Home » অর্থনীতি » বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (দ্বিতীয় পর্ব)

বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (দ্বিতীয় পর্ব)

আমি কখনো আমার জীবনে ওই পুরুষ চরিত্রটি দেখিনি, যে আমাকে দেখে রাখবে, সুরক্ষা দেবে

Last-5অরুন্ধতী রায়। সাম্প্রতিক সময়ের পুরস্কারজয়ী অন্যতম একটি ফিকশনের লেখক। তার দ্য গড অব স্মল থিংযিনিই পড়েছেন, তিনিই পরবর্তীকালে তার লেখা রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর উৎস খুঁজে পাবেন। তার লেখাগুলো একটি অন্যটির পরিপূরক, আর সেগুলো তাকে কেবল ভারতে নয়, বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছে। অরুন্ধতী যে বিশ্বকে ধারণ করেছেন, আক্ষরিক অর্থেই তা বেশির ভাগ লেখকের চেয়ে বড়। কিভাবে তিনি অরুন্ধতী রায় হলেন, তাকে কোন বিষয়টা উদ্দীপ্ত করে, কিভাবে তিনি লেখালেখি শুরু করলেন, তা নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেছেন সাবা নকভির সাথে। আউটলুক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ওই সাক্ষাতকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

(গত সংখ্যার পর)

প্রশ্ন : আপনার জীবনে এমন কী অনুপ্রেরণা ছিল যা আপনাকে এই আপনাতে পরিণত করেছে?

অরুন্ধতী : একেবারে প্রথমে আসে আমার বুনো ও ব্যতিক্রমধর্মী মায়ের কথা। আমার অনুমান, তিনি আশ্চর্যময় এবং একই সাথে নির্মমও। তিনি মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই আমাকে একেবারে গুঁড়িয়েও দিতে পারতেন। তোমার হয়তো উচিত তার সাক্ষাতকার নেওয়া, আমার নয়। তিনি ছিলেন সিরিয়ান খ্রিস্টান পরিবারের সদস্য, তারা কোনো অর্থেই সম্পদশালী ছিলেন না। তারপর তিনি তাদের সামাজিক বলয়ের বাইরের একজনকে, এক বাঙালিকে বিয়ে করলেন। কয়েক বছরের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হলো, তিনি কেরালায় ফিরে তার মায়ের সাথে বাস করতে শুরু করলেন। তাকেএবং আমাদেরকে এই চরম বর্ণবাদ ও শ্রেণীবিভাজনপূর্ণ, সম্পদশালী ও ভূস্বামী সম্প্রদায় পুরোপুরি এড়িয়ে চলত। তবে এখন তিনি অবশ্যই খ্যাতিমান। কিন্তু তখন প্রায়ই আমার ভাই আর আমার ওপর তার সব রাগ ঝাড়তেন। বিষয়টা আমরা বুঝতাম, তবে তাতে অবস্থা কেবল আরো কঠিন হতো। মায়ের সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল খুবই জটিল, ১৭ বছর বয়সে আমি বাড়ি ছাড়ি, ফিরি অনেক বছর পর। অনেক লোকের কাছে পরিবারটি পরিমিত নিরাপদ স্থান মনে হয়, কিন্তু যারা দ্য গড অব স্মল থিংস পড়েছে, তারা জানে আমার কাছে তা ছিল বিপজ্জনক জায়গা। আমি ওই স্থানে অপমানিত হতাম। আমি যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি স্থানটি ত্যাগ করতে চেয়েছিলাম। আমি এমন এক গ্রামে বেড়ে ওঠছিলাম, সেখানে সবকিছুরই উপস্থিতি ছিল। স্থানটিতে ধর্মীয়হিন্দু, খ্রিস্টান, ইসলাম, মার্কসবাদসহাবস্থান ছিল দারুণ। আমরা বিশ্বাস করতাম, বিপ্লব আসছে। সবখানে ছিল লাল পতাকা আর ইনকিলাব জিন্দাবাদ! কিন্তু তবুও স্থানটি তখনো ছিল অত্যন্ত ধর্মীয় কুসংস্কারপূর্ণ এবং সবসময় বর্ণ প্রাধান্য পেত। আমি যখন খুবই ছোট ছিলাম, তখন থেকেই আমি এটা বোঝার চেষ্টা করতাম। এটা আমাকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে, আমি খাঁটিসিরিয়ান খ্রিস্টান নই, আমি কখনো ওই মহান সমাজের অংশ হতে পারব না। আমি সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠতে থাকি, ওই গ্রামের প্রতি আমার এমন কোনো প্রবল আকর্ষণ ছিল না যে, আমি ওই সম্প্রদায় বা পরিবারের মতো করে নিজেকে গড়ে নেওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করব এবং সমাজ ও পরিবারেরও আমাকে গড়েপিটে নেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আমি আমার বাবাকে চিনতাম না, তার কয়েকটা ছবি কেবল দেখেছি, ওই টুকুই। আমি অনেক পরে তাকে দেখেছিলাম, তখন আমার বয়স ২০এর মতো। ফলে আমি কখনো আমার জীবনে ওই পুরুষ চরিত্রটি দেখিনি, যে আমাকে দেখে রাখবে, আমাকে সুরক্ষা দেবে। আবেগগতভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এটা ছিল একটা আশ্চর্য আর অনিরাপদ স্থান। বিশ্বের শিশুরা সব ধরনের দুর্ভোগ আর যে ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছে, তাতে আমি দাবি করতে পারি না যে, আমার শৈশবটা ছিল ট্রাজিক। তবে সেটা ছিল একটা চিন্তাপূর্ণ শৈশব, অনেকটা একাকী সবকিছু নিয়ে চিন্তা করে গেছি। আমি নদীতে মাছ ধরে অনেক সময় কাটিয়েছি। লেখক হিসেবে আমি নির্যাতিতের বিশুদ্ধশিকারের স্পষ্ট, নির্ভেজাল ক্রোধ ধারণ করতে পারি না, যদিও এ ধরনের কিছু থেকেও থাকে। আমি কেমন করে যেন কিছুটা অস্বস্তিদায়ক, অবস্থায় বসে সেখান থেকে লিখেছি।

প্রশ্ন : আপনি অনেক কিছু নিয়ে লিখেছেননর্মদা আন্দোলন, কাশ্মির, মাওবাদী, পুঁজিবাদ। ভারতে আমরা এই মাত্র একটা ফাঁসি দেখলাম। আর আপনি একসময় আফজাল গুরুর নির্দোষ থাকা নিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা লেখা লেখেছিলেন।

অরুন্ধতী : দ্য গড অব স্মল থিংস যখন বুকার প্রাইজ পেল, আমি তখন আত্মবিশ্বাসের সাথে বৈশ্বিক পর্যায়ে আবির্ভূত নব্য বিশ্বায়িত, মুক্তবাজার ভারতে মহাবিজয়ের স্মারক হিসেবে মিস ওয়ার্ল্ডদের সারিতে অবস্থান করতে থাকলাম। আমি যেভাবে কাজ করছিলাম, তা ছিল চলনসই। কিন্তু এরপর পরই বিজেপি ক্ষমতায় এলো, এবং কিছু সময় পর সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মহলগুলোর কাছ থেকে বিশাল ও কুৎসিত প্রশংসা পেতে পরমাণু পরীক্ষা চালায়।

আমি আতঙ্কিত হলাম। আমি এমন এক গণব্যক্তিত্ব ছিলাম যে আমার চুপচাপ থাকা মানে ছিল এই পরীক্ষাকে অনুমোদন করা, এটা ছিল স্পষ্টভাবে ঘোষিত রাজনৈতিক বিষয়ের মতো। এরপর আমি লিখলাম দ্য এন্ড অব ইমাজিনেশন(৩ আগস্ট, ১৯৯৮)। সাথে সাথে আমাকে মঞ্চ থেকেপরী রানিমিস ইন্ডিয়াপুরস্কারজয়ী লেখকের মঞ্চ থেকেগলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো। ঘৃণাযুক্ত তাচ্ছিল্যপূর্ণ তীব্র নিন্দাবাদ এবং গালিগালাজ শুরু হয়ে গেল। আমি মনে হলো যে, ওইসব পরমাণু পরীক্ষা জনসাধারণের স্বর বদলে দিয়েছে। আমি আরো কুৎসিত হলাম, আরো উচ্চকণ্ঠি দেশভক্ত হলাম, তেমনভাবেই পরিচিত হয়ে থাকলাম। তবে আমাকে একদল লোক যখন ছুঁড়ে ফেলে দিল, তখন অন্যরা আমাকে লুফে নিল। আর তাতে আমার নতুন যাত্রা শুরু হলো, সেটা এখনো চলছে। পরমাণু পরীক্ষার অল্প পরই সুপ্রিম কোর্ট সর্দার সরোবর ড্যাম নির্মাণের ওপর থেকে দীর্ঘ দিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল। আমি নর্মদা উপত্যাকা সফর করলাম, লিখলাম দ্য গ্রেটার কমন গুড(২১ মে, ১৯৯৯)

আমার প্রতিটি সফর, প্রতিটি প্রবন্ধের পর আমার উপলব্ধি আরো গভীর হয়েছে। এমনকি পার্লামেন্ট হামলার সময়ই সেটা আমার কাছে কৃত্রিম ঘটনা মনে হয়েছে। আসল রহস্য উন্মোচনে আইনজীবী নন্দিতা হাসকার দুর্দান্ত কাজ করেছেন। ওই সময়ের দিকে আদালত অবমাননার দায়ে আমাকে জেলে পাঠানো হলো। পার্লামেন্ট হামলার অভিযোগে শওকত গুরুর স্ত্রী আফসান গুরুর স্ত্রীও তখন সেখানে ছিলেন। তিনি ছিলেন অন্তঃসত্তা, আতঙ্কগ্রস্ত, কাঁদছিলেন, কেন তিনি জেলে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। অন্য কারাবন্দিরা তার সাথে এমন আচরণ করছিল, যেন তিনি মহা দেশদ্রোহী। আমি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমি বললাম, আমি শিগগিরই মুক্তি পাব, আমি কি সেখানে আপনার জন্য কিছু করতে পারি?তিনি কেবল আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, আপনি কি আমাকে একটা তোয়ালে যোগাড় করে দিতে পারেন? আমরা একটা তোয়ালেও নেই। কয়েক বছর পর তিনি নির্দোষ খালাসপ্রাপ্ত হলেন, কিন্তু তার জীবনটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

এখন আর কেউ তাকে নিয়ে কোনো কথা বলে না। ওই ঘটনার পর আমি সতর্কভাবে মামলাটি পর্যবেক্ষণ করলাম। যখন এস এ আর গিলানি নির্দোষ এবং আফজাল মৃত্যুদে দিত হলেন, আমি মামলাটির সব নথিপত্র সংগ্রহ করে স্যুটকেসে সব ভরে গোয়ায় চলে গেলাম। তখন ছিল বর্ষাকাল, খুব কম লোকই সেখানে ছিল। আমি একটা ঘরে বসে পুরো বিষয়টি পড়লাম। আমি আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। তাই আমি লিখলাম, অ্যান্ড হিজ লাইফ শুড বিকাম এক্সটিনক্ট(৩০ অক্টোবর, ২০০৬)। তাতে দেখলাম কিভাবে প্রমাণ তৈরি করা হয়েছে, কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, আফজালের হয়ে কাজ করার আইনজীবী একবারের জন্যও না থাকার বিষয়গুলো তুলে ধরলাম। সুপ্রিম কোর্ট বলল, পুলিশি হেফাজতে দেওয়া স্বীকারোক্তি প্রমাণ হিসেবে অগ্রহণযোগ্য, কিন্তু মিডিয়া দিল্লি পুলিশের বিশেষ সেল থেকে তার উদ্ধৃতি করা স্বীকারোক্তির বিভিন্ন ভিডিও ব্যবহার করতে লাগল। পুলিশ তার ভিডিওটেপ করেছে, ঠিক এখানে লোদি এস্টেটে। একটি স্বীকারোক্তিতে তিনি গিলানিকে সম্পৃক্ত করেছেন, অন্য একটিতে অন্য একজনকে।

তারা পছন্দসই স্বীকারোক্তি বাছাই করতে পারত। সেটা তাদের জন্য লাগসই হতো, সেটা তারা গ্রহণ করত। সাত বছর পর মিডিয়া সেগুলো দেখিয়েছে, তিনি তখনো জীবিত, আর ভিডিওগুলো যখন চলত, তখন স্ক্রিনের নিচে দর্শকদের পাঠানো এসএমএস ম্যাসেজ দেখানো হতো, যাতে লেখা থাকত : ঘাড় ধরে এনে লাল চকে ঝুলিয়ে দাও, ইত্যাদি। এটা ছিল ভয়াবহ ধরনের নিমর্মতা। কেউ যদি পাগলামিতে পূর্ণ বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রে (বানানা রিপাবলিকান) বাস করে, তখন সে এ ধরনের কিছু গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু এখানে আমরা ভিন্ন কিছু মনে করি। আউটলুকে পাঠানো চিঠিগুলোর কথা আমার মনে আছে, যেখানে একটি চিঠিতে লেখা ছিল, আফজাল গুরুকে ছেড়ে অরুন্ধতী রায়কে ফাঁসি দাও। এসব কিছু সত্ত্বেও সরকার (কংগ্রেস সরকার) তাকে ফাঁসি দেয়, যদিও পুরোপুরি জানত, তিনি ছিলেন নির্দোষ। সেটা ছিল রাজনৈতিক পদক্ষেপ, ভোট বাগাতে তার রক্তের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা লোকদের তুষ্ট করতে তা করা হয়েছিল। এটা ছিল ভয়ঙ্কর, ভীরুতাপূর্ণ কাজ। তারা এত লজ্জিত হয়েছিল যে,… তারা এমনকি তার লাশও তার পরিবারের কাছে দিতে পারেনি। তারা যে চিঠি লিখেছিল, সেটাকে পরিকল্পিতভাবে বিলম্বিত করা হয়, যাতে তার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর সেটি তার পরিবারের কাছে পৌঁছে। দেখুন, এ ধরনের বিষয় ইস্যুহচ্ছে নাঅথচ এটা নিজেই জীবন। আর সমাজ হিসেবে আমাদেরকে এটা যদি মেনে নিতে হয়, তবে আমরা নিজেদের শেষ করে ফেলব। আমরা নিজেদের অভিশপ্ত করেছি।

আমি দুটি উপত্যাকা নিয়ে লিখেছি : নর্মদা উপত্যকা ও কাশ্মির উপত্যকা। আমি অনেক সময় ভাবি, একটিতে ন্যায় বিচারের জন্য নিদারুণ অনুসন্ধান অন্যটিতে কেন ধরা পড়ল না বা প্রতিফলিত হলো না। অর্থাৎ নর্মদা উপত্যকায় পরিবেশগত ইস্যু, ড্যাম কী করে, স্থানীয় অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংক, ভয়াল দারিদ্র সম্পর্কে এত বাস্তবধর্মী উপলব্ধি সৃষ্টি হলেও কাশ্মিরি জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে সামান্যই। আবার কাশ্মিরে সামরিক দখলদারিত্বে বসবাসের মানে কী সে সম্পর্কে এত বাস্তবতাপূর্ণ ধারণা থাকলেও বড় ড্যাম কী, এটা কী করে, নব্যউদার নীতি কিভাবে লোকজনকে ধসিয়ে দেয়, সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে খুবই কম। আমি স্রেফ ন্যায়বিচারের সুতার কথা বলি, যা আমি অনুসরণ করেছিএটা সবার জন্য সুতা নয়, নির্দিষ্টভাবে আমার জন্যই। সবমিলিয়ে এটা এমনকিছু যেটাকে জন বার্গার বলেছেন, অ্য ওয়ে অব সিয়িং। এটাই সাহিত্য, এটাই কবিতা। এটাই যা বোঝানোর সবকিছু বোঝায়।।

(চলবে…)