Home » প্রচ্ছদ কথা » ন্যায্য প্রতিবাদকে কেন ভয় ক্ষমতাসীনদের

ন্যায্য প্রতিবাদকে কেন ভয় ক্ষমতাসীনদের

আমীর খসরু

Coverছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের উপরে পুলিশের গুলিতে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নিহত হয়েছেন চারজন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। স্থানীয় জনগণের এই প্রতিবাদবিক্ষোভ কোনো সরাসরি রাজনৈতিক কারণে না হলেও মানুষের মধ্যে জমে থাকা তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিক্ষোভকারীরা সরকার পতনের আন্দোলন করেনি, করেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ। ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে নিত্যদিনই। সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সাথে সাথে দোষীদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোর্পদ করতো। কিন্তু তা হয়নি বলেই মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছে।

শেয়ারবাজার লুণ্ঠন কিংবা ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট যারা করে তারা যেমন দায়মুক্তির সংস্কৃতির সুফল ভোগকারী, ঠিক তেমনিভাবে ধর্ষক কিংবা যৌন সন্ত্রাসীও ভিন্ন ধরনের দায়মুক্তির সুফল প্রাপ্ত

ধর্ষণের ঘটনা এটাই যে প্রথম তা নয়। মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারসহ এ ধরনের সংস্থাগুলোর যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে ভয়ঙ্কর এক চিত্র ফুটে উঠে। অধিকার ও মহিলা পরিষদের হিসেবে বছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষিতা হয়েছেন ৩৮১ জন। এই সংখ্যার মধ্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যাই বেশি। এমনকি প্রতিবন্ধীও এ থেকে রেহাই পায়নি। এটাই যে পুরো তথ্য তা নয়, সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ভিত্তিতেই এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়। তাছাড়া আমাদের সমাজটি এমন যে, ধর্ষিত হলে অনেক ক্ষেত্রেই তা নির্যাতিতের পরিবার গোপন করে যায় নানা কারণে। অধিকারএর প্রথম ছয় মাসের রিপোর্ট অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২৯৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং এর মধ্যে ১৮৭টি মেয়ে শিশু। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৮ জন। ২৯৮ জনকে ধর্ষণের পরে এর মধ্যে ৩২ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দায়মুক্তি প্রাপ্তির কারণে এমন ঘটনাগুলো ঘটছে। এ কথাটি স্পষ্ট যে, এ বছরের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যৌন সন্ত্রাসের সাথে প্রত্যন্ত গ্রামের ঘটনাগুলো কোনক্রমেই আলাদা নয়। এর মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। যোগসূত্রটি এখানে যে, ১৪ এপ্রিলের ঘটনার যদি বিচার হতো তাহলে নিশ্চয়ই অপরাধীরা ভিন্ন বার্তা পেয়ে যেতো। একথা সবার মনে আছে যে, ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালনকারী ছাত্রলীগ নেতা যখন বিচার ছাড়া সমাজে ঘুরে বেরিয়েছে বীরদর্পে এবং তার অন্যায়, কুকর্মকে যখন মহান কর্মকান্ড ও কৃতিত্ব বলে প্রচার ও গণ্য করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, তখনই অন্যান্য অপরাধীরা এমন বার্তাটি পেয়ে গেছে যে, কোনো বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না তাদের।

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে যৌন সন্ত্রাস এমন পর্যায়ে বেড়ে যায় যে, ধর্ষিতাই যে শুধু আত্মহত্যা করেছেন তাই নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যৌনসন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে হয়েছে শিক্ষককে, মাবাবা এমনকি নানাকে পর্যন্ত। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ধর্ষণের শিকার ২ শিশু আত্মহত্যা করছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্টে বলা হয়েছে।

নারীর প্রতি যে অন্যায় ও বর্বর আচরণ করা হচ্ছে তাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। সমাজের সামগ্রিক যে পরিস্থিতি তারই প্রতিফলন এসব ঘটনা। শেয়ারবাজার লুণ্ঠন কিংবা ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট যারা করে তারা যেমন দায়মুক্তির সংস্কৃতির সুফল ভোগকারী,ঠিক তেমনিভাবে ধর্ষক কিংবা যৌন সন্ত্রাসীও ভিন্ন ধরনের দায়মুক্তির সুফল প্রাপ্ত। সামগ্রিকভাবে সামাজিক ভারসাম্য যখন বিনষ্ট করা হয়, অন্যায় যেখানে ন্যায়ের উপরে কর্তৃত্ব করে, আইনের শাসনের বদলে আইনকে যখন শাসন করা হয় তখনই এমন অসুস্থ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে বাধ্য।

সামাজিক এই অবস্থাকে কোনোভাবেই রাজনীতির বাইরের বা এর সাথে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। যেখানে সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি থাকে, যে সমাজে মানুষের সামগ্রিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয়া হয়, রাষ্ট্র ব্যবস্থাটি যখন হয়ে পরে কতিপয় বা এককের, সেখানে এ ধরনের ঘটনাবলী অনিবার্যভাবে ঘটবেই। অতীতেও ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে।

শাসন ব্যবস্থাটি যখন হয়ে পরে দমনপীড়নের যন্ত্র, তখন সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এর প্রভাব পড়বেই, যেমনটি এখন পড়ছে। শাসকদের যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকতো, তাহলে রাষ্ট্রের ম্যানেজার হিসেবে পুরো সরকার এবং এর অন্যান্য শাখা যেমন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ পুরো ব্যবস্থাটিই ওই জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থার আওতায় চলে আসতো। কিন্তু শাসকদের জবাবদিহিতার কোনো কারবার নেই বলে পুরো ব্যবস্থাটি হয়ে পড়েছে ভিন্ন মাত্রিক। আর এ কারণেই জনগণ যখন প্রতিবাদ জানাতে, ন্যায় ও ন্যায্যতা প্রাপ্তির জন্য রাজপথে নামে তখন অন্যায়কে দমনের চাইতে বেশি মনোযোগী হতে হয় ন্যায্য প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রতিহত করার জন্য। এই প্রতিহত করার ধরনও এক এবং অভিন্ন। গ্যাসবিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদই হোক আর ধর্ষণের বিচার দাবিতেই হোক সব প্রতিবাদকেই দমন করা হয় নিষ্ঠুর বর্বর পন্থায় ও পদ্ধতিতে। কারণ যেকোনো ধরনের প্রতিবাদকে জবাবদিহিতাহীন, প্রতিনিধিত্বহীন কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা ভয় পায়, ভীত থাকে। কারণ তাদের একমাত্র ভীতি জনগণের প্রতিবাদ। কিন্তু এ কথাটিও সত্য যে, মানুষের চিন্তা ও বিবেক অর্থাৎ মনোজগতকে কখনো জোর করে বশ করা যায় না, বধ করা যায় না, বন্ধ করা যায় না, প্রতিহত করা যায় না, এমন কি বন্দীও করা যায় না। কঠোর নির্যাতনের ভয়ভীতি প্রদর্শনে সাময়িক ঠেকানো যায় মাত্র।।