Home » আন্তর্জাতিক » আফগান ট্রাজেডি :: মৃত্যুই যেন একমাত্র বিকল্প

আফগান ট্রাজেডি :: মৃত্যুই যেন একমাত্র বিকল্প

আসিফ হাসান

Last-2আফগানরা মরছে। মার্কিন হামলায় মরছে, তালেবান হামলায় মরছে, সরকারি হামলাতেও মরছে। মৃত্যুই যেন তাদের একমাত্র ভাগ্যলিপি। এখন চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত মানুষজনও রেহাই পাচ্ছেন না। অতি সম্প্রতি কুন্দজে সাহায্য সংস্থা মেডিসিন্স স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) পরিচালিত একটি হাসপাতালে মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়।

ওই হাসপাতালে হামলা হবে, অন্তত মার্কিন হামলা, তা কল্পনাও করা যায়নি। হাসপাতালটি অনেক দিন থেকেই কাজ করছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর তালেবান বাহিনী উত্তর আফগানিস্তানের কুন্দুজ নগরীর দখল নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সবাইকেতালেবান, আফগান নিরাপত্তা বাহিনী এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১৩,২০০ সদস্যবিশিষ্ট শক্তিশালী ন্যাটো বাহিনীর কাছে হাসপাতালটির অবস্থান জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ভুল হওয়ার অবকাশই ছিল না। আর তালেবান বা অন্য কোনো ইসলামপন্থী গ্রুপ যদি ভুলেও হামলাটি চালাত, তবে এত দিন মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে ব্যাপক প্রচার পেত।

ন্যাটোর প্রশিক্ষকদের নিয়ে আফগান বিশেষ বাহিনী তালেবান হটাতে হামলা চালিয়েছিল। তাদেরকে সহায়তা দিয়ে তাতে অংশ নেয় ভারী কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট লেসারনিয়ন্ত্রিত বোমা বহনকারী একটি এসি১৩০ গানশিপ। তারা যে একটি হাসপাতালের কাছাকাছি হামলায় অংশ নিচ্ছে, সেটা পাইলটদের অজানা থাকার কথা ছিল না। এমএসএফ স্টাফ ওই সময়ও পাগলের মতো আফগান সরকার এবং ন্যাটো কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। ওই যোগাযোগের আধা ঘণ্টার মধ্যে হামলাটি হলো। কেন? তার জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।

আগামী বছরের শেষ নাগাদ আফগানিস্তান থেকে পাশ্চাত্যের বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে। এমন প্রেক্ষাপটে এই হামলা নিশ্চিতভাবেই নতুন কিছু বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সিরিয়ায় বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকায় বেসামরিক এলাকায় রাশিয়ার নির্বিচার বোমা হামলা নিয়ে পাশ্চাত্য যে সমালোচনা করছে, এই ঘটনা তাদের ওই অবস্থানকে ভণ্ডামি হিসেবেই বিবেচিত হবে অনেকের কাছে।

অবশ্য পাশ্চাত্যের মিডিয়াগুলো বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের মতে সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ন্যাটোর বেসামরিক হত্যাকাবেশ কমে এসেছে। প্রেসার গ্রুপ অ্যাকশন অন আর্মড ভায়োলেন্সএর হিসাব অনুযায়ী ন্যাটো আরো সতর্ক নীতি গ্রহণের ফলে বিমান হামলায় বেসামরিক মৃত্যু ৮১ ভাগ কমে এসেছে।

পাশ্চাত্যের মিডিয়া এ প্রসঙ্গে রাশিয়ার হাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরছে। তাদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, রাশিয়া যেভাবে যুদ্ধ করে, তা বেসামরিক প্রাণহানির ব্যাপারে প্রায় পুরোপুরি বেপরোয়া। তাদের ভাষ্যানুযায়ী, আফগানিস্তানে সোভিয়েত যুদ্ধের দশকে (যা শেষ হয় ১৯৮৯ সালে) ১০ লাখেরও বেশি বেসামরিক আফগান নিহত হয়েছিল। আর তালেবান হটানোর পর নিহত হয়েছে ২৬ হাজার। এদের বেশির ভাগই নিহত হয়েছে তালেবানের হাতে। ১৯৯৯ সালে ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে পরিচালিত দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধে অন্তত ২৫ হাজার নিহত হয়েছে। এছাড়া রাসায়নিক প্ল্যান্ট এবং গুদামে পরিকল্পিত হামলার কারণে অনেক স্থানে মারাত্মক পরিবেশ দূষণের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সিরিয়ায় রাশিয়ার হামলা পরিচালিত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ‘ডাম্ব’ বোমা দিয়ে।

রাশিয়া ও আমেরিকা উভয়ের হাতেই বেসামরিক নাগরিক নিহত হচ্ছে। দ’ুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? সেটাও তুলে ধরা হয়েছে কোনো কোনো প্রতিবেদনে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অল্প সময়ের মধ্যেই কুন্দুজে হতাহতদের পরিবারের কাছে সান্তনা পাঠিয়েছেন, কী ঘটেছে, তা নিয়ে তদন্ত হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ায় সিরিয়া নাগরিকদের প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছ থেকে এ ধরনের সহানুভূতি বা তদন্তের আশ্বাস পেতে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।

দুঃখপ্রকাশ, ক্ষমা প্রার্থনাযাই হোক না কেন, আসল কথা হলো আফগানরা মরছে। ২০০১ সাল থেকে আফগান যুদ্ধে প্রামাণ্য হিসাব অনুযায়ী ২৬ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২৯,৯০০ বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছে। আর এই সংঘাতে বেসামরিক মানুষ, সৈন্য, জঙ্গি সব মিলিয়ে ৯১ হাজার আফগান নিহত হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে পরোক্ষভাবে মারা গেছে আরো তিন লাখ ৬০ হাজার। এই হিসাবের মধ্যে পাকিস্তানে যারা মারা গেছে, তাদের ধরা হয়নি।

জাতিসংঘের অত্যন্ত সংযত হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকেই নিহত হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি মানুষ।

পরিস্থিতি কেবল অবনতিই ঘটছে। বেসামরিক হতাহত বেড়েই চলেছে। ২০১৪ সালের প্রথম অংশের তুলনায় চলতি বছরের প্রথমাংশে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ ভাগ। জাতিসংঘ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, এসব হতাহতের বেশির ভাগই ঘটেছে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনীর হাতে।

অন্যদিকে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। অন্তত ৪০ ভাগ মানুষ বেকার বলে মনে হচ্ছে। সামাজিক বৈষম্য নিদারুন হারে বেড়েছে। বিদেশী যে সাহায্য আসে, তার সিংহভাগ যাচ্ছে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা মানুষজন এবং তাদের স্বজনদের পকেটে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রকমের অসহ্যকর হওয়াতে আফগানরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ইউরোপে উদ্বাস্তু হিসেবে যাওয়া আফগানদের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে কমসে কম ১৩ ভাগে। সিরিয়ানদের পরই তাদের স্থান।

আফগানিস্তানে ২০০১ সালে ‘অপারেশন এনডিয়োরিং ফ্রিডম’ নামে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তার প্রথমে চালানো হয় বিমান হামলা। তাতে ভয়াবহ মাত্রায় বেসামরিক মানুষজন নিহত হতে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিমান হামলায় হতাহত আবার বাড়তে শুরু করেছে। ন্যাটো বাহিনীতে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের সৈনিকদের হাতেই বেসামরিক আফগানদের প্রাণ বেশি যাচ্ছে। ফলে আফগান সরকার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনাও সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি হামিদ কারজাইয়ের মতো বশংবদ প্রেসিডেন্টও ২০০৭ সালে বিদেশী সামরিক কমান্ডারদের তলব করে আফগান বেসামরিক হতাহতের পরিণাম সম্পর্কে তাদের হুঁশিয়ার করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এর আগে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সোভিয়েতআফগান যুদ্ধ হয়। ৯ বছরের ওই যুদ্ধে সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদরা যুক্তরাষ্ট্র এবং আরো কয়েকটি মুসলিম দেশ থেকে সহায়তা পায়। ওই যুদ্ধে সাড়ে আট লাখ থেকে ১৫ লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল। আর লাখ লাখ আফগান উদ্বাস্তু হিসেবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তাদের বেশির ভাগেরই ঠাঁই হয়েছিল পাকিস্তান ও ইরানে।।

(বিদেশী পত্রিকা থেকে)