Home » আন্তর্জাতিক » নেপালে আবার ভারতের অবরোধ!

নেপালে আবার ভারতের অবরোধ!

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Nepal 1অবরোধের মুখে পড়েছে স্থলবেষ্টিত দেশ নেপাল। জ্বালানিসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল নেপাল। সেইসব পণ্য ভারত থেকে নেপালে ঢুকছে না বা ঢুকতে পারছে না। অবশ্য ভারত বলছে, কোনো ধরনের অবরোধ আরোপ করা হয়নি। নিরাপত্তার কারণে কোনো গাড়ি যেতে পারছে না। কিন্তু নেপালিরা ভাবছে ভিন্ন কারণ। নেপথ্যে রয়েছে মদেশী ইস্যু।

কী এই ইস্যু? নেপালের একটি জনগোষ্ঠীর নাম মদেশ। ভারতীয়বংশোদ্ভূত এই জাতিগোষ্ঠীর উপর ভারতীয় প্রভাব যথেষ্ট। অনেক সঙ্কটের সময় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্রশ্নে সুকৌশলে ভারতনেপাল সীমান্তবর্তী এই জনগোষ্ঠীকে কাজেও লাগিয়েছে। অতীতে নেপাল থেকে ব্যবসা বাণিজ্য করতে আসা মানুষ অনেক সময়েই ভারতীয় মহিলাদের বিয়ে করে সংসার পাততেন। তাদের সন্তানেরা বিভিন্ন সময়ে ফিরে গেছেন নেপালে। বসবাস করেছেন সীমান্তের কাছের তরাই অঞ্চলে। এই গোষ্ঠী থেকেই মদেশীয় সম্প্রদায়ের জন্ম।

নেপালের নয়া সংবিধান তৈরির সময়ে কিছু নির্দিষ্ট দাবি তুলেছিলেন মদেশীয় সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা দাবি করেছিলেন, মদেশীয় সম্প্রদায়ের জন্য আটটি জেলা নির্দিষ্ট করা হোক। কিন্তু বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি সংবিধানে। শুধু বলা হয়েছে একটি কমিশন গঠন করে পরে এই বিষয়ে মীমাংসা করা হবে। নেপালের পার্লামেন্টে তাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরো একটি বিষয়ে পদক্ষেপ করেছে নেপালের গণ পরিষদ। নয়া সংবিধান অনুযায়ী, কোনো নেপালি নারী বিদেশি পুরুষকে বিয়ে করলে সন্তানকে নতুন সংবিধান অনুযায়ী নেপালের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না, যতক্ষণ না সেই ভিনদেশি পুরুষটি নেপালের নাগরিকত্ব নিচ্ছেন। মদেশীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, যেহেতু তারা সীমান্ত অঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের ভারতীয়দের সঙ্গে প্রণয়বদ্ধ হওয়ার ঘটনাও প্রায়ই ঘটে। সেক্ষেত্রে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নেপালের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করে প্রান্তিক করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে নতুন সংবিধানে। পরিণতিতে এই অবরোধ।

অনেকে মনে করছে, বিক্ষোভকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নেপালে অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে কাঠমান্ডুকে শায়েস্তা করতে চাচ্ছে। অনেকের কাছে এটাকে ১৯৮৯ সালের অবরোধের মতোই বলে মনে হচ্ছে।

কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়, নেপালের তরাই অঞ্চলে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা নেপালগামী পণ্যবাহী যান, এলপিজি বুলেট এবং তেল ট্যাংকারগুলো চলাচলে বাধা দিচ্ছে। বিরাটনগর, কাকাদহিটা, বিরগঞ্জ, ভাইরাহাওয়া ও নেপালগঞ্জ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মালবাহী ট্রাক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হয়েছে। নেপাল টাইমসের খবরে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা কি ১৯৮৯ সালে নেপালের বিরুদ্ধে ভারতের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের পুনরাবৃত্তি? কাঠমান্ডু এখন নয়া দিল্লির কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাচ্ছে।

নেপালের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খাগ রাজ অধিকারি শুক্রবার এ বিষয়ে নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। ভারত অবশ্য অবরোধ আরোপের কথা অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, বিরাজমান পরিস্থিতিতে তাদের পণ্য যেতে পারছে না।

ভারত অস্বীকার করলেও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে নেপাল ওয়েল করপোরেশন (এনওসি) বৃহস্পতিবার থেকে তেল আমদানি করতে পারছে না। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী নেপালি ট্যাংকারচালকদের কাজে বাধা দিচ্ছে বলেও নেপাল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে।

পূর্ব নেপালে যেখানে কোনো বিক্ষোভ নেই, সেখান দিয়েও ভারত কোনো পণ্য নেপালে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। অন্যদিকে পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়েছে, নেপালের নতুন সংবিধানবিরোধী শত শত বিক্ষোভকারী গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুটগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে নিত্যপণ্য, রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস, পেট্রোলিয়াম পণ্যবোঝাই শত শত ট্রাক আটকা পড়ে আছে। পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যাপারে নেপাল ইন্ডিয়ান ওয়েল করপোরেশনের কাছে পুরোপুরি নির্ভরশীল। প্রায় এক মাস ধরে চলমান সঙ্ঘাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে। পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়, নেপালের বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয় চীনের সাথে দুটি বাণিজ্য পয়েন্ট খোলার জন্য কূটনৈতিক প্রয়াস শুরু করেছে।

পেশীশক্তি প্রদর্শনী

প্রখ্যাত বিশ্লেষক এম কে ভদ্রকুমারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে দেশটি শ্রীলঙ্কাতেও সংখ্যালঘুদের উস্কে দিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল। অবস্থা অসহ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কা অবশেষে তামিলদের কঠোর হাতে দমন করে। নেপালেও মদেশীদের দিয়ে একই কাজ করতে চেয়েছিল ভারত। ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে পেশীশক্তি প্রদর্শনী সবসময় যে সফল হয় না, এটা তার একটা প্রমাণ।।