Home » অর্থনীতি » দক্ষিণ এশিয়ায় অস্ত্র ক্রয় :: বৈরিতা ও আবেগময় জাতীয়তাবাদের ফসল

দক্ষিণ এশিয়ায় অস্ত্র ক্রয় :: বৈরিতা ও আবেগময় জাতীয়তাবাদের ফসল

প্রতিটি শিশুর পড়াশোনার ব্যয়ের তুলনায় প্রতিটি সেনার পেছনে খরচ ৬০ গুণ বেশি

সাদ হাফিজ

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last-2অস্ত্র সংগ্রহের প্রতি অদম্য নেশা কখনো কাটবে, এমন কোনো আশার রেখা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ব্যবসা বরং বিপুলভাবে বাড়ছেই। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো প্রধান প্রধান অস্ত্র রফতানিকারকের কল্যাণে ২০১৪ সালে বিশ্বজুড়ে অস্ত্র কেনাবেচা ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মূল্যবান অস্ত্র সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে সাবমেরিন, জঙ্গিবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ছিল ১.৭৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বিদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থেকে শীর্ষে। তাদের ব্যয় হয়েছে ৫৮১ বিলিয়ন ডলার।

বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের আরেকটি মৌলিক বাস্তবতা হচ্ছে, ভরকেন্দ্রটি আমেরিকা মহাদেশ দুটি থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় সরে যাচ্ছে। এই অঞ্চলের দেশগুলো আতঙ্কজনক হারে নিজেদের অস্ত্রে সজ্জিত করছে। সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় সংবলিত ১৫টি দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সিপরির হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানিতে চীনকে পেছনে ফেলে শীর্ষে ওঠে এসেছে ভারত। দেশটি ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অস্ত্র কিনেছে বিশ্ববাজারের মোট বিক্রির প্রায় ১৫ শতাংশ। এই সময়কালের বৃহত্তম ১০ আমদানিকারকের পাঁচটির মধ্যে রয়েছে চীন (৫ শতাংশ), পাকিস্তান (৪ শতাংশ), দক্ষিণ কোরিয়া (৩ শতাংশ), সিঙ্গাপুর (৩ শতাংশ)

আর অস্ত্র রফতানিকারকেরা যতদিন পর্যন্ত চাহিদা পূরণে আগ্রহী থাকবে, ততদিন পর্যন্ত বিশ্বের অস্ত্র প্রবাহ হ্রাসের আশা খুব কমই থাকবে। আর নৈতিকতা ও সামাজিক দায়দায়িত্বের মূল্যে বৈশ্বিক অস্ত্র শিল্প ফুলে ফেপে উঠছে। রাষ্ট্রগুলো সামাজিক সমস্যাবলীর সামরিক সমাধানের বাইরে কোনো কিছু চিন্তা করতেও অক্ষম হয়ে পড়েছে। প্রতিটি শিশুর পড়াশোনা করতে যে ব্যয় হয়, বিশ্ব বর্তমানে প্রতিটি সৈন্যকে সজ্জিত করতে তার প্রায় ৬০ গুণ বেশি খরচ করছে। অনেক সময়ই অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলো রফতানিকারকদের কাছ থেকে বেসামরিক সাহায্য হিসেবে যা পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ করে অস্ত্রের পেছনে।

কঠোর বাস্তবতা হলো, সাবেক মার্কিন জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট ডুহাইট ডি আইজেনহাওয়ার (যার দেশের সামরিক বাজেট সবচেয়ে বেশি, কাছাকাছি থাকাদের চেয়ে ব্যবধান বিশাল), অস্ত্র খাতে ব্যয়কে জনগণের কাছ থেকে চুরি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন : প্রস্তুত প্রতিটি বন্দুক, চালু হওয়া প্রতিটি রণতরী, নিক্ষিপ্ত প্রতিটি রকেট, চূড়ান্ত পর্যায়ে আসলে ক্ষুধার্তকে না খাইয়ে, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র না দিয়ে তার জন্য বরাদ্দ করা অর্থ থেকে নেওয়া। সশস্ত্র বিশ্ব কেবল অর্থই ব্যয় করছে না। এটা শ্রমিকদের ঘাম, বিজ্ঞানীদের প্রতিভা, শিশুদের স্বপ্নও শেষ করে দিচ্ছে। সত্যিকার অর্থে এটা কোনোভাবেই জীবনধারা হতে পারে না। হুমকিপূর্ণ যুদ্ধের শঙ্কার মধ্যে লৌহদে মানবতা ঝুলছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যয় হলো একটি প্রধান ইস্যু এবং চলমান উদ্বেগ। বিশ্বে এই অঞ্চলটিতে বসবাসকারী ১.৬২ বিলিয়ন মানুষ সবচেয়ে গরিব, সবচেয়ে নিরক্ষর, সবচেয়ে অপুষ্টির শিকার, সবচেয়ে কম জেন্ডারসেনসেটিভ এবং সবচেয়ে বঞ্চিত। এই অঞ্চলের নিরক্ষরতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যু, অনিরাপদ স্যানিটেশন এবং নারী ক্ষমতায়নের মতো বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত ভয়াবহ পরিসংখ্যান মানবনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এগুলো ফুটিয়ে তুলছে যে, লোকজন খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি, মৌলিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধার অভাবে রয়েছে। এই অঞ্চলের সাঙ্ঘর্ষিকতাপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা ও চরমপন্থার ইন্ধন দিচ্ছে। একদিকে, এই অঞ্চল থেকে ক্রমাগত বেশি বেশি বিলিয়নিয়ারের আত্মপ্রকাশ ঘটছে, অন্যদিকে কোটি কোটি লোক ধুঁকে ধুঁকে মরছে কিংবা নিদারুণ কষ্টকর জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

কিন্তু তবুও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রধান দেশ জিডিপি এবং সার্বিক সরকারি ব্যয়ের তুলনায় সামরিক খাতে অনেক বেশি ব্যয় করছে। ২০১৪ সালে ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক হুমকির (ভারত/চীন এবং পাকিস্তান/ভারত) ধারণা অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে বিপুলভাবে উস্কে দিচ্ছে। বৈশ্বিক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এ কারণে উল্ল­সিত যে, ভারত ও পাকিস্তানের নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষতিকর আক্রমণ চালানোর মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র বানাতে পারে না।

বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় সত্ত্বেও রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং জাতিগত সঙ্ঘাত আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধিকে অব্যাহতভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় দক্ষিণ এশিয়াকে বসবাসের জন্য নিরাপদ স্থান করেনি। এই অঞ্চলে যত বেশি অস্ত্র কেনা বাড়বে, সামরিকায়ন হবে, তাদের একে অন্যের বিরুদ্ধে যাওয়ার আশঙ্কা তত বাড়বে, অনেক বিশেষজ্ঞই এই অভিমত প্রকাশ করেছেন। অথচ যেসব সমস্যার কারণে অঞ্চলটি অনুন্নত রয়েছে, সেগুলোর সমাধান এবং সামাজিক কল্যাণের লক্ষ্য অর্জনই হওয়া উচিত ছিল প্রথম অগ্রাধিকার। সামরিক পন্থায় সামাজিক সমস্যাবলী সমাধান করতে চাওয়া মানে সমস্যাগুলো আরো বাড়িয়ে দেওয়া।

দক্ষিণ এশিয়ার অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঐতিহাসিক বৈরিতা ও আবেগময় জাতীয়তাবাদের ফসল। এগুলো পরিস্থিতির বরং আরো অবনতি ঘটাচ্ছে। মূর্খ সমরবিদ এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি এবং বিষবাষ্প ছড়ানো বক্তৃতা ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ তাদের দেখানো পথটি সামরিকবাদ, যুদ্ধ ও সহিংসতার জীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধ ও শান্তির ব্যাপারে মিশ্র সঙ্কেত একটি ভয়াবহ ভুল। অধিকন্তু,এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আগ্রহ যে কম রয়েছে, তা অনেক সময়ই উল্লেখ করা হয় না। অনুশোচনার ব্যাপার হলো, ক্ষমতার করিডোরে উন্নত চিন্তার উদয় না হলে আমরা মানব উন্নয়নের বদলে সামরিক শক্তির বিকাশ দেখেই যাব।।