Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩০)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩০)

সাংস্কৃতিক বিপ্লব :: একজন বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা

আনু মুহাম্মদ

Last-3শুরু থেকেই চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক ফয়েজ আহমেদ। তাঁর কাছ থেকে চীনের ইতিহাসের দুই পর্বের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। একটি ১৯৬৬ সাল যখন সেখানে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলছিলো এবং আবার ১৯৮৩ সাল যখন চীন সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিমুখে সংস্কার করে অগ্রসর হচ্ছে। ১৯৬৬ সালে তিনি পিকিংএ অবস্থান করছিলেন তৎকালীন দৈনিক আজাদএর প্রতিনিধি হিসেবে। এই সময় ভিয়েতনামে মার্কিনী আগ্রাসন চলছিলো। এই সময় অনেকবারই মার্কিন বিমান ও রণতরী চীনের আকাশ ও সমুদ্রসীমা লংঘন করে। তখন পর্যন্ত চীনকে ৪ শতাধিক সতর্কতামূলক প্রতিবাদ জানাতে হয়।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে বলা হচ্ছিলো ‘শুদ্ধি অভিযানের আন্দোলন’ যা পরিচালিত হচ্ছিলো চার পুরাতনের বিরুদ্ধে – ‘প্রাচীন চিন্তাধারা’, ‘প্রাচীন অভ্যাস’, ‘প্রাচীন দেশাচার’ ও ‘প্রাচীন সংস্কৃতি’। বিরাট আকৃতির ‘তাজেবাও’ বা পোস্টারে লেখা হয়েছে– ‘আমরা প্রাচীন পৃথিবীর সমালোচক, আমরা নতুন পৃথিবীর স্রষ্টা।’ রাস্তার নাম, ভবনের নাম পরিবর্তন হতে থাকে। ফয়েজ আহমেদ লিখছেন, ‘পিকিং এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল সম্ভ্রান্ত বিপণি কেন্দ্রের রাস্তার নাম ছিলো ওয়াং ফু চিং বা ‘রাজকুমারের কুয়োপথ’। লাল প্রহরীরা এই নাম পরিবর্তন করে ‘জনপথ’ করেছেন। শহরে প্রধান রাস্তা, যা পিকিংকে দুভাগ করে তিয়ান আন মেন স্কোয়ারের উপর দিয়ে গেছে, তার নাম ছিল ‘চ্যাংআন’ (চিরশান্তি)। নতুন নাম হয়েছে এর ‘তুং ফাং হোং’পূর্ব দিগন্তে লাল সুর্যোদয় (ইস্ট ইজ রেড)।’ এরকম সোভিয়েত দূতাবাসের সামনের সড়ক ‘সংশোধনবাদ বিরোধী পথ’, ভিয়েতনাম দূতাবাসের সামনের সড়ক ‘ভিয়েতনামকে সাহায্য কর স্ট্রীট’ ইত্যাদি। একসময় মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হাসপাতালের নাম দেয়া হয়েছে, ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হাসপাতাল’।

পোশাক, খাবার, ফ্যাশন ইত্যাদি নিয়েও কথা ও বিতর্ক হচ্ছিলো। বলা হয়েছে, ‘দেশের অধিকাংশ মানুষই যখন কাপড়, ক্যানভাস, তুলোর ও প্লাস্টিকের জুতো পরে, তখন মুষ্টিমেয় ব্যক্তির চামড়ার দামি জুতো পরার চেষ্টা বাঞ্ছনীয় নয় (এদেশে এখন কাউকে খালি পায়ে দেখা যায় না)।’ ছেলে ও মেয়েদের চুলের ফ্যাশন নিয়ে আপত্তি দেখা দেয়ায় কিছুদিনের জন্য মেয়েদের লম্বা বেণী বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো। ফয়েজ আহমেদ লিখেছেন, দুমাসের মাথায় ‘নভেম্বরে পিকিং শহরে অনেক মেয়ের মাথায় লম্বা বেণী দেখা গেছে। তাছাড়া পরবর্তীকালে সিংকিয়াং থেকে রাজধানীতে আগত মেয়ে লাল প্রহরীদের অধিকাংশেরই দীর্ঘ কেশ ছিল। সম্ভবত কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ কেশের বিরুদ্ধে অভিযানকে লাল প্রহরীদের “অতিরিক্ত তৎপরতার” মধ্যে গণ্য করেছেন।’

চীনের গ্রাম ও শহর সর্বত্র তখন তরুণ রেড গার্ড বা লাল প্রহরীদের তৎপরতা। সব অঞ্চলের চেহারাই পাল্টে গেছে তখন তাদের সক্রিয়তায়। ফয়েজ দেখছেন, ‘এখন পিকিং শহরের সর্বত্র চেয়ারম্যান মাও সে তুং এর চিত্র আর তাঁর পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি দেখা যাচ্ছে। সমগ্র শহরটা তাঁর চিত্র ও বাণীতে ছেয়ে গেছে। এমন একটি প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য স্থান নেই, যেখানে চেয়ারম্যান মাওএর ছবি ও উদ্ধৃতি টাঙ্গানো হয়নি। লাল প্রহরী আন্দোলনের প্রবাহে এই চিত্র ও বাণী টাঙ্গানোর জোয়ার এসেছে। তবে এই আন্দোলনের পূর্বেও তাঁর চিত্র ও বাণী দেখা যেতএমন ব্যাপক ছিল না। কেউ কেউ অনুমান করেন যে, এ শহরে প্রায় এক মিলিয়ন সাইকেল রয়েছে এখন প্রত্যেক সাইকেলচালক তার সাইকেলের হাতলের মধ্যভাগে চেয়ারম্যান মাওএর বাণী লিখিত এক টুকরো বোর্ড টাঙ্গিয়েছেন। বাস ও ট্রলিবাসে তাঁর ছবি ও বাণী রয়েছে। আর এ সমস্ত যানের সামনে বিপ্লবের চিহ্ন লাল পতাকা উড়ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা, কমিউন, শহর সর্বত্রই মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। শত্রু চিহ্নিত করতে গিয়ে ভুলও হচ্ছে অনেকরকম। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি আহমেদ লেখেন, ‘গত সপ্তাহে শহরের জনবহুল এলাকার দেয়ালে পলাতক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিদের ফটোসহ পোস্টার দেখা গেছে। লাল প্রহরীগণ এদের সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। পলাতকদের ধরার জন্য লাল প্রহরীদল অনেক সময় শহর থেকে নির্গমনের পথে গাড়ি তল্লাসি করছেন।কয়েকদিন যাবৎ দেশরক্ষা মন্ত্রী লিন পিয়াওএর রচনা ও বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃতিযুক্ত পোস্টার দেখা যাচ্ছে। তাঁর ‘জনযুদ্ধ জিন্দাবাদ’ পুস্তিকার বিশেষ ও ব্যাপক প্রচার করা হচ্ছে।’

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লিন পিয়াওএর গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। তিনি গুরুত্বের দিক থেকে মাও এর পরই গণ্য হতে থাকেন। মনে হচ্ছিলো তিনিই মাও এর সবচাইতে বেশি আস্থাভাজন। ১৯৬৬ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিভিন্ন সমাবেশে নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি, বক্তৃতা এবং অবস্থান থেকে এই বিষয়টিই স্পষ্ট হচ্ছিলো। এই বছরের ১ অক্টোবর চীনের জাতীয় দিবসে যথারীতি তিয়ান আন মেন স্কোয়ারে ১৫ লক্ষ মানুষের বিশাল সমাবেশ হয়। সমাবেশে ‘দেশরক্ষা মন্ত্রী লিন পিয়াও পার্টি ও সরকারের পক্ষ থেকে র‌্যালিতে বক্তৃতা করেন। প্রেসিডেন্ট লিউ শাও চী, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ও মার্শাল চু তে মঞ্চের ওপর চেয়ারম্যান মাও এর সাথে থাকলেও বক্তৃতা করেননি। রেডিওতে প্রেসিডেন্ট লিউ শাও চীর নাম এবার লিন ও চৌএর পরই প্রচার করা হয়েছে। গত কিছুদিন তাঁর নাম সপ্তম নম্বরে দেখা গিয়েছিলো।’। এর কয়েক বছরের মাথায় লিন পিয়াও এর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্তের অভিযোগ ওঠে।।

তথ্যসূত্র

১। ১৯৬৬ সালে ফয়েজ আহমেদএর পাঠানো প্রতিবদেনগুলো পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়: পিকিং থেকে লিখছি, চয়নিকা প্রকাশনী, ঢাকা। মার্চ, ১৯৬৭।

(চলবে…)