Home » রাজনীতি » মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বনাম রাজরোগ ও রাজপাপ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বনাম রাজরোগ ও রাজপাপ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 2একটি চালু কুইজ দিয়ে শুরু করি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার হোলসেল এজেন্ট কারা? কথায় কথায় কারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশে কারা প্রতিদিন আমজনতাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শেখায়, বিতরন করে? যেন এটি বিশেষ কোন গোষ্ঠির একচেটিয়া সম্পত্তি। অন্যায়অনৈতিকতা, দুর্নীতিলুন্ঠন, গুমখুনের প্রতিবাদ জানালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী বলে কারা? উত্তরটি সকলের জানা। এও জানা যে, চেতনাধারী দলটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারাকে আরো তীক্ষ্ণধী করে এই দেশে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চলেছে।

ষাট দশকে আইয়ুব আমলের পরিস্থিতির দিকে ফিরে দেখা যাক; ‘প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন অবসানের পর গণনিপীড়ন পরিচালনার জন্য নানাবিধ পদ্ধতি গ্রহন করা হয়। প্রথমেই প্রকাশনা শিল্পের ওপর আঘাত হানা হয়। সরকারের কোন নীতি বা ব্যাখ্যার সমালোচনা করে কিছু প্রকাশিত হলেই তা দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।১৯৬৪ সালের ১৫ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর, এই ৬ দিনের মধ্যে প্রদেশের সংবদাদপত্র ও প্রকাশনার ওপর সরকার নতুন আইন জারি করার মাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে’ (সূত্র: উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানঃ রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতি পৃ:২৮৪, ২৮৫)। আইয়ুবে এই দমননীতির বিরুদ্ধেই সংগঠিত হয়েছিল গণঅভ্যূত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালীর একচেটিয়া বিজয় ও মুক্তিযুদ্ধ। ইতিহাসের কোন শিক্ষা ধারন না করে পূর্বসূরী দলটির তৈরী কালো আইনকে আরো শানিত করে চেতনাধারীরা জনগনকে ষাট দশকের কালো দিনগুলিতে আবার নিয়ে যেতে চায়?

বাঙালীর মহত্তম অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। সাহস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, পরার্থপরতা ও সামষ্টিক কল্যাণের জন্য মুক্তিকামী মানুষ ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান উৎসর্গ করেছিল। সর্বাধিক প্রিয় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল অকাতরে। পঞ্চাশ দশক থেকে বাঙালীর মনোজগত ও আকাঙ্খায় অঙ্কুরিত স্বাধিকারস্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি স্বাধীনতা অর্জনে পূর্ণতা লাভ করে সুদীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মূলগত আকাঙ্খা ছিল গণতন্ত্র ও ন্যায্যতা। স্বাধীনতার পরে মুক্তিযুদ্ধের একচেটিয়া দখল নিতে গিয়ে জনআকাঙ্খার মূলে কুঠারাঘাত হেনে গণতন্ত্র ও ন্যায্যতাকে বিসর্জন দিয়ে কতিপয়তন্ত্রের সূচনা ঘটেছিল। এসেছিল পরিবারতন্ত্র আর বশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের ধারা, সে গণতান্ত্রিক বা সামরিকযে লেবাসেই হোক না কেন।

যে রাষ্ট্রের জন্মের সূচনার সাথে জড়িয়ে আছে সত্তরের নির্বাচন, তৎকালীন পাকিস্তানের পূব অংশের মানুষ ১৬৯ আসনের ১৬৭ টিতে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করে জানিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানীদের সাথে আর নয়। নির্বাচনের এই ফলাফলই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। অথচ দেশ স্বাধীনের মাত্র একবছরের মধ্যে সুষ্ঠ, জনঅংশগ্রহনমূলক নির্বাচন বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অর্জনটিকে প্রহসনে পরিনত করা হয়। সেই যে শুরু, দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে প্রহসন অব্যাহত থেকে গেছে একদলীয় কিংবা একক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এভাবেই সাংবিধানিক কর্তৃত্ববাদী যে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তা মুক্তিযু্েদ্ধর মৌল চেতনার পরিপন্থি।

এখানে চেতনার নামে রাষ্ট্রসরকার একাকার হয়ে গেছে। নিম্নমধ্য আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের, দেশ হিসেবে উত্তরনে সরকারের উচ্চাভিলাষের খেসারত দিচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। একটি বৈষম্যমূলক, অন্যায্য, অসম এবং সুশাসনবিহীন রাষ্ট্রে কতিপয়ের ইচ্ছাধীন হয়ে জনগন গত সাড়ে চার দশক ধরেই তারা আর্তঅসহায়, কিন্তু এরকমটি আর কখনই ঘটেনি। রাষ্ট্র জনগনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা করবে, পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করবে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে রাষ্ট্র। ব্যক্তি মুনাফা নিশ্চিত করতে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান তৈরীতে ক্রমাগত সহায়তা দিচ্ছে,পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে শক্তিমান না হতে পারে সেই কাজটিই করছে।

সবশেষ চার দশকে রাষ্ট্র নীতিগতভাবে জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তি মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্র আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের হয়ে উঠতে পারেনি। উচ্চশিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের জন্য মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ওপর। যদিও আমাদের ভিভিআইপিরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, শাঁসালো রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসকলেই এসব বিষয়ে সিঙ্গাপুর, লন্ডন, কোলকাতাদিল্লিসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষমতা, পদ বা অর্থের জোরে তারা মৌলিক চাহিদা মেটাতে ভোগ করছেন সর্বোচ্চ সুবিধা । বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ‘পয়সা যার, রাষ্ট্র তার’ এই নীতিকেই সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। সমষ্টির বদলে ব্যক্তি, পরিবার, বংশানুক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের হাত থেকে ছুটে গেছে।

এজন্যই কি সবশেষ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনাশিক্ষার অধিকার সংকুচিত করতে সরকার শিক্ষাকে পণ্য করে তুলছে? আবার ভালমানুষির সাথে বলছে, ছাত্রদের ওপর নয়, প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট প্রযোজ্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জনগনের অভিপ্রায় অনুযায়ী রচিত সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রযেছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রম বৃদ্ধিসাধন এবং জনগনের বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের অর্জন নিশ্চিত করা যায় ঃ ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারনের মৌলিক উপকরনের ব্যবস্থা’। সরকার শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকার সংকুচিত করতে ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে এখন মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে?

প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে ছাত্ররা। তারা শিক্ষার অধিকার চায়। ভ্যাট আরোপ বাতিল দেখতে চায়। শিক্ষাকে পণ্য নয়, অধিকার হিসেবে চায়। তিন লক্ষাধিক টাকার উর্ধ্বে ঘোষিত জাতীয় বাজেটে সরকারের উচ্চাভিলাষের শিকার হতে চায়না। সেজন্য তারা রাস্তা অবরোধ করেছে। অচল করে দিয়েছে ঢাকা। জনজীবনে নামিয়ে এনেছে অসহনীয় দুর্ভোগ। অবশেষে ছাত্রদের সংবঘদ্ধ আন্দোলনের মুখে সোমবার দুপুরে সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ছাত্ররা আনন্দ মিছিল করেছে। আশঙ্কা ছিল, কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে যে কোন সময়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে রায়ট কার, টিয়ার সেল, রাবার বুলেট নিয়ে সরকারী বাহিনী আর সশস্ত্র ভাড়াটে বাহিনী। কারন নিকট অতীতেই তো এদেশ দেখেছে পেশাজীবিরাছাত্ররা কোন ইস্যুতে মাঠে নামলে সরকারী ও ভাড়াটে বাহিনীর নিষ্ঠুর আচরন এবং বর্বরতার শিকার হয়েছে। অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মানার মধ্য দিয়ে স্বস্তির সূচনা ঘটেছে, তবে তা কতদিনের জন্য সেটি বলার সময় আসেনি।

একেই বলা হচ্ছে, রাজরোগ এবং রাজপাপ। নারায়নগঞ্জের সরকার দলীয় এমপি সাত খুনের পর বলেছিলেন, সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। যদিও কে সর্ষে, কে ভূত তা তিনি পরিস্কার করেননি। তবে সর্ষে বা ভূত আপাতত: চেনা না গেলেও একটি বিষয় পরিস্কার যে, রাজরোগের কারন অন্যত্র। সরকার শান্তির নহর বইয়ে দিয়ে সবকিছুই খুব সুনিশ্চিত ঠাওর করে বসে আছে! রাজদন্ডের সুনীতি রাজ্যশাসনে এখন আর প্রয়োজন নেই। রাজ্যের সকল শক্তি যে এখন তার নিজের শক্তি! অপশক্তি, বিরুদ্ধ শক্তির কথা তারা ভুলেই গেছে। নীতিহীনতার কারনে অপশক্তি, বিরুদ্ধ শক্তি যে নিজেদের মধ্যে উৎপন্ন হতে পারে এই সম্ভাবনা প্রায় ভুলতে বসেছে। অতীতবর্তমান থেকে কোন শিক্ষাই নিচ্ছে না। যদিও ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এরকম চলার সম্ভাব্য পরিনতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করলেও কে শোনে কার কথা!

এই সত্যটি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সামান্য হলেও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন ২০১৩ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরপরই। আত্মদর্শন আর কি! সে সময়ে বিআরটিসি’র এসি কোচ উদ্বোধন করতে গিয়ে তাঁর বক্তব্যে অনেকটা স্বগাতোক্তির মত প্রকাশ পেয়েছিল – ‘এত উন্নয়ন করেও আমাদের সব প্রার্থীরা হেরে গেল, বিপরীতে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীরা নির্বাচিত হল। তাহলে উন্নয়ন করে কি লাভ, কাদের জন্য উন্নয়ন’! মনে হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছেন। সে সময়ে তিনি জেলআতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছিলেন। যতটা নিজের জন্য নয়, তার চেয়েও বেশি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার জন্য। সংবেদনশীলতার সাথে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে জেলে যেতে হবে। কেয়ামত পর্যন্ত নির্বাচন হবে না। রাষ্ট্রনায়কোচিত দুরদর্শীতায় তিনি সম্ভবত ভবিষ্যত: দেখতে পাচ্ছিলেন এবং সামাল দিতে যে কোন মূল্যে একক নির্বাচনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

যাদের ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন বানিয়ে নির্বিকার ঔদাসীন্যে বলা হচ্ছে, বিচার হবে, কাউকে ছাড়া হবে না, কঠোর শাস্তি হবে বলে খুনগুম, দুর্নীতিলুন্ঠন প্রতিদিন এড়িয়ে যাচ্ছে সরকার, সেই অবিচার যে একদিন রাজদন্ডকেই দুর্বল করে ফেলতে পারে। রাজ্যশাসনের দুর্বলতা পাপ আকারে দেখা দিলে পাপমোচনের উপায় থাকে না। রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন, ‘আমাদের মধ্যে যেখানে পাপ আছে, শত্রু সেখানে জোর করিবেই আজ যদি না করে তো কাল করিবে, এক শত্রু যদি না করে অন্য শত্রু করিবে অতএব শত্রুকে দোষ না দিয়া পাপকে ধিক্কার দিতে হইবে’।

মুক্তিযুদ্ধের মূলগত আকাঙ্খা ও চেতনা বাস্তবায়নে এইসব শঠতাভ্রষ্টতা আর রাষ্ট্র ও সরকার এক করে ফেলার কারনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রাজনৈতিকসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের। দলীয়করন, স্বজনতন্ত্র, দুর্নীতি ও নীতিহীনতার ক্ষয়রোগাক্রান্ত এইসব প্রতিষ্ঠানগুলি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। সংবিধান ও সুনির্দিষ্ট আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলি দলীয় রাজনীতির মত ব্যক্তি ও পরিবারমুখী হয়ে পড়েছে। জন্ম নিয়েছে দলদাস প্রথা ও প্রতিযোগিতা।

এসবের মিলিত ফল আঘাত করছে রাষ্ট্রকে। প্রতিষ্ঠানগুলি ন্যায্যতা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর শঠতা ও নীতিহীনতা সরাসরি আঘাত করছে জনগনকে। এক্ষেত্রে সবশেষ উদাহরন সৃষ্টি করেছে নির্বাচন কমিশন। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন, উপজেলা এবং অতি সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আস্থা হারিয়েছে সকলের। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দুর্বলতার কারনে নির্বাচনমূখী গণতন্ত্র এই ভূখন্ডে অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইরত, ন্যায্যতাসুশাসনের প্রশ্ন তো অনেক দুরের কথা।।