Home » সাক্ষাৎকার » বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (শেষ পর্ব)

বিপ্লব অধিকার আর ন্যায্যতা সম্পর্কে অরুন্ধতী রায় (শেষ পর্ব)

সবকিছুই ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিচালনা করা হচ্ছে, এটা পতনের সংক্ষিপ্ত পথ’

Last 4অরুন্ধতী রায়। সাম্প্রতিক সময়ের পুরস্কারজয়ী অন্যতম একটি ফিকশনের লেখক। তার ‘দ্য গড অব স্মল থিং’ যিনিই পড়েছেন, তিনিই পরবর্তীকালে তার লেখা রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর উৎস খুঁজে পাবেন। তার লেখাগুলো একটি অন্যটির পরিপূরক, আর সেগুলো তাকে কেবল ভারতে নয়, বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছে। অরুন্ধতী যে বিশ্বকে ধারণ করেছেন, আক্ষরিক অর্থেই তা বেশির ভাগ লেখকের চেয়ে বড়। কিভাবে তিনি অরুন্ধতী রায় হলেন, তাকে কোন বিষয়টা উদ্দীপ্ত করে, কিভাবে তিনি লেখালেখি শুরু করলেন, তা নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলেছেন সাবা নকভির সাথে। আউটলুক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ওই সাক্ষাতকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ।

প্রশ্ন : বর্তমান ভারতে আমরা কোথায় আছি, কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করছে?

অরুন্ধতী : আমরা এখন যে জীবনযাপন করছি, আরএসএসের ইতিহাসের কারণে কোনো না কোনো পর্যায়ে এমনটা ঘটতোই। আমরা যেভাবে চলছি, তা আসলে আমরা যা তৈরি করেছি, সেটাকেই প্রতিষ্ঠা করবে। এখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হচ্ছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আর শিক্ষার স্থান হচ্ছে না, নির্মম সাম্প্রদায়িক স্থূলবুদ্ধির লোকজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সিলেবাসে মানসম্পন্ন বিষয় বাদ দিয়ে মূর্খতা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবকিছুই ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিচালনা করা হচ্ছে। এটা পতনের সংক্ষিপ্ত পথ। এটা কেবল রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতার বিষয় নয়। বিশাল পাথর এগিয়ে চলেছে। এটা প্রতিটি আত্মা, এই দেশের কল্পনাপ্রতিভার ওপর আঘাত। এটা মারাত্মক বিষয়। আমি বলতে চাচ্ছি, কিছু কিছু প্রতিক্রিয়ায় আমি উৎসাহিত হচ্ছি। সব জায়গায় জনগণের দাঁড়িয়ে পড়ছে, এফটিআইআই ছাত্রদের দিকে দেখুন, দারুণ ব্যাপার। যে আক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াচ্ছি সেটা বিশাল, গভীর ও বিপজ্জনক। তবে মোদি সরকারকে ঘিরে থাকা মোহ দ্রুত উবে যাচ্ছে, যে কারো অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতগতিতে। আমার ভয় হচ্ছে, তারা যখন সত্যিই বেপরোয়া হয়ে যাবে, তখন তারা বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। তারা সে কারণেই ইয়াকুব মেমনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তারা সম্ভবত আগামী নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ইন্ধন দেবে। আমি আশঙ্কা করছি, পাকিস্তানের সাথে প্রতারণাপূর্ণ ‘সন্ত্রাসী’ হামলা, যুদ্ধ, পরমাণু যুদ্ধও বাঁধিয়ে দেওয়া হতে পারে। সীমান্তের উভয় পক্ষের সরকারের মধ্যেই এ ধরনের পাগলামি রয়েছে এবং মিডিয়া তেমন কিছু করতে সক্ষম।

প্রশ্ন : আপনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত লেখক, কিন্তু আপনি লেখক জনসম্প্রদায়ের অংশ হতে চান না। আপনি সাহিত্য ফেস্টিভ্যালগুলোতে অংশ নেন না, যদিও আপনি এমন সম্প্রদায়ের অংশ, যাদের বলা হয় অ্যাক্টভিস্ট।

অরুন্ধতী : এখানে লেখক সম্প্রদায় বলে কিছু আছে কি না তা আমার জানা নেই। দেখুন, আমি বিশুদ্ধবাদী নই। আমি যা চিন্তা করি, তাই করতে পারি। লোকজনকে উৎসবগুলোতে যেতে হয়, অনেক সময় এমন সব উৎসবে যেগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করে খনি করপোরেশন ও ফাউন্ডেশন, যাদের বিরুদ্ধে আমি লিখি। তবে তার মানে এই বলছি না যে, আমি তাদের চেয়ে বিশুদ্ধ। আমি তা নই। আমি অস্বস্তি অনুভব করি, তাই আমি তা করি না। তবে টিকে থাকার জন্য এই দুনিয়া কঠিন জায়গা। লোকজনকে এমন কাজ করতে হয়, যা সে করতে চায় না। বাছাই করে নেওয়ার মতো সুযোগসুবিধা আমার আছে। ফলে আমি পারি। সেই সুবিধাটা সবার নেই।

অ্যাক্টভিস্ট’ পরিভাষাটার কথা বলি, আমি নিশ্চিত নই, কখন এটা চালু হলো। আমার মতো কাউকে লেখকঅ্যাক্টভিস্ট বলা বলতে এটাই বোঝানো হতে পারে যে, কোনো লেখক যে সমাজে বাস করছেন, সেটা নিয়ে কিছু লেখা তার কাজ নয়। অথচ এটাই আমাদের কাজ হওয়া উচিত ছিল। এটা একটা অদ্ভূত ব্যাপার। বাজারে বরণ করে নেওয়ার আগে পর্যন্ত লেখকরা যা করে তা হলো তারা সহজাত ধারার বিরুদ্ধে লেখেন, সীমান্ত টহল দেন, সমাজের কিভাবে চিন্তা করা উচিত তা নিয়ে নিরূপণ করার বিতর্কে অংশ নেন। তারা বিপজ্জনক লোক। এখন আমাদের বলা হচ্ছে, আমাদের অবশ্যই ফেস্টিভ্যালে হাজির হওয়া উচিত, বেস্টসেলারের দিকে ছোটা উচিত আর সম্ভব হলে সুশ্রী হওয়ার চেষ্টাও করা উচিত।।