Home » বিশেষ নিবন্ধ » শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (দ্বিতীয় পর্ব)

শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (দ্বিতীয় পর্ব)

শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য আগের তুলনায় অনেক বেশী

হায়দার আকবর খান রনো

চার

Last-3এবার আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। ইংরেজ আসার আগে আমাদের দেশে শিক্ষা বলতে যে টোল মাদ্রাসা চালু ছিল, তাকে আধুনিক শিক্ষা বলে না। ইংরেজদের মাধ্যমেই বাংলাদেশের এক শ্রেণী পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসলেন। তারা নবগঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত বা জমিদার শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে অনেক মহান পুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা হিন্দু সমাজে এক ধরনের জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, যাকে অনেক সময় রেনেসা বলা হয়, যদিও রেনেসা কথাটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সহেন্দ নেই যে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বিশাল উল্লস্ফন ঘটেছিল। সমাজের একটা সংকীর্ণ স্তর পাশ্চাত্যের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এবং আধুনিক প্রকৃতি বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কিন্তু সেই জাগরণের বাইরে ছিল মুসলমান জনগোষ্ঠী, কারণ তারা ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করেনি। আরও বাইরে ছিল হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যারা ছিল কৃষক অথবা অন্যকোন শ্রমজীবী।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজত্বের আগে বাংলাদেশে আধুনিক উচ্চ শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক শিক্ষা না থাকলেও গ্রামীণ সমাজে এক ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন ছিল। ইংরেজ বনিক বুর্জোয়া সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ অল্পেতুষ্ট পাশ্চাৎপদ গ্রামীণ সমাজকে যেমন ভেঙ্গে দিয়েছিল, তেমনি গ্রামীণ সেই শিক্ষা ব্যবস্থারও ধ্বংসসাধন করেছিল। শিশু ও বালকরা বিনা খরচে লিখতে পড়তে শিখতো, কিছুটা অংকও কষতে জানতো। তদানিন্তন ভারতের গ্রাম সমাজ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে মার্কসও গ্রাম্য পাঠশালার কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সামন্ত গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন পেশার লোকদের জন্য আর্থিক বরাদ্দ থাকতো। পেশা ছিল বংশানুক্রমিক। গুরুমশাইও ছিলেন বংশানুক্রমিক। কবিকঙ্কন গুরুমশাইয়ের পরিধেয়ের বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে কানে কলম, পরনে ছেড়া ধুতি। তাতে বোঝা যায় তিনি গরিব ছিলেন। কিন্তু সকলের শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন। বুর্জোয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই শ্রদ্ধা চলে গেল, কিন্তু দারিদ্র গেল না। কমিউনিস্ট ইশতেহারে মার্কসএঙ্গেলস লিখেছেন, মানুষের যেসব বৃত্তি এতদিন লোকে সম্মান করে এসেছে, ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধার চোখে লোকে যার দিকে চেয়েছে, বুর্জোয়া শ্রেণী সেইসব বৃত্তির মাহাত্ম ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসক, আইন বিশারদ, পুরোহিত, কবি, বৈজ্ঞানিকসকলকে এরা বেতনভুক্ত ভৃত্যের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে।

বাংলার পুরাতন গ্রামীণ সমাজ ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে সমগ্র গ্রামের সমষ্টিগত অর্থ আনুকূল্যে যে এতিহ্যবাহী পাঠশালা ছিল তাও হারিয়ে গেল। গুরুমশাইও বেকার হলেন। তারপরও অবশ্য কিছু কিছু গ্রাম্য পাঠশালা নিজস্ব উদ্যোগে টিকে ছিল। কিন্তু অন্যদিকে আধুনিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। সেটাকে নিশ্চয়ই অগ্রগতি বলবো। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সংকীর্ণ একটা বিত্তবান শ্রেণীর জন্য।

ভারতবর্ষে কি ধরণের কি শিক্ষা প্রচলন করা যায়, তা নিয়ে ইংরেজ শাসকদের মধ্যেই বিতর্ক ছিল। ওয়ারেন হেস্টিংস চেয়েছিলেন টোল মাদ্রাসা ধরনের আগের থেকে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকুক। বিপরীতে টমাস ব্যরিংটন মেকেলে ইংরেজী শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে ছিলেন। মেকেলের শিক্ষানীতিই ১৮৩৫ সালে সরকারীভাবে গৃহীত হল। মেকেলের যুক্তি ছিল এই যে, ভারতীয়দের একাংশকে কিছুটা আধুনিক পাশ্চাত্যের শিক্ষা দিলে কম খরচে প্রশাসনের কাজ চালানো যেতে পারে। ভালো কেরানী বানানোর জন্য যেটুকু দরকার সেইটুকুই দেয়া হবে।

ইংরেজরা আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন করলেও যার সুফল আমরা পেয়েছিলাম, তারা কিন্তু খুব বেশী উচ্চ শিক্ষার পক্ষপাতী ছিল না। উপরন্তু প্রথম থেকেই তারা সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধী ছিল এবং হিন্দুমুসলমানের মধ্যকার বিভাজনকে উৎসাহিত করেছে। ১৭৮০ সালে প্রথম ক্যালকাটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারপরই ১৭৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হল সংস্কৃত কলেজ। হিন্দু ও মুসলমানের জন্য পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৮২৩ সালে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য একটি নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলে রাজা রামমোহন রায় বিরোধীতা করে লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি দেন। তিনি ইংরেজী, জ্ঞানবিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার দাবী করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার দাবী করেন।

১৮৩৫ সালে মেকেলের শিক্ষানীতি প্রবর্তিত হবার আগেই রাজা রামমোহন রায় ও অন্যান্যদের উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম কলেজ। হিন্দু কলেজ যেখানে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার ছিল না। এমনকি প্রথম দিকে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য বাদে অন্য বর্ণের হিন্দুদেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টার ফলে সিদ্ধান্ত হয় যে হিন্দু মাত্রই ছাত্র হতে পারবে। তবে মুসলমান ছাত্র কখনোই নয়।

পাঁচ

উচ্চ ও মাধ্যমিক শিক্ষা যাই হোক না কেন সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অবহেলিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, প্রবল বিরোধীতাও ছিল। মেকেলের তত্ত্ব ছিল এই যে, অল্প কিছু লোককে উচ্চ শিক্ষা দিলে, তারাই বাকিদের শিক্ষিত করার দায়িত্ব নেবেন। একেই বলে Filtration Theory.

বস্তুতঃ সর্বসাধারণকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখার জন্যই মেকেলে এই তত্ত্ব প্রচার করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে বিদ্যাসাগরের মতো মহান ব্যক্তিও এই তত্ত্বে সম্মতি দিয়েছিলেন। এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, তিনি জনসাধারণকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য অনেক বইও লিখেছেন। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার বিকল্প হিসাবে যদি প্রাথমিক শিক্ষাকে দাঁড় করানো হয় এবং সেই অনুসারে সরকারী অর্থ বরাদ্দের কথা আসে তাহলে উচ্চ শিক্ষার পক্ষেই দাঁড়াতে হবে, এটাই ছিল বিদ্যাসাগরের চিন্তা। এই বিতর্ক এখনও স্বাধীন বাংলাদেশে আছে যদিও অন্যভাবে। আসলে দুটোই চাই। বরং এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যা বলেছেন সেটাই যথার্থ, আমরা উচ্চ শিক্ষাকে দৃঢ় করতে পারবো না, শক্তিশালী করতে পারবো না, যদি আমরা প্রাথমিক শিক্ষাকে অবজ্ঞা করি।(সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষা সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তৃতাসেপ্টেম্বর, ১৯৯৯)

এটা আশ্চর্যজনক যে বাংলাদেশ তথা ভারতে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল ইংরেজ শাসকদের একাংশ। আমাদের দেশের নব্য শিক্ষিত সমাজের পক্ষ থেকে কোন আগ্রহ দেখা যায়নি। অবশ্য এখানেও শ্রেণীস্বার্থ জড়িত ছিল। ইংরেজ শাসকদের সেই অংশ মনে করেছিল, শিল্পের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন ও সরবরাহের কাজটি ভালোভাবে করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে। ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বিশিষ্ট পন্ডিত প্রয়াত সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্ জনশিক্ষার প্রতিবন্ধকশীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপারে একদল ইংরেজের কিছুটা আগ্রহ আসে। তাদের মতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজন এই জন্য যে তাতে কাঁচামাল উৎপাদনে সাহায্য হবে। ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানী দেশী কেরানী, হাকিম দিয়ে শাসন ব্যবস্থা কম খরচে চালাবার আগ্রহে উচ্চ শিক্ষার প্রবর্তন করেছিল। এখন একদলের কম খরচে কাঁচামাল পাবার উদ্দেশ্যে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি নজর পড়লো।এই প্রসঙ্গে সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্ দুইটি বই থেকে কিছু উদ্ধৃত করেছেন। সেই উদ্ধৃতি দুইটি আমিও আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি।

Arthur Mayheew-এর লেখা Education in Indiaথেকে There was also talk of development of the material resources of the country and the training required for this essential western work.

ভগবান দয়ালএর Development of Modern Indian Educationপুস্তকে বৃটিশ সরকারী দলিল থেকে নিম্নোক্ত অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে। …to secure to us a large and more certain supply of many articles necessary for our manufactures and extensively consumed by all classes of our population, as well as an almost inexhaustible demand for the product of British labour.

অবশ্য বৃটিশ শাসকদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার বিরোধী লোকজনও ছিল। যেমন দাস প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাবক খ্যাতনামা উইলবারফোর্স যখন হাউস অব কমন্সে (১৭৯৩ সালে) ভারতে শিক্ষা প্রসারের প্রস্তাব করেন তখন ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর জনৈক পরিচালক বলেছিলেন, এই সেদিন আমরা আমেরিকায় স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করে আমাদের উপনিবেশটা হারালাম, এখন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে ভারতকেও হারানো যাবে না।

তবে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা এসেছিল বাংলাদেশের জমিদার শ্রেণীর কাছ থেকে।

১৯২১ সালে বাংলার সরকারের কাছে ব্লিস প্রাথমিক শিক্ষা সংক্রান্ত যে রিপোর্ট পেশ করেছিলেন সেখানে জমিদারদের আপত্তির কথা উল্লেখ আছে। আপত্তির কারণগুলি নিম্নরূপ : চাষীর ছেলের রোদ বাতাস সহ্য করার ক্ষমতা চলে যাবে।ঐ ছেলে পিতার কাজকে (চাষার কাজকে) ঘৃণা করতে শিখবে।

চাকরবাকর নষ্ট হয়ে যাবে।চোখ খুলে যাবে, দারিদ্র বেশী করে উপলব্ধি করবে এবং তা দূরীকরণের জন্য সংগ্রাম শুরু করবে।

চাষী যদি পড়তে আরম্ভ করে ও ভাবতে আরম্ভ করে তাহলে নীতিহীন প্রচারকের পাল্লায় পড়বে। বিক্ষুব্ধ মধ্যবিত্তের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ প্রলেতারিয়েতকে যুক্ত করা বাস্তবিকই নির্বুদ্ধিতা।

সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্ তাঁর লেখা অতি মূল্যবান গ্রন্থ, শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্কএ বহু ঘটনার বিবরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নিজ নিজ দলের জমিদারদের স্বার্থে নানা কায়দায় নানা উছিলায় প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের বিরোধীতা করেছিল। অমন স্থুলভাবে না হলেও এখনও স্বাধীন বাংলাদেশে একই প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আজকের বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশী প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।।

(চলবে…)