Home » অর্থনীতি » তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (সপ্তদশ পর্ব)

তেলের অর্থ এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (সপ্তদশ পর্ব)

অস্ত্র ব্যবসায় ব্রিটেনের দুর্নীতি

Last-5অস্ত্র ব্যবসার সাথে তেল সম্পদের অর্থের একটি গভীর সখ্যতা রয়েছে। একটি অপরটিকে টিকিয়ে রাখে। আর পরস্পরের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসার কুশীলবরা। এই ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছে ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিসহ নানা ভয়ঙ্কর সব ঘটনাবলী। এরই একটি খণ্ডচিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। প্রভাবশালী দ্য গার্ডিয়ানএর প্রখ্যাত দুই সাংবাদিকম ডেভিড লে এবং রাব ইভানসএর প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এ নিয়ে বিস্তর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ সংখ্যায় ওই প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদের (সপ্তদশ পর্ব) প্রকাশিত হলো। অনুবাদ : জগলুল ফারুক

বিএই’র যেসব শেয়ারের দর পড়ে গিয়েছিল ইতোমধ্যে সেগুলোতে আবার তেজীভাব লক্ষ্য করা গেল। অনেকেই মনে করেন, গোল্ডস্মিথ তার দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি যা করেছেন সেটি অত্যন্ত খারাপ একটি কাজ। দুর্নীতি বিরোধী যুক্তরাজ্যের একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি তিনি কার্যকরভাবেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। হোয়াইট হলের গোলমেলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি ঘোষণা করে দেন, বিদেশী কোনো ঘুষ গ্রহণকারী যতোক্ষণ পর্যন্ত না স্বীকার করবেন যে, তিনি তার পক্ষ হয়ে ঘুষের অর্থ গ্রহণ করার জন্য নিজের অধীনস্থ কাউকে দায়িত্ব দেননি, ততোক্ষণ পর্যন্ত ২০০২ আইনের আওতায় ঘুষ প্রদানের দায়ে কারো বিরুদ্ধে কোনো রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাস্তবে এই অর্থ দাড়াল এই যে, এসএফও বিশ্বের আরও চারটি দেশে বিএই’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে তদন্ত কাজ চালাচ্ছিল সেগুলো বাতিল না হয়ে আর উপায় নেই। আর শেষ পর্যন্ত এসএফও বিদেশের মাটিতে যদি বিএই’র দুর্নীতির কোনো ঘটনা শনাক্ত করেও তবু এটা বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই যে, সে দেশের শাসকরা ভিন্ন দেশের একটি আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে নিজেদের জন্য বিব্রতকর একটা অবস্থা তৈরি করবেন।

আর শাসক যদি নিজেই ঘুষের অর্থ গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে অবস্থাটা কেমন দাড়াবে, যেমনটা করেছিলেন গত শতকের সত্তরের দশকে ইরানের শাহ এবং সৌদি বাদশাহর ভাই? ব্রিটেন আইনগত ত্রুটি সংক্রান্ত এই অভিযোগগুলো মীমাংসার ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও সে দুর্নীতি সংক্রান্ত আইনগুলোর আধুনিকায়নের ব্যাপারে ওইসিডি’র কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনাকারীগণ রণে ভঙ্গ দিয়ে অবসাদ আর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন। দুর্নীতির মামলাগুলো নিয়ন্ত্রণকারী এসএফও কর্মকর্তা ম্যাথু কোয়িং নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অফিসে যান এবং কিভাবে আরও ব্যবসা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করেন। সুতরাং বিএই’র ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কারো কারো কাছে ব্রিটেনের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকল।

তবে একথাও ঠিক, এই কেলেঙ্কারির ঘটনাটি দেশের সর্ববৃহৎ অস্ত্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটির এবং নিজেকে অতি মাত্রায় নীতিনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করা একজন প্রধানমন্ত্রীর সুনাম চিরতরে বিনষ্ট করে দিয়েছিল।

ওইসিডি প্যারিসে বিষয়টির বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব এক নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করে যার ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিও সম্পাদিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। লন্ডনে দুর্নীতি বিরোধী অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে প্রতিবাদ জানিয়ে যান। আর বিশ্বজুড়ে ব্রিটেন একটি ভন্ডজাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

জাল বিস্তৃত হতে থাকল : ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিসের (এসএফও) পরিচালক ছিলেন রবার্ট ওয়ারডল। গার্ডিয়ান পত্রিকা ২০০৩ সালে বিএই’র বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের খবরটি ফাস করে দেয়ার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কৌসুলিগণ তদন্ত কাজ শুরু করে দেন। ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিসও শুরুতেই বিষয়টি হাতে নেয়। অফিসের সহকারী পরিচালক হেলেন গার্লিক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বিরোধী পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট রবার্ট এলেনের যৌথ নেতৃত্বে একটি তদন্ত দলও গঠন করা হয়। কিন্তু বিএই’র সৌদি মামলার ব্যাপারে চলতে থাকা তাদের তদন্ত কার্যক্রমটি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সৌদি শাসক পরিবার থেকে আসার হুমকি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। টনি ব্লেয়ার দাবি করলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ হুমকির মুখে। তবে তদন্ত দলটি বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিএই’র সন্দেহজনক দুর্নীতির ঘটনাগুলোর পিছু লেগে থাকল। ব্রিটিশরা দুর্নীতির ঘটনাগুলো অধিক হারে উদঘাটন করতে শুরু করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষও তাদের সাথে যোগ দেয়।।

(চলবে…)