Home » শিল্প-সংস্কৃতি » গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি আর অসহায় ভিকটিমদের কাহিনী :: ওয়েস্ট বৈরুত

গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি আর অসহায় ভিকটিমদের কাহিনী :: ওয়েস্ট বৈরুত

ফ্লোরা সরকার

Last-6হোটেল রুয়ান্ডা’ ছবিতে, রুয়ান্ডার প্রচন্ড গৃহযুদ্ধের সময়, জাতিসংঘ থেকে আগত একজন সাংবাদিক যখন হোটেল রুয়ান্ডার লবিতে পাশাপাশি দুজন রুয়ান্ডান তরুণীকে দেখেন, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান, তার কাছে মনে হয়, যমজ দুই বোন যেন বসে আছে। কিন্তু পরক্ষনেই যখন জানতে পারেন, তরুণী দু’জনের একজন হুতু এবং আরেকজন তুতসি, তখন রুয়ান্ডান সাংবাদিক বেনেডিক্টের কাছে জানতে চান, হুতুতুতসির সমস্যাটা কোথায়। একই রকম দেখতে অথচ কি বৈরি সম্পর্ক এই দুই জাতির মধ্যে। বেনেডিক্ট চমৎকার করে, মাত্র দুই এক লাইনের সংলাপে, পুরো রুয়ান্ডার ইতিহাসটা যেন বলে দিলেন – ‘বেলজিয়ান কলোনির মতে, তুতসিরা লম্বা এবং সুরুচিপূর্ণ। এই বেলজিয়ানরাই মূলত পার্থক্য তৈরি করেছে আমাদের এই হুতুতুতসির মাঝে। (রুয়ান্ডায় বেলজিয়ান উপনিবেশ কালে) আমাদের ভেতর থেকে তারা সেসব মানুষদের তুলে নিতো, যাদের নাক সরু, গায়ের রং কিছুটা উজ্জ্বল। সেই সরু নাকের অধিকারী তুতসিদের দিয়ে তারা প্রশাসনের কাজ চালাতো। কিন্তু দেশ ছেড়ে যাবার সময় হুতুদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেলে, তুতসিদের উপর দীর্ঘদিনের শোষণের প্রতিশোধ নিতে হুতুরা ব্যস্ত হয়ে পড়লো।’

মুখের গড়নে সামান্য পার্থক্য ছাড়া হুতু আর তুতসিদের মাঝে কোনো প্রভেদ নেই। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি কোনো কিছুতেই তাদের মাঝে ভেদাভেদ নেই। অথচ কত বিস্তর বিভেদ তৈরি করে দিয়েছে। বেনেডিক্টের সংলাপটা ভালো করে লক্ষ্য করেন, ‘এই বেলজিয়ানরাই মূলত পার্থক্য তৈরি করেছে’ অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের ক্ষমতার দাপটে, শক্তির অহমিকায়, উপনিবেশিত দেশকে যা বুঝিয়ে দেয়, তাদের তাই বুঝতে হয় অথবা বুঝতে বাধ্য করা হয়। তারপর সেই বুঝতে পারাটাই তাদের কাছে এক সময় সত্য হয়ে যায়। সত্য হয়ে যায় বলেই, বেলজিয়ানরা চলে গেলেও, হুতুতুতসিরা পরস্পরকে ভিন্ন চোখে দেখা শুরু করে। যে ভিন্নতা জাতিগত সংঘাতের দিকে তাদের ধাবিত করে একসময়। যদিও বর্তমান রুয়ান্ডার অবস্থা আগের মতো নেই। তারা ১৯৯৪ সালে সংঘঠিত সেই ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের স্মৃতি, স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চায়। ‘হোটেল রুয়ান্ডা (১৯৯৪)’ ছবিতে জাতিগত সংঘাতের যে চিত্র দেখায়, ‘কিনিয়ার ওয়ান্ডা (২০১১)’ ছবিতে ঠিক তার বিপরীতে চিত্র দেখা যায়। কিনিয়ার ওয়ান্ডা ছবির শেষে ইমানুয়েল নামের ছেলেটি, যে জেনের বাবামাসহ, অসংখ্য তুতসি নিধন করেছিলো, ছবির শেষে দেখা যায়, জেন এবং অন্যাদের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করে বলে, ‘আমি কায়মনোবাক্যে ক্ষমা চাই জেনের কাছে। সবার কাছে আজ থেকে আমি কেবলই একজন রুয়ান্ডান।’ অর্থাৎ হুতু বা তুতসি নয়, একজন রুয়ান্ডানই হলো ইমানুয়েলের সব থেকে বড় পরিচয়। রুয়ান্ডার সংঘাত শেষ হয়, কিন্তু এসব সংঘাতের বীজ যেহেতু বোনা হয়ে থাকে গভীর থেকে গভীরে তাই যেকোনো সময় তা আবার জ্বলে উঠার আশঙ্কাও থেকে যায়। উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ তাদের নিজেদের স্বার্থে অর্থাৎ লুন্ঠনের পথ মসৃণ রাখার জন্যে, এসব সংঘাতের বীজ যুগের পর যুগ বুনে যায় বিভিন্ন ফর্ম বা আকারে।

ওয়েস্ট বৈরুত’ ছবিতে তাই তারেকের বাবার মুখে সংলাপ শোনা যায়, ‘যুদ্ধ মানুষকে একতাবদ্ধ করে শুনেছি, কিন্তু যুদ্ধই তো শেষ হতে চায়না।’ ১৯৭৫ এর এপ্রিলে লেবাননে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো, যার পরিসমাপ্তি (প্রকৃতই সমাপ্ত হয়েছে কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়) ঘটে ১৯৯০, তার প্রেক্ষাপটে নির্মিত জিয়াদ দোয়েরি পরিচালিত ‘ওয়েস্ট বৈরুত’ ছবি। জিয়াদ দোয়েরি তাই দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ত্রাসের মধ্যে জন্ম নেইনি, এই ত্রাস আমাকে অর্জন করতে হয়েছিলো।’ লেবাননের দীর্ঘ পনের বছরের গৃহযুদ্ধের পেছনে আছে দীর্ঘ এক ইতিহাস, সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট আগে একটু জেনে নেয়া যাক।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার কৌশলটা মূলত পশ্চিমের হাত ধরেই গড়ে ওঠে। তারপর সেই রাজনীতির স্বয়ংক্রিয় বিস্তার ঘটে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে। লেবাননের ক্ষেত্রে ধর্মীয় রাজনীতির বীজ বোনা হয়েছিলো ফ্রান্সের হাত ধরে, ১৯২০ সালে ফ্রান্স যখন লীগ অফ নেশান্সের ম্যানডেট বা অধিকারপ্রাপ্ত হয় লেবানন এবং সিরিয়া শাসন করার। সেই প্রসঙ্গে খুব শীঘ্রই আমার আসবো। তার আগে দেখা যাক, গৃহযুদ্ধের আগে লেবাননের পরিস্থিতি কেমন ছিলো। গৃহযুদ্ধের আগে লেবাননে তিনটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতো, ম্যারোনিট খ্রিস্টান, সুন্নি এবং শিয়া মুসলমান। ইস্টার্ন ক্যাথলিক চার্চের অধীন ম্যারনিট খ্রিস্টানরা অনুসারি ছিলো এই ম্যারোনিট খ্রিস্টান সম্প্রদায়। যারা রোমের পোপের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলো এবং পশ্চিমা সমর্থক গোষ্ঠী। অন্যদিকে, সুন্নি এবং শিয়া, বিশেষত সুন্নি সম্প্রদায় ছিলো আরব লীগের সমর্থক। তাছাড়া জনগণের বেশকিছু অংশ জুড়ে ছিলো প্যান আরব, যাদের ভাবাদর্শ ছিলো, সমগ্র উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি আরব ভূমি প্রতিষ্ঠা করা, আরেকটা অংশ ছিলো বামপন্থী, যারা পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের বিরোধী। জাতিসংঘের পার্টিসান পরিকল্পনানুযায়ী ১৯৪৮ এর ১৪ মে, প্যালেস্টাইন ভূমি যখন ইসরাইলী ভূমিতে প্রতিস্থাপন করা হয়, হাজার হাজার মুসলমান প্যালেস্টাইনি শরনার্থি হয়ে লেবাননে আশ্রয় নেয়। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, লেবাননের সীমান্ত কখনোই তেমনভাবে সুরক্ষিত ছিলো না। কিছু সেনা, যারা ‘কসমেটিক সেনাবাহিনী’ নামে পরিচিত, তাদের দিয়েই যেহেতু সীমান্ত রক্ষা করা হতো, তাই হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি অনায়াসে লেবাননে প্রবেশাধিকার পায়। এই আশ্রয় সমগ্র লেবাননের ভূরাজনৈতিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ ভাবে বদলে দেয়। তাছাড়া লেবননের জনগণের মাঝে বিভক্তিকরণের মূলে শীতল যুদ্ধ অন্যতম একটা ভূমিকা পালন করে। যে কারণে ১৯৫৮ সালে পশ্চিমাপস্থী ম্যারনিট খ্রিস্টান এবং তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া সমর্থক, বামপন্থী ও প্যান আরবদের মাঝে একটা চরম রাজনৈতিক সংকটা দেখা দেয়। ম্যারনিট খ্রিস্টানদের পশ্চিমাভিমুখী হবার মূল কারু হিসেবে বলা যায়, প্রথমত রোমের পোপের সঙ্গে সংযুক্ততা এবং দ্বিতীয়ত ফ্রান্সের সমর্থন। লীগ অফ নেশন্সের সমর্থন নিয়ে ফ্রান্স ১৯২০ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত লেবানন এবং সিরিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়, পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৪৩ এর ২২ নভেম্বর লেবননকে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়, যদিও ফরাসি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ ভাবে দেশটি ত্যাগ করে ১৯৪৬ সালে। কিন্তু দেশ ত্যাগের আগে, সেই হুতুতুতসিদের মতো একটা ‘বড় একটি কিন্তু’ রেখে যায় ফ্রান্স। কমবেশি প্রায় সব ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এই ‘কিন্তু’ চরিত্রটি হুবাহু একই রকম। দেশটি ছেড়ে যাবার সময়, লবাননের সংবিধান ফ্রান্স এমনভাবে প্রণয়ন করে দিয়ে যায়, যাতে করে সকল ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে ম্যারনিট খ্রিস্টান সম্প্রদায়। ফ্রান্স সিদ্ধান্ত দিয়ে যায়, দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন একজন ম্যারনিট খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী একজন সুন্নি মুসলমান এবং সংসদের স্পিকার একজন শিয়া মুসলমান। ত্রিমুখী সংগঠিত সংসদ এবং সেই সঙ্গে প্যালেস্টাইন ভূমি থেকে উচ্ছেদকৃত রিফিউজি হয়ে আসা হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি, আরবা লীগ সমর্থিত জনগণ ও বামপন্থী ইত্যাদি সবকিছু মিলে, মতাদর্শের ভিন্নতাঅভিন্নতা, শীতল যুদ্ধ ইত্যাদি লেবাননকে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। যে অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত একটি গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নেয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে। এরই প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘ওয়েস্ট বৈরুত’।

ছবির শুরুতেই , ছবির কেন্দ্রেীয় চরিত্র কিশোর তারেকের স্কুলের শ্রেণীকক্ষে শিক্ষিকা যেভাবে পাঠদান করেন, পাঠদানের সামান্য কয়েকটা সংলাপে ঔপনিবেশিক চরিত্রের রূপ স্পষ্টভাবে ধরিয়ে দেন পরিচালক দোয়েরি। শিক্ষিকা বক্তৃতার ঢঙ্গে বলেন – ‘লেডিস অ্যান্ড জেনটাল ম্যান, সব সময় মনে রাখবে, বৈরুতের এই ফরাসি হাই স্কুল, ফরাসি মিশানের একটি সংশোধনাগারের মতো। তোমরা কখনো ভুলে যাবেনা, ফরাসিরা তোমাদের ভূখন্ড দিয়েছে, একটা দেশের সীমানা দিয়েছে এবং কীভাবে শান্তি স্থাপন করতে হয় তা শিখিয়েছে। আমরাই তোমাদের সভ্যতা গড়ে তুলে দিয়েছি, গড়ে দিয়েছি তোমাদের সংবিধান। মনে রাখবে, একমাত্র ফরাসি ভাষার শিক্ষাই তোমাদের জন্যে উপযুক্ত শিক্ষা, এই শিক্ষা ছাড়া তোমাদের প্রাচীন সংস্কার, কৃষ্টি, সংস্কৃতি থেকে বের হবার আর কোনো পথ নেই।’ ঔপনিবেশিক শক্তি অবৈধ ভাবে শুধু দেশ দখল করেনা, সেই দখল উচ্ছেদের পর, বাহ্যিক ভাবে চলে গেলেও রেখে যায় তাদের মতাদর্শ। এবং সেই মতাদর্শের ভিত্তিতে সেই দেশকে চলতে হয়, না হলে সংঘাত অনিবার্য। ছবিতে আমরা দেখি, শিক্ষিকার সংলাপ শেষ হয়না, ঠিক তারপরেই ঘটে এপ্রিলের (১৯৭৫) সেই বাস যাত্রীদের গণহত্যা। যে গণহত্যার সূত্রপাত হয়েছিলো, সেই বছরেরই ফেব্রুয়ারিতে, যখন জেলেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, মাছের ব্যবসাকে একচেটিয়া কারবারে পরিুত করার বিরুদ্ধে। গুপ্তহত্যায় নিহত হন প্রাক্তন মেয়র সিডন মারফ সাদ, জেলেদের পক্ষ নিয়ে দাঁড়াবার অপরাধে। বৈরুত শহর দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পশ্চিম এবং খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পূর্বের মধ্যে।।

(আগামী পর্বে সমাপ্য…)