Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ভেনিস ও টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসব :: জঙ্গীবাদ আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নানা ছবি

ভেনিস ও টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসব :: জঙ্গীবাদ আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নানা ছবি

ফ্লোরা সরকার

Last 6গত ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব এবং টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হলো গত ১০ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর। কিছু কিছু ছবি দুটো উৎসবেই প্রদর্শিত হয়েছে। যেমন হিউমান, বিস্ট অফ নো নেশন, আনোমালিসা সহ আরো বেশ কিছু ছবি। তবে, এ্যওয়ার্ডের বেলায় দুই উৎসবে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। এ লিটল প্রিন্সেস, হ্যারি পটার, গ্র্যাভেটি ইত্যাদি ছবি খ্যাত মেক্সিকান প্রযোজক, পরিচালক, চিত্র নাট্যকার এবং সম্পাদক আলফনসো কুয়ারন ওরোজোকে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। ফেদ্রিকো ফেলিনির সম্মানে তার নির্মিত ‘অ্যামাকর্ড (১৯৭৩)’ ছবিটি আবারও প্রদর্শন করা হয়। তাছাড়াও ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর’ ফোর হানড্রেড বেলাজ’ ছবিটিও দেখানো হয় বিশেষ সম্মাননার জন্যে। অন্যদিকে, টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বিভাগে ছিলেন ক্ল্যার ডেনিস, জিয়া হ্যাংক এবং আগনিস্কা হল্যান্ডের মতো চিত্রনির্মাতারা। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফ্রম আফার’ ছবিটি গোল্ডেন লায়ন এবং ‘দ্য ক্ল্যান’ ছবিটি সিলভার লায়নে ভূষিত হয়। টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘রুম’ ছবিটি দর্শক প্রিয়তার তালিকায় সর্বোচ্চ স্থান পায়। এবারের দুই চলচ্চিত্র উৎসবে সন্ত্রাসবাদ এবং স্বৈরাচারভিত্তিক ছবির সংখ্যাই প্রাধান্য পায়। উৎসবের সেসব ছবির উপর প্রাধান্য দিয়ে আমাদের আজকের চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনা।

সন্ত্রাস এখন দেশে দেশে যেন ‘প্লেগ’ এর মতো ছড়িয়ে গেছে। তারা কোনো দেশের বা জাতির নয়, হতে পারেনা। ছবির সন্ত্রাসী নায়ক আগুকে তাই বলতে শোনা যায়, ‘বুলেট, আমাদের সবাইকে গিলে খাচ্ছে’। পশ্চিম আফ্রিকার গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে পরিচালক ক্যারি জোজি ফুকুনাগার ‘বিস্ট অফ নো নেশন’ ছবি, যা ভেনিস এবং টরোন্টো উভয় চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়। আগু নামের ছেলেটি দেখেছে, কিভাবে তার বাবা এবং ভাই গৃহযুদ্ধের দামাডোলে নিহত হয়। এতিম এই ছেলেটি বাধ্য হয়ে সন্ত্রাসী দলে যোগ দেয় এবং একজন রোবট হত্যাকারীতে পরিণত হয়। খুব ছোট বয়সেই সে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে। এবং ছবির সব থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, ছোট বয়সে যাকে যা শেখানো হয়, সে সেটা শিখেই বড় হয়। সন্ত্রাসী দলের প্রধান ইদ্রিস এলবা তাই বালক আগুকে ছোট থেকেই এসব কর্মকান্ডে অভ্যস্ত করে তোলে। সন্ত্রাসই যেন এখন সব ক্ষমতার উৎস। তাই ইদ্রিস এলবার মতো মানুষদের প্রয়োজন পড়ে আগুদের মতো যুবকদের। কিন্তু আগুরই আরেক কিশোর বন্ধু, সেও সন্ত্রাসী, কোনো এক অপারেশানের সময় গুলি খেয়ে মারা যাবার সময় বলে, ‘এসব শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুর সমাধান দিতে পারেনা’। ছবিতে ইচ্ছে করেই, ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাসকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত করে দেখানো হয়েছে, যাতে এসব সন্ত্রাস দর্শককে কিছুটা হলেও যেন ভাবিয়ে তোলে।

তুরস্কের পরিচালক এমিন এলপারের ‘আবলুকা’ বাংলায় অনুবাদ করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘উন্মাদনার প্রকোপ’ ভেনিস উৎসবের অন্যতম আরেকটি চমৎকার ছবি। যেখানে এমন একটি সমাজ কল্পনা করা হয়, যা অত্যন্ত অমানবিক এবং অপ্রীতিকরই নয়, কৌশলে সেই সমাজকে এভাবে রাখা হয়। যে কৌশলের নাম, ‘টেররিজম’ অর্থাৎ ‘সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গীবাদ’। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো দেশ আজ ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিমূর্লের উন্মাদনার নামে প্রকম্পিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রকোপের উৎসাহদাতা বা প্রধানদের সব সময় আড়াল করে রাখা হয়। দুই ভাই কাদের (বড়) এবং আহমেত (ছোট) এই উন্মাদনার জোয়ারে যেন ভেসে যায়। দুই ভাইই সন্ত্রাসবাদ নিমূর্লে অংশ নেয় দুই ভাবে। কাদের, যে দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই ছাড়া পায় এই শর্তে যে, সরকারের সন্ত্রাস নির্মূলে তাকে সহায়তা করতে হবে। আর আহমেত একই কাজ করে, ছবিতে যা, প্রতীকী ভাবে কুকুর নির্মূল দিয়ে দেখানো হয়, কিন্তু সে তা করে সরকারের লোক হয়ে নয়। সন্ত্রাস নিমূর্লের বিষয়টা বর্তমান সময়ে যেন দাবার চালের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। সন্ত্রাস নির্মূলের নামে আরো অধিকতর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে জনগণের দৃষ্টির আড়ালে। ‘আবলুকা’ ছবির দুই ভাই রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত সন্ত্রাস নির্মূলের সেই ঘূণিবার্তায় যেন ঘুরপাক খেতে থাকে।

ফ্লোরিয়ান গ্যালেনবার্গার পরিচালিত ‘কলোনিয়া’ টরোন্টো উৎসবে প্রদর্শিত অন্যতম একটি ছবি। ছবির প্রেক্ষাপট ১৯৭৩ সালে পিনোচে’র ক্ষমতারোহনের ঠিক পরবর্তী সময়, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাস। সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করে সরিয়ে যে পেনোচে’কে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পদায়ন করা হয়। সেই সময়ের অন্যতম লোমহর্ষক হত্যাকারী পল সাচাটারের সত্য কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই ছবি। ছবিতে দেখানো হয়, কিভাবে ছবির নায়ক ড্যানিয়েলকে সাচাটারের আখড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। যে আখড়ার নাম দেয়া হয় ‘কলোনি অফ ডিগনিটি’। সেই কলোনি অফ ডিগনিটিতে এমনভাবে ভগবদ্বসংক্রান্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চ্চা করা হতো, যে চর্চ্চা মূলত পিনোচে শাসন পরিচালনার জন্যে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র এবং বিষাক্ত সরঞ্জামাদি নির্মাণে সহায়তা করতো। প্রায় একই রকমের আরেকটি ছবি, ‘ডারটি ওয়ার’ যা ভেনিস উৎসবে দেখানো হয়। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৩ আর্জেন্টিার সেনা শাসনের ইতিহাস ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। সেই সময়ে আর্জেন্টিনায় কমিউনিস্ট বিরোধী চক্র সরকারের সঙ্গে একত্রিত হয়ে গুম করার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। আশির দশকে পুসিও পরিবারের তিনজন সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে চারজম মানুষকে গুম করার দায়ে। যে চারজনের মাঝে তিন জন এই পরিবারের দ্বারা নিহত হন। পরিবারের প্রধান আরকু ইমেদসকে এই গুমের প্রধান হোতা বলে সন্দেহ করা হয়। সেই সময়ের সত্য কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে ডারটি ওয়ার ছবিটি।

কানাডার প্রামান্যচিত্র ‘গুয়ান্তানামোস চাইল্ড’ টরোন্টো উৎসবের অন্যতম একটি ছবি। প্যাট্রিক রিড এবং মাইকেল স্টেফার্ড পরিচালিত প্রামান্যছবিতে ওমর কাদের, যাকে মাত্র পনের বছর বয়সে, ২০০২ সালে রাম্সফেলডিয় ‘নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর’ শাস্তির জন্যে গুয়ান্তানামোয় নিয়ে যাওয়া হয়, তার একটি দীর্ঘ লোমহর্ষক সাক্ষাতকার দিয়ে সাজানো হয়েছে। কানাডিয়ান নাগরিক ওমর আট বছর বয়সে তার বাবামার সঙ্গে প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে আফগানিস্তানে যায়। সেখানে তখন আমেরিকান বাহিনী এবং তালেবানদের মাঝে তুমূল লড়াই চলছে। ওমর আমেরিকান বাহিনীর হয়ে কাজ করলেও, নানান ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে তাকে জড়িয়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং গুয়ান্তানামোয় তের বছরের দুর্বিসহ জীবন নিয়ে থাকতে হয়।

টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো মাইকেল মুর পরিচালিত প্রামান্যচিত্র ‘ওয়ের টু ইনভেড নেক্সড’। তার শেষ ছবি ২০০৯ সালের (ক্যাপিটালিজম : দ্য লাভ স্টোরি) পর, প্রায় ছয় বছর চুপচাপ বসে থাকার পর, মাইকেল মূর যেন আবার জেগে উঠলেন এই ছবির মধ্যে দিয়ে। মাইকেল মুরের ছবির বৈশিষ্ট্যই হলো অন্যায়, অবিচার, অমানবিকতা ইত্যাদিকে ব্যঙ্গ করে উপস্থাপন। এই ছবিটিও তার ব্যতিক্রম নয়। মুর এই ছবিতে যা বলতে চাচ্ছেন তা হলো, আমেরিকা তার যা পাবার, দেখার সব পূর্ণতা অর্জন করে ফেলেছে। এখন তাকে বাইরের দিকে তাকাতে হবে। কেননা, আমেরিকার নাগরিকেরা, তাদের নেতাদের কথায় উঠে, বসে, চলাফেরা করে। কিন্তু বাইরের দিকেও তাকাবার প্রয়োজন আছে। এই বাইরে যেতে গিয়ে মুর নানান দেশের তুলনা টেনে আনেন। যেমন ইতালি থেকে ছুটির সময়েও যে বেতন দেয়া হয় তার কথা তুলে ধরেন। ফিনল্যান্ডের স্কুল ব্যবস্থাপনার কথা, যেখানে স্কুলের ক্লাসের সময় কম, কিন্তু কার্যকার ব্যবস্থা সেখানে বিরাজমান। আইসল্যান্ডের রাজনীতি নারী দ্বারা শাসিত। ফ্রান্সের স্কুলের চমৎকার খাবার সরবাহের কথা উল্লেখ করেন ইত্যাদি। মূলত মুরের এই ছবি তার অন্যান্য ছবির মতো রাজনৈতিকতার চাইতে সাংস্কৃতিক দিকের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে উভয় চলচ্চিত্র উৎসবে বরাবরের মতোই বেশ ভালো কিছু ছবি দেখানো হয়। যে ছবিগুলো পুরস্কারের আওতায় না গেলেও যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। বর্তমান চলমান সময়ের সংকটজনিত ছবিগুলি যদি উৎসবের কেন্দ্রে বন্দী না রেখে আমাদের মতো দেশগুলিতে প্রদর্শিত হয়, এখানকার চলচ্চিত্রমোদিরাও উপকৃত হতেন। আমরা আশা করবো, হলিউডি ধারার ছবিগুলির আমদানির পরিবর্তে, এসব গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলির আমদানির প্রতি সরকার সচেষ্ট হবেন।।