Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৯)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ২৯)

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ১৬ দফা কর্মসূচি

আনু মুহাম্মদ

Last 3১৯৬৬ সালের ৮ আগষ্ট সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা গ্রহণ করে যা ১২ আগষ্ট পিকিং রিভিউএ প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিলো ‘মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত’। সাধারণভাবে ‘১৬ দফা’ নামে পরিচিত এই সিদ্ধান্তই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে ধরা হয়। এর ১ম দফা ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি নতুন পর্যায়’, ও ২য় দফায় ‘বর্তমান প্রবণতা এবং এর ওঠানামা’ শিরোনামে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণ, এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য, নেতৃত্ব দানকারী বিভিন্ন অংশ, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ৩য় দফায় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সাফল্যের জন্য পার্টি নেতৃত্বের দৃঢ ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। ৪র্থ ধারায় জোর দিয়ে বলা হয়, ‘এই আন্দোলনে জনগণকে নিজেরাই নিজেদেরকে শিক্ষিত করতে হবে। যদি ভুল বা বিশৃঙ্খলা হয় তবুও জনগণের নিজেদের চিন্তাশক্তির ওপর ভরসা করতে হবে।’

৫ম ধারায় পার্টির শ্রেণী লাইন দৃঢতার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাবার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষায়তনে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রতিক্রিয়াশীল স্বেচ্ছাচারী বিদ্বান এবং কর্তা ব্যক্তি’ আর ‘সাধারণভাবে বুর্জোয়া ধ্যান ধারণাসম্পন্ন ব্যক্তিদের’ এক করে দেখা চলবে না।’ ৬ষ্ঠ ধারায় জনগণের মধ্যে বিভিন্ন দ্বন্দ্বসমূহকে যথাযথভাবে সমাধান করবার কথা বলা হয়। এই ধারায় বিভিন্ন মত ও বিতর্ক নিয়ে সতর্ক থাকবার কথা বলা হয় এইভাবে, ‘বিতর্কে তথ্য ও যুক্তির ওপরই গুরুত্ব দিতে হবে, তার ভিত্তিতেই অগ্রসর হতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশকারী যদি সংখ্যালঘু অংশ হয় তাকে সংখ্যাগুরুর মতের পক্ষে আনার জন্য যে কোনো ধরনের চাপাচাপি বা জোর করা গ্রহণযোগ্য নয়। সংখ্যালঘু অংশকে বরং রক্ষা করতে হবে, কেননা অনেকসময় সত্য আসে সংখ্যালঘু অংশের কাছ থেকেই। যদি তারা ভুলও হয় তবুও তাদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তর্ক করার সুযোগ দিতে হবে। যখনই কোনো বিষয়ে বিতর্ক হবে তা পরিচালনা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, কোনোভাবেই বলপ্রয়োগ বা চাপাচাপি দিয়ে নয়।’

৭ম ধারায় সতর্ক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে, যারা বিপ্লবী জনতাকে প্রতিবিপ্লবী বলে আখ্যায়িত করে। ৮ম ধারায় এই বিপ্লবের ক্যাডারদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হযেছে। ৯ম ধারায় বিভিন্ন অঞ্চলে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে গড়ে ওঠা নানা গ্রুপ ও কমিটির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই ধারায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ‘মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে অনেক নতুন ঘটনা ঘটছে। বহু স্কুল ও অঞ্চলে জনগণ যেভাবে নতুন নতুন সংগঠন গড়ে তুলছেন তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরা কমিউনিস্ট পাটির নেতৃত্বে নিজেরাই নিজেদের শিক্ষিত করছে। জনগণের সাথে জনগণের সংযোগ স্থাপনের জন্য এরা এক অসাধারণ সেতু।’ এই ধারায় আরও বলা হয় যে, এসব সংগঠন যথাযথভাবে এগিয়ে নেবার জন্য প্যারী কমিউনের মতো সাধারণ নির্বাচন চালু করতে হবে।

শিক্ষা সংস্কারের কথা বলা হয় ১০ম ধারায়। এখানে শিক্ষার পাঠ্যসূচি নিয়ে আলোচনা ছাড়াও বলা হয়, স্কুলের সময় কমাতে হবে, কোর্স আরও কমাতে এবং উন্নত করতে হবে। শিক্ষা উপকরণগুলোর মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও সহজ করতে হবে। ১১শ ধারায় প্রকাশ্যে বা সংবাদপত্রে নাম ধরে কারও সমালোচনা প্রসঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট পার্টি কমিটির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কারও নাম ধরে সমালোচনা প্রচার ঠিক হবে না। পত্রিকায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি ধরে নয় বরং প্রবণতা ধরে সাধারণ সমালোচনা রাখতে হবে। ১২শ ধারায় ‘বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও কর্মীদের’ সম্পর্কে বলা হয়, তারা যদি পার্টি এবং সমাজতন্ত্রের বিরোধী না হয়, যদি দেশপ্রেমিক হিসেবে কাজ করে তাহলে তাদের কাজে ও বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর যথাযথ পরিবর্তনে সকল সহযোগিতা দেয়া হবে। একবছর আগে শুরু হয়েছিলো ‘সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলন’। এর সাথে শহর ও গ্রামে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কর্মসূচি সমন্বয়ের বিষয়ে বলা হয় ১৩শ ধারায়। ১৪শ ধারায় বিপ্লবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়। বলা হয়, ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে, উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।’ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে গণমুক্তি বাহিনীসহ সামরিক বাহিনীর ভূমিকা বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয় ১৫শ ধারায়। ১৬শ ধারায় বলা হয়, ‘এই মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে আমাদের সকল কাজের দিশা নিতে হবে ‘মাও সে তুং চিন্তাধারা’ থেকে।’

১৬ দফা ঘোষণার শুরুতেই বলা হয়েছিলো, চীন বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ‘যদিও বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করা হয়েছে তবুও তারা শোষক শ্রেণীর পুরনো ধ্যানধারণা,সংস্কৃতি, প্রথা ও অভ্যাস দিয়ে মানুষকে দূষণ করে আবারো ফিরে আসার চেষ্টা করছে।’ এদের মধ্যে ক্ষমতাবানও অনেকে আছে যাদের পরাজিত করে বিপ্লবকে রক্ষা ও তাকে এগিয়ে নেওয়ার কর্মসূচি হিসেবেই এই বিপ্লবের ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত সমাজতন্ত্রী পত্রিকা মান্থলি রিভিউর সম্পাদক পল সুইজী এবং হ্যারী ম্যাগডফ চীন বিপ্লবকে প্রথম থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁরা ১৯৬৭ সালের জানুয়ারিতে নিজেদের পত্রিকায় এই ঘোষণার সারসংক্ষেপ ও মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিলেন।র তাঁদের মূল্যায়নে এই ১৬ দফা ঘোষণা ছিলো ‘যৌক্তিক, বিপ্লবী এবং মানবিক’ দলিল। মাও সে তুং এর নেতৃত্ব, তাঁর প্রতি চীনের মানুষের বিপুল আস্থার বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বলেছিলেন, তবে এই ভালোবাসা ও আস্থা ব্যক্তিপূজায় পরিণত হবার বিষয়ে তাঁরা সতর্কও করেছিলেন।।

(চলবে…)