Home » আন্তর্জাতিক » গুয়ান্তানামো :: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কাহিনী

গুয়ান্তানামো :: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কাহিনী

জেনিফার ফেনটন, আলজাজিরা

অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 1প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গুয়ান্তানামো বে’র কারাগার বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা সহসাই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রশাসন যেসব বন্দীকে মুক্তি না দিয়ে অবশ্যই ‘চির জীবনের জন্য’ কারাগারে রাখতে হবে বলে জানিয়েছে, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিকল্প স্থান নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার। অনেকের মতেই কাজটি ঠিক হচ্ছে না। বরং তাদের মতে, প্রেসিডেন্টের উচিত ছিল যেসব লোককে সরিয়ে নেওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে, তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করা।

সম্প্রতি সৌদি নাগরিক আবদুল শালাবিকে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। কিউবার মার্কিন নৌঘাঁটিতে তিনি তার ১৩ বছরের জেলজীবনের ১০ বছর অনশন ধর্মঘট করে কাটিয়েছেন। মরক্কোর ইউনুস চেক্কোরিকেও সম্প্রতি মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে তাকে মুক্ত মানুষ হিসেবে বাড়ি ফিরতে দেওয়া হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। বাকি ৫২ জনকে স্থানান্তর অনুমোদন করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রহণ করতে অনেক দেশই নারাজ। অবশ্য ২০০৯ সাল থেকে এই ৫২ জনের সামান্য কয়েকজনকেই মাত্র নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। গুয়ান্তানামোর শেষ ব্রিটিশ বাসিন্দা শাকর আমর তখন নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছিল, এর আগে ২০০৭ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন তা করেছিল।

মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত আমরকে দেশে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতির মধ্যে সম্ভবত কুখ্যাত বন্দীশালা বন্ধ করতে চায় বলে মার্কিন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে তাদের অনীহার বিষয়টি ফুটে ওঠেছে।

ব্রিটিশ সরকার বেশ কয়েকবার আমরকে যুক্তরাজ্যে তার স্ত্রী ও চার সন্তানের (এদের মধ্যে এক শিশু সেদিন জন্মগ্রহণ করেছিল, যেদিন তিনি গুয়ান্তানামো পৌঁছেন) সাথে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের প্রথম দিকে ব্রিটিশ লেবার পার্টির প্রখ্যাত নেতা জেরেমি করবিন বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা যত দিন ধরে প্রেসিডেন্ট আছেন, তার চেয়েও বেশি দিন আগে তাকে মুক্তির জন্য খালাস দেওয়া হয়েছে।’ করবিন এই প্রশ্নও তোলেন যে, আমরকে কি এজন্যই মুক্ত হচ্ছে না, কারণ ‘তিনি অনশন ধর্মঘট, নির্যাতন ও নৃশংসতা অনেক বেশি ভোগ করেছেন, এগুলো সম্পর্কে অনেক বেশি জানেন?’

এসব দাবি প্রমাণ করে যে, ‘নিরাপত্তা বা অন্য কোনো ধরনের উদ্বেগ নেই, কারণ সবকিছুই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য,’ মেইলের মাধ্যমে আলজাজিরাকে বলেছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ ও এমআইএর সন্ত্রাসবিরোধী সাবেক প্রধান রিচার্ড ব্যারেট। সিআইএ’র পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটিজিক এনালাইসিস প্রগ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক এমিলি ন্যাকলেহ এই মন্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায় ‘ব্রিটেন হলো [তাকে গ্রহণ করার ব্যাপারে] নির্ভর করার মতো সর্বোত্তম দেশ।যৌক্তিক কারণেই আমরা উগান্ডা বা মালির কথা আলোচনা করতে পারি না। আমি বোঝাতে চাইছি, আমরা প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধব্যবস্থা রয়েছে, এমন দেশ নিয়ে আমরা কথা বলছি।’

উদ্দীপ্ত সন্ত্রাসী

আমরকে (অন্যদের সাথে) অব্যাহতভাবে কারাগারে রাখার বিষয়টি উভয় বিশ্লেষকের কাছে উদ্বেগজনক বিবেচিত হয়েছে। বর্তমানে নিরাপত্তা বিশ্লেষক সংস্থা দি সফন গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সক্রিয় ব্যারেট বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, গুয়ান্তানামো এবং অন্যান্য স্থানে বিনা বিচারে আটক করাটা চরমপন্থীদের দলে ভর্তি করার হাতিয়ার প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময়ই গুয়ান্তানামো বন্ধ করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছি, কারণ এটা সবসময়ই বিদেশি জিহাদিদের রিক্রুটিংয়ের সহায়ক হয়েছে।’ আমের এবং তারেক বা ওদা (মৃত্যুর মুখে থাকা অনশন ধর্মঘটী) ও ফাহদ গাজির (তিনি ১৭ বছর বয়স থেকে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন) মতো নির্দোষ ঘোষিত বন্দীদের ব্যাপারে স্রেফ ওবামার নির্দেশেই হতে পারে। কিন্তু ওবামা ওই পথ গ্রহণ করেননি। কথা ও কাজের মধ্যে পার্থক্য রয়ে গেছে।

সবচেয়ে খারাপের খারাপ

গুয়ান্তানামোর তথাকথিত ‘চিরস্থায়ী বন্দীরা’ (যাদের বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ আনা হয়নি, আবার মুক্তিও দেওয়া হয়নি) তাদের মামলাগুলো ধীরে ধীরে পেরিওডিক রিভিউ বোর্ডে (২০১১ সালের ৭ মার্চ ওবামার নির্বাহী নির্দেশে গঠিত) উপস্থাপন করছেন। বন্দীদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এক বছরের মধ্যে শুনানি হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা হয়নি।

সম্প্রতি মুয়াজ আলআলভিকে হস্তান্তর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে বেড়ে ওঠা এই ইয়েমেনি বলেছেন, তিনি ২৪ বছর বয়স্ক তরুণ হিসেবে ২০১১ সালে আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন কোরআন শেখাতে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন হামলার পর তিনি ওই দেশ ছেড়ে যান। তাকে আটক করে পুরস্কারের লোভে বিক্রি করে দেওয়া হয় (অনেক আরবকেই এভাবে বিক্রি করা হয়েছিল), তারপর তার স্থান হয় গুয়ান্তানামোতে। তিনি এবং আরো অনেকে এটাকে ‘সবচেয়ে খারাপের খারাপ’ কারাগার হিসেবে অভিহিত করেছেন। মাত্র ৯৭ পাউন্ড (৪৪ কেজি) ওজন এবং ৫‘-উচ্চতার আলআলভি তার আটকের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অনশন ধর্মঘট করে আসছেন।

অন্যান্য বন্দী ও প্রহরীদের জন্য কারাগারে মিষ্টি তৈরির কাজ করেন আলআলভি। তার আইনজীবী রামজি কাসেমের মতে, তিনি নিজস্ব ধরনের ক্যান্ডি বার তৈরি করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলআলভির স্থানান্তর অনুমোদন করা হলে, তিনি অনশন প্রত্যাহারও করতে পারেন।

গুয়ান্তানামোর যে ১৮ বন্দী রিভিউ বোর্ডের সামনে হাজির হয়েছেন, তাদের চারটি মামলা মুলতবি রয়েছে। ১১ জনকে স্থানান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন কুয়েতি বন্দী ফায়েজ আলকান্দারি এবং লিবিয়ার ওমর খালিফ মোহাম্মদ। খালিদ মোহাম্মদের ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে নেই, বাম পায়ে ধাতব পিন রয়েছে, এক চোখ নষ্ট। তার আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন কাসেম। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় তিনি হাঁটু এবং ডান পায়ের স্থানে লাগানো কৃত্রিম পায়ে ভর দিয়ে তিনি হাঁটার চেষ্টা করেন। তিনি নিজে নিজে খেতে পারেন না, গোসল করতে পারেন না, এমনকি টয়লেট পর্যন্ত করতে পারেন না।

যাদের এখনো নির্দোষ ঘোষণা করা হয়নি তাদের মধ্যে ব্রিটেনের অন্যতম বেস্ট সেলিং লেখক মোহাম্মাদু আউদ স্পাহি রয়েছেন। তাকে কবে বোর্ডের সামনে হাজির করা হবে, সে তারিখও নির্ধারিত হয়নি।

আইনি প্রহসন

প্রশ্নবোধক প্রক্রিয়া এবং আইনি লড়াইয়ে বিপর্যয়ের কারণে মার্কিন সামরিক কমিশনগুলোর সবই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর হামলার হোতা হিসেবে কথিত খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তার কথিত সহযোগীরা ১৪ বছর পরও বিচার শুরুর প্রহর গুণছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস কমিশনগুলোকে ‘আইনি প্রহসন এবং বাস্তবে ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সত্যি বিষয় হলো, এমন কিছু লোক আছে, যাদের সহজেই মার্কিন আদালতগুলোতে বিচার করা যায়। আমাদের একটি মহান বিচারব্যবস্থা রয়েছে,’ বলেছেন ন্যাকলেহ। ‘মার্কিন আদালতগুলো ইতোমধ্যেই শতাধিক সন্ত্রাসী এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, তারা এখন সর্বোচ্চ নিরাপত্তাসংবলিত কারাগারগুলোতে পচে মরছে।অর্থাৎ বিষয়টা এমন নয় যে, আইনিপ্রক্রিয়া ব্যাপারটা মোকাবিলা করতে পারছে না।’

সামরিক বিচারে দোষী সাব্যস্তকরণের অনেক রায় আংশিক বা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। গুয়ান্তানামো সামরিক আদালত আধুনিক ইতিহাসে একমাত্র আদালত হিসেবে ন্যাক্কারজনক কাজ করেছে যুদ্ধাপরাধের জন্য ওমর খাদির নামের এক শিশুকে দিত করে। বারাক ওবামা ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ২৪২ কারাবন্দী থেকে কমে এখন ১১৪ জনে নেমে এসেছে। আলআলাভি জুনে অভিমত প্রকাশ করেছেন, প্রেসিডেন্ট যাদেরকে অনেক আগেই কারাগারটি বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা সামান্যই প্রবোধ পাচ্ছে।

বিশ্ব হয়তো চোখ বন্ধ করে আছে এবং এই সংখ্যাটাও তাদের কাছে ছোট বলে মনে হলেও এখানে আমাদের প্রত্যেকের জন্যই অনির্দিষ্ট ও অন্যায় কারারুদ্ধকরণের ফলে যে মূল্য দিতে হচ্ছে তা সব ধরনের হিসাবের ঊর্ধ্বে।’