Home » বিশেষ নিবন্ধ » কোনোক্রমেই যেন ভুল বার্তা বহির্বিশ্বে না পৌছে

কোনোক্রমেই যেন ভুল বার্তা বহির্বিশ্বে না পৌছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

http://www.dreamstime.com/stock-image-bangladesh-globe-image2670001গণতন্ত্রই যে সর্বোত্তম এবং পুরোপুরি দোষত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা এমনটা একশত ভাগ গ্যারান্টি আজ অব্দি কেউ দিতে পারেননি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা শাসন কার্যক্রমে আর আবিষ্কৃত হয়নি। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষের অংশগ্রহণকে যেমন নিশ্চিত করা যায়, তেমনি এর মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যথাযথ ভারসাম্যও নিশ্চিত হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এর মধ্যদিয়ে অংশীদারিত্বমূলক মনোভাব তৈরি হয়, যা অন্য কোনো ব্যবস্থায় সম্ভব হয় না। বরং অন্য ব্যবস্থায় বিপরীতটাই ঘটে থাকে। আর সম্ভব হয় না বলেই গণতন্ত্রকে সযত্নে লালনের জন্য নানা ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করতে হয়, তেমনি নানা রক্ষাকবজের কথাও বলা হয়েছে। রাজনীতি বিজ্ঞানী আর রাষ্ট্রনায়কেরা ক্রমাগত প্রায়োগিক ভুলত্রুটি চিহ্নিত করার পরেই এসব বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়েছে।

কিন্তু গণতন্ত্রের প্রথম দিককার প্রায়োগিক দিক থেকে বর্তমান পর্যায় পর্যন্ত নানা পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনটি ঘটেছে রাষ্ট্র কাঠামোর বৃহদাকার রূপ লাভ এবং রাষ্ট্রের জনগণের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। সরাসরি গণতন্ত্র এখন নেই, তার বদলে স্থান করে নিয়েছে প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থা। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থার রূপকাররাই প্রকৃত প্রতিনিধিত্বশীলতা নিশ্চিত করা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। চিন্তিত ছিলেন এই কারণে যে, এই সরকার ব্যবস্থাটি বাস্তবে কতোটা প্রতিনিধিত্বশীল থাকবে এই ভেবে। আর বাস্তবে তা হয়েছেও। প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থাটি যখন পুরো মাত্রায় নির্বাচনকেন্দ্রীক হয়ে পড়েছে, সমস্যা ও সংকটের শুরু হয়েছে ঠিক তখনই। প্রকৃত গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে আসলে পুরো মাত্রায় নির্বাচনকেন্দ্রীয়কতার জন্য। কারণ এই নির্বাচন ব্যবস্থাটি নিয়েই যতো বিপত্তি এবং সংকটের সৃষ্টি হয়। আর কয়েক বছরের ব্যবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে মধ্যবর্তীকালীন সময়ে জনগণ উপেক্ষিত এবং অবহেলিত হয়ে থাকে। আবার নির্বাচন যদি নাই হয় অথবা নির্বাচনের নামে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয় তাহলে সে সরকারের জনগণের প্রতি দায়দায়িত্বহীনতার সৃষ্টি হয় এবং এর অনিবার্য পরিণতিতে জবাবদিহিতাহীন ও সব ধরনের মৌলিক অধিকারবিহীন একটি অবস্থার সৃষ্টি হতে বাধ্য। এতে শেষ পর্যন্ত জনগণের সাথে সাথে সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণে এ বিষয়টি বেশ আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানই একমাত্র গণতন্ত্র নয়। নির্বাচন গণতন্ত্র উত্তরণে একটি সিড়ির প্রথম ধাপ মাত্র। প্রকৃত গণতন্ত্র অর্জনের জন্য নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ হওয়ার সাথে সাথে আইনের শাসন, বাকব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে শুরু করে মানুষের সব অধিকারগুলোকে নিশ্চিত করতে হয়। বিশ্বজুড়ে বহু দেশে এর অভাবটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে বলে নানা দেশে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট বহুমাত্রিক হতে বাধ্য। কারণ যেখানে জনগণের অংশীদারিত্ব থাকে না সেখানে এই বহুমাত্রিক সংকট সৃষ্টি হবেই। তবে সব মিলিয়ে এটা বলতেই হবে যে, দোষত্রুটি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের বিকল্প এখন পর্যন্ত আর সৃষ্টি হয়নি।

দুই.

গত কয়েকদিনে কয়েকটি দুঃখজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে আমাদের এই জনপদে। দু’জন বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ডের ঘটনা দেশে, বিশেষ করে বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে অতীতে এমনটা আর কখনই ঘটেনি। বাংলাদেশে অস্বাভাবিক পথ ও পন্থায় প্রতি বছর যে সংখ্যায় মানুষের জীবনহানি ঘটানো হয়, তার সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দু’জন মানুষের মৃত্যু সংখ্যা হিসেবে নিতান্তই যে নগন্য তা ঠিক। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল ভিন্ন এবং সুদূরপ্রসারী। তবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের তরফে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এই ঘটনার পেছনে ইসলামিক স্টেট বা আইএসএর সংশ্লিষ্টতা নেই। তাহলে সরকারের কাছে এটা স্পষ্ট যে, অভ্যন্তরীণ সুযোগসন্ধানীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এই সুযোগসন্ধানী কারা তার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বিএনপি এবং জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করবে। এদিকে, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সব দিক বিবেচনায় নিয়েই এই ঘটনা তদন্তের তাগিদ দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশী কূটনীতিকদের যে বক্তব্য অর্থাৎ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কাজ করতে হবে, এটা যদি ধরে নেয়া হয় তাহলে সম্ভাব্য সব দিকগুলোই বিবেচনায় আনতে হবে। আইএসএর কোনো অস্তিত্ব নেই এটা যদি ধরে নেয়া হয়, তবে এটাও তো ঠিক বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটেছে এবং তা আগের চাইতে বেশি। জঙ্গীবাদের উত্থানের কথা বলে সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী তা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন। কাজেই সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিয়েই সামগ্রিক তদন্ত কাজ করতে হবে।

এই তদন্ত কাজ অতিদ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমেই দেশীবিদেশী সবাইকে আশ্বস্ত করা সম্ভব। এর বিকল্প কোনো পথ নেই। একই সাথে ব্লগার হত্যাকান্ডগুলোর দ্রুত তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে দোষীদের বিচারের আওতায়ও আনতে হবে। এটা প্রয়োজন এ কারণে যে, তা না হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ব্যাপারে নেতিবাচক বার্তা পৌছে যাবে। এই বার্তা যেন না পৌছে যায় সে প্রত্যাশা প্রতিটি নাগরিকের। কারণ এর ফলে বিদেশে অবস্থানরত লাখ লাখ বাংলাদেশীই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, শ্রম বাজার থেকে অর্থনীতিসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে। আমরা কেউই চাই না বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌছে যাক। আর এর দায়িত্ব সরকারের।।