Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৮)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৮)

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা

আনু মুহাম্মদ

Last-4১৯৬৬ সালেই শুরু হলো বিপ্লবউত্তর চীনের ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্ব। এটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবনামেই বিশ্বব্যাপী পরিচিত। চীনে এর আনুষ্ঠানিক নাম দেয়া হয়েছিলো মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মাও সেতুং পার্টিতে আবারো নিজের মতাদর্শিক অবস্থান সংহত করেন। পার্টির কেন্দ্রীয় অনেক নেতা, এমনকি শীর্ষে অবস্থানরত লিউশাউচিসহ পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সরকারি কমকর্তার অবস্থান বিপ্লবের জন্য ক্ষতিকর, বিপজ্জনক বলে অভিহিত হয় এবং তাঁরা তীব্র সমালোচনা ও আক্রমণের শিকার হন। ১৯৬৯ সালে মাও আনুষ্ঠানিকভাবে এর সমাপ্তি ঘোষণা করলেও এর রেশ ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে কেন্দ্র করে চীনে যখন বিরাট উথালপাথাল হচ্ছে, সেসময় চীন বিপ্লব সম্পর্কে আশংকিত হবার অনেক যুক্তি ছিলো। কারণ ততোদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের প্রতি সবরকম সমর্থনসহযোগিতা প্রত্যাহার করেছে, দুদেশের মধ্যে বৈরিতা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজের রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকসামরিক প্রভাববলয় সম্প্রসারণে ব্যস্ত তখন। এর অংশ হিসেবে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আগ্রাসন চলছে। ভিয়েতনামে চলছে নৃশংস গণহত্যা, ভিয়েতনামী জনগণ চীনের দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের অনুপ্রেরণায় শক্তিশালী প্রতিরোধ চালাচ্ছেন। সবমিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণা ছাড়াও বাইরের জগতে চীনের ভেতরের ঘটনাবলীর ভিন্ন ভিন্ন, কখনো একেবারে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদ সমর্থক প্রচারমাধ্যমে বহু বছর ধরেই চীন বিপ্লবের সমাপ্তির ঘন্টার কথা বলা হচ্ছিলো। সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হবার পর তারা নিশ্চিত হয় যে, চীনের প্রতিবিপ্লবী পরিবর্তন আসন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতন্ত্রী জার্নাল মান্থলি রিভিউ এগুলোর একটা পর্যালোচনাও করেছিলো তখন। বহুজাতিক পুঁজির মুখপত্র ফরচুন তাদের ১৯৬৬ সালের নভেম্বর সংখ্যায় আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছে, গত গ্রীষ্ম থেকে চীনের যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন মানবজাতির এক চতুর্থাংশের বিশাল দেশকে নাড়া দিচ্ছে তা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মাও সেতুংএর কমিউনিস্ট তত্ত্ব ও প্রয়োগ চর্চা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবং এই চীন এখন এই প্রবল তাড়ায় যেকোনদিকে চলে যেতে পারে। এটি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে দেশটিকে ঠেলে দিতে পারে। ইতিহাসের গতি যে পরিণতি নির্দেশ করে তাতে এই সম্ভাবনাই বেশি যে, কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটবে এবং তার সঙ্গে মাও সেতুংএরও।

তবে একইমাসে (নভেম্বর, ১৯৬৬) প্রকাশিত বিখ্যাত জার্নাল সায়েন্টিফিক আমেরিকানএর সংখ্যায় চীনের শিল্পায়ন সহ উন্নয়নের বিশ্লেষণ করে লেখেন একজন জাপানী। সেই লেখা চীনের একটি ভিন্ন চিত্র এবং ভবিষ্যতের একটি ভিন্ন সম্ভাবনা হাজির করে। সেখানে বলা হয়, চীনে এখন মাথাপিছু আয় ১০০ ডলার, মোট জাতীয় আয় ৬০ বিলিয়ন ডলার। এইদেশ এখন উত্তরণ (টেকঅফ) স্তর পার হয়ে শিল্পায়ন স্তরে প্রবেশ করেছে। চীন যদি জাপানের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে তাহলে খুব দ্রুত পরিবর্তনের জন্য এইদেশ শিল্প জ্ঞান ও পুঁজি সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে এবং উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পর্বে প্রবেশ করবে। ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এই দেশ জাপানের বর্তমান মাথাপিছু আয়ের স্তরে (৬২০ মার্কিন ডলার) প্রবেশ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আয়ের শতকরা ৭০ ভাগের কাছে পৌঁছে যাবে।

যাইহোক, সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি। এতে তরুণদের ভূমিকা ছিলো বরাবরই প্রধান। মাও সেতুং তাদের ওপরই ভরসা করেছিলেন। ২৮ জুলাই রেড গার্ড প্রতিনিধিরা বিপ্লব রক্ষার জন্য আহবান জানিয়ে মাও সেতুংকে একটি চিঠি লেখেন। এর উত্তরে মাও বিশাল পোস্টার আকারে তাঁর বক্তব্য উপস্থিত করেন যার শিরোনাম ছিলো, বোম্বার্ড দ্য হেডকোয়ার্টার্স, তা ছিলো প্রতিবিপ্লবের কেন্দ্রে আঘাতকরবার আহবান। মাও লেখেন, কমিউনিস্ট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও চীনে বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন এলিট ব্যক্তিরা এখনও সরকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বমূলক অবস্থান ধরে আছে।সবার দৃষ্টি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা লিউ শাওচি এবং দেং জিয়াও পিংএর দিকে গেলেও তাঁরা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে কখনও বহিষ্কার হননি। তবে পার্টি ও সরকারে তাঁদের প্রভাব কমে যায়, আপেক্ষিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। আরেকজন নেতা লিন পিয়াও অনেক সামনে আসেন যিনি ১৯৭১ সালে এক প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত হন।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে সাংগঠনিকভাবে মূল ভূমিকায় ছিলো রেড গার্ড। সারাদেশ জুড়ে প্রধানত তরুণদের নিয়ে গঠিত এই সংগঠন বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বক্তব্য প্রচার করতো, জমায়েত করতো মানুষকে, নাটক গান বিতর্কসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতো, গ্রামশহরকমিউনকারখানায় সন্দেহভাজন প্রতিবিপ্লবী বা গণবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের গণশুনানীর সম্মুখীন করতো। সমালোচনা হতো, তাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়া হতো। মাও সেতুং এই তরুণদের উদ্দেশ্যেই বলেছিলেন, এই বিশ্ব একই সঙ্গে তোমাদের এবং আমাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি তোমাদের। তোমরা তরুণেরা, জীবনের প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ, সকাল ৮টা/৯টার সূর্যের মতো। তোমাদের ওপরই আমাদের ভরসাএই বিশ্ব তোমাদের। চীনের ভবিষ্যৎ তোমাদেরই হাতে।

(চলবে…)