং আন্দোলনের ব্যাপারেও খুবই জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন, দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপনি কিভাবে আপনার বিবর্তনকে মূল্যায়ন করেন?

অরুন্ধতী : প্রথমত আমি বলব, আমি তা বিশ্বাস করি না যে, মাত্র দুটি জেন্ডার আছে। আমি জেন্ডারকে বর্ণালী হিসেবে দেখি, আমি নিজে ওই বর্ণালীর কোনো একটি স্থানে রয়েছি। এক ‘অদ্ভুত’ বন্ধুর মতে, জেন্ডার বর্ণালী বিষয়ক আমার বিবর্তনটা ‘সরাসরির’ চেয়ে ‘ত্বরিৎ’ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমি বিশ্বকে অনেকের মতো কেবল ‘অধিকার’ আর ‘ইস্যু’র চশমা দিয়ে দেখি না। ওটা লেখকের জন্য বিশ্ব দেখার খুবই সংকীর্ণ, ভাসাভাসা পথ। যদি তুমি জানতে চাও আমার লেখালেখির মূলে কী রয়েছি, আমি বলব, সেটা ‘অধিকারের’ বিষয় নয়, বরং তা হলো ‘ন্যায়বিচার’ (জাস্টিস)। ন্যায়বিচার হলো বিশাল, সুন্দর, বিপ্লবী আইডিয়া। ন্যায়বিচার দেখতে কেমন? আমরা যদি বিষয়গুলোকে ‘ইস্যুতে’ বিভাজন করতে থাকি, তবে সেগুলো স্রেফ ‘ইস্যু’ হিসেবে থেকে যায়, যা অন্যভাবে দৃশ্যপটের মধ্যে বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্র। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বিশ্বে এমন কোনো সমাজ নেই যা ন্যায়নিষ্ঠ বা নিখুঁত কিন্তু তাই বলে ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করা আমরা কখনো বন্ধ করব না। আজ আমরা দৃশ্যত বিপরীত দিকে দৌড়াচ্ছি, অবিচারের জন্য সংগ্রাম করছি, এটাকে মূল্যবান স্বপ্ন, লক্ষ্য, আকাক্সক্ষা হিসেবে এর প্রশংসা করছি। ভারতের জন্য ভয়ঙ্কর ট্রাজেডি হলো, এখানে বর্ণবাদীব্যবস্থা অবিচারকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে, এটাকে পবিত্র বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। ফলে আমরা শ্রেণীবিভাজন ও অবিচারকে মেনে নেওয়ার মতো করে তৈরি হয়েছি। এর মানে এই নয় যে, অন্য সমাজগুলো ন্যায়নিষ্ঠ। অন্য সমাজগুলো অবিশ্বাস্য মাত্রার যুদ্ধ, গণহত্যার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আমি স্রেফ আমাদের সমাজের কল্পনাপ্রতিভা নিয়ে কথা বলছি। কোনো মানুষ কী করতে পারে, কিভাবে আমরা এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি? আমরা যা করতে পারি, আমাদের অনেক তা করছে, এটা জেনে যে এমনকি একজনও যদি না শোনে, আমরা যদি কখনো জয়ী হতে না পারি, কিন্তু আমরা কায়মোনাবাক্যে তা চাই বলে আমরা বিজয় মিছিলের নামে যে মৃত্যু মিছিল এগিয়ে চলছে, তার বিপরীত দিকে নেমে যাব।

প্রশ্ন : আপনি যখন এই কাজে হাত লাগালেন, তখন কী বোঝা সম্ভব কেন সমসাময়িক এত আন্দোলনে নারীরা সামনের কাতারে রয়েছে?

অরুন্ধতী : নারীরা কেন সম্পৃক্ত হয়েছে? বিস্তারিত বললে বলতে হয়, তারা উভয় দিক থেকে আক্রান্ত হয়েছে ঐতিহ্য থেকে এবং সেইসঙ্গে বাজারচালিত ‘আধুনিকতা’ থেকে। আমি নিজে কেরালায় ‘ঐতিহ্য’ থেকে পালানোর স্বপ্ন দেখে বড় হয়েছি, কিন্তু তারপর যে ধরনের আধুনিকতার মুখোমুখি হয়েছি, সেটা থেকেও পালাতে চেয়েছি। এত কিছুর মধ্য দিয়ে চলেও নিজের রাস্তা খুঁজে নিতে হবে। এই দেশে আমাদের এমন লোক আছে, যারা অবলীলায় মেয়ে শিশু হত্যা, মেয়ে ভ্রুণ হত্যার কাজ করে, এই প্রক্রিয়ায় তারা কোটি কোটি মেয়ে শিশুকে মেরে ফেলে। এটা কেবল সনাতন পল্লী সমাজেই ঘটে তা নয়, বর্ণভিত্তিক অনার কিলিংও হয়। আবার একই সময় আমাদের কাছে বিশ্বের যেকোনো স্থানের চেয়ে সবচেয়ে মুক্ত, সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সবচেয়ে স্বাধীন ও সংস্কারমুখী, মৌলিক চিন্তাধারার নারীও রয়েছে। ভারতে তারাই সংগ্রামের সামনের কাতারে রয়েছে। আমরা কয়েক শ’ বছর একইসঙ্গে বাস করছি।

সব ধরনের জীবিকার ওপর আক্রমণ, ভূমির ওপর আক্রমণ এসব কিছু নারীদের মৌলিকভাবে আক্রান্ত করে। ফলে আপনি যদি নর্মদা আন্দোলনের দিকে তাকান, যেখানে আমরা লাখ লাখ লোকের বাস্তুচ্যুতি আর পুরো নদী উপত্যাকার সভ্যতা ধ্বংসের কথা বলছি, সেখানে নারীরা যৌথভাবে কাজ করে এবং ভূমির মালিক, আদিবাসী নারীএবং আমি বলছি না যে, আদিবাসী সমাজ হলো নারীবাদী গুণের কিছুটা আদর্শ, তবে এই বোধ রয়েছে যে, নারীরা সহমালিক, এই ভূমি তাদেরও। তবে নারীদের পুরো জনসংখ্যাকে বাস্তুচ্যুত করে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পুরুষদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লোকগুলো মদ আর মোটরসাইকেলের পেছনে তা খরচ করবে। পরিণতিতে নারীরা আধুনিকতার ভয়ঙ্করতার মধ্যে পড়ে যাবে, যেখানে তাদের সবাই দিনমজুর হিসেবে বাজারে যাবে কিংবা এমনসব পন্থায় শোষিত হবে যাকে কখনো নারীবাদী ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, যদিও বিষয়টা তখনো নারীবাদীই থাকে। বাস্তুচ্যুতির বিরুদ্ধে বাস্তারের ৯০ হাজার সদস্যবিশিষ্ট ‘ক্রান্তিকারি আদিবাসী মহিলা সংস্থান’কে আসলে নারীবাদী সংগঠন মনে করা যায় না। তবে তারা লড়াই করছে, কিভাবে? নর্মদা উপত্যাকায় নারীরাই সংগ্রাম করছে। এই লড়াইপ্রক্রিয়ায় তারা বদলে গেছে, নিজেদের দৃঢ় করেছে। আমি যখন বাস্তার গিয়েছিলাম, আমি ওয়াকিং উইথ দ্য কমরেড(২৯ মার্চ, ২০১০) লিখেছিলাম, আমি বিস্মিত হয়েছিলাম এটা দেখে যে, আমার পাহারায় থাকা গেরিলা যোদ্ধাদের অর্ধেক ছিল নারী। আমি তাদের সাথে অনেক সময় ধরে, কয়েক দিন ও রাত, কথা বলে জানতে চেয়েছি কেন তারা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্যই তাদের অনেকে সালওয়া জুদুম ও আধা সামরিক বাহিনীর ধর্ষণ, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনের নৃশংসতা দেখেছে। তবে তাদের অনেকে এটাকে তাদের নিজের সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা এবং সহিংসতা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়ও মনে করেছে। আর অবশ্যই তারা ‘দলের’ মধ্যকার পুরুষতন্ত্র ও সহিংসতার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। একটা সময় আমি এবং অন্য সব নারী কমরেড গোসল করার জন্য নদীতে নেমে গেলাম। তাদের কয়েকজন নজরদারি করতে থাকল, আমরা বাকিরা সাঁতার কাটলাম, গোসল করলাম। উজানেও কয়েক কৃষাণীও গোসল করছিল। আর আমি ভাবলাম, ‘আমরা কারা পানিতে আছি, একটু দেখো! এই প্রবাহমান পানিতে নারীদের দেখো।’ কী ব্যাপারটাই না ছিল তা। সুতরাং তোমার প্রশ্নের জবাবে বলছি, আন্দোলনগুলোতে নারীরা কেন সামনের কাতারে রয়েছে, তার ভালো যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় পরিপূর্ণ যেসব নারী এসব করতে পারে, তাদের বিষয়টা খুবই বিশেষ। আর আমাদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত, এটা কেবল তেমন গুটিকতেক নারীর জন্য বিশেষ কিছু নয়। এটা অনেক অনেক নারীর বিষয়, কেবল নগরের আধুনিকতায় থাকা নারীদের বিষয় নয় এবং কারো স্ত্রী বা মা বা বিধবা বা বোন হওয়ার সুবাদে তারা এখানে এসেছে, বিষয়টা তেমনও নয়। তারা তারাই। তারা মহান।।

(চলবে…)