Home » অর্থনীতি » তেলের দাম যে দেশে বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ

তেলের দাম যে দেশে বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 4জ্বালানি তেল বিক্রি করে অস্বাভাবিক মুনাফা করছে সরকার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। কিন্তু সরকার দেশের মধ্যে সেই তেল বিক্রি করছে আগের বেশী দরেই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দামের দেশ। অথচ জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে সবাইকে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি। এর ফলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে উৎপাদন খাত পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে ভোক্তা ও উদ্যোক্তাদের। কিন্তু এর প্রায় দুই বছর পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের মধ্যে আর কমানো হয়নি।

সর্বশেষ বাজেটপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অল্প হলেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দাম সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ নেই। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমায় সাশ্রয় করা অর্থ অগ্রাধিকার খাতে সঞ্চালন করা হবে। এ নিয়েও কোনো পদক্ষেপ নেই।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় গত অর্থবছর থেকেই মুনাফা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০১৪১৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মুনাফা হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের বাকি সময়ে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করতে চায় বিপিসি। সব মিলিয়ে দুই বছরে তাদের মুনাফার লক্ষ্য ১২ হাজার কোটি টাকা।

চলতি বছরের শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড পতন হয়। অর্ধেকে নেমে আসে জ্বালানির দাম। দেশের বাজারে দাম সমন্বয় না হওয়ায় জানুয়ারি থেকে মুনাফায় ফেরে বিপিসি। যদিও বাংলাদেশেও বিভিন্ন মহল থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি ওঠে। বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমান ধারায় থাকলে তাদের মুনাফা অব্যাহত থাকবে। সরকার যদি আগামী জুন পর্যন্ত তেলের দাম না কমায়, তাহলে বিপিসির মুনাফা ৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে। গত অর্থবছর তাদের মুনাফা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, জ্বালানি তেলের দাম কমালেও তাতে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে না। কৃষক কিছুটা লাভবান হলেও কমবে না পরিবহন ভাড়া। তাছাড়া দাম কমালে প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি তেল পাচারেরও ঝুঁকি থাকবে। এ কারণে সরকার এ বিষয়ে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে। তাছাড়া ২০১০১১ অর্থবছর থেকে চার অর্থবছরে সরকার জ্বালানি তেলে ভর্তুকি বাবদ বিপিসিকে ৩৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা দিয়েছে। এ ঘাটতি মেটানোর জন্যও সরকার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করছে।

বিপিসি জানায়, গত ডিসেম্বরে লোকসান থেকে বেরিয়ে আয়ব্যয়ে ভারসাম্য আনে প্রতিষ্ঠানটি। আর জানুয়ারি থেকে মুনাফার ধারায় ফেরে। এখন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমান ধারায় স্থিতিশীল থাকলে বিপিসির আগের ঘাটতি কমিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে হাত দিতে পারবে। ১৯৯৯ সালের পর প্রথমবারের মতো জানুয়ারিতে মুনাফার ধারায় ফেরে বিপিসি। যদিও পেট্রোল, অকটেন ও জেট ফুয়েলে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে মুনাফা করছে তারা। তবে চলতি বছর থেকে ডিজেলেও মুনাফা করছে বিপিসি। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে পেট্রোল ও অকটেনে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করেছে বিপিসি। এছাড়া ফার্নেস অয়েলে মুনাফা হচ্ছে ৪৮, জেট ফুয়েলে ৩৪, ডিজেলে ২৭ ও কেরোসিনে ২৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের শেষ দিকে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সূত্রমতে, বিপিসি মুনাফা করলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। গত এক বছরে ১ টাকাও পায়নি অর্থ বিভাগ। বিপিসিকে ঋণ হিসাবে দেয়া বিশাল অঙ্কের অর্থ ফেরত চাইলেও প্রতিষ্ঠানটি তা দিচ্ছে না। তাদের দাবি, সরকার যেটাকে ঋণ বলছে, সেটা আসলে ভর্তুকি। এটা বিপিসির প্রাপ্য ছিল। তাই সরকারকে এটা ফেরত দিতে বাধ্য নয় তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, বিপিসি মুনাফা করলে অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। বিপিসি কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয় যে, তারা নিজেদের হিসাবে তা জমা রাখবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তহবিলে ব্যয়ের পর যে উদ্বৃত্ত থাকে, তা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। বিপিসির ক্ষেত্রেও এটি করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ বিপিসি তার নিজস্ব হিসাবে রাখতে পারবে না।

বিপিসি কত লাভ করছে, কীভাবে করছে, তার হিসাব কেউ জানে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে তাদের জবাবদিহিতার কথা থাকলেও তারা তা করছে না। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করে। কিন্তু সে হিসাবে এখানে কোনো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নেই। সরকার এ বিষয়ে নজর দিলে রাষ্ট্রের আর্থিক সাশ্রয় হবে। বিপিসি যখন লোকসানে ছিল, তখন জনগণের অর্থে তাদের ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমায় বিপিসি এখন মুনাফা করছে। এর অংশীদার জনগণ। জ্বালানি উন্নয়ন তহবিল করে মুনাফার অর্থ সেখানে জমা রাখলে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে তা ব্যয় করা যাবে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রকারভেদে ৪৫৪৮ ডলারে ওঠানামা করছে। লন্ডনের ইন্টার কন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জে (আইসিই) নভেম্বরে সরবরাহ চুক্তিতে ব্রেন্ট অয়েলের দাম কমে দশমিক ৯ শতাংশ।

তৃতীয় সর্বোচ্চ দামের দেশ

বেশির ভাগ দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেছে। আর ভোক্তা পর্যায়ে এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দামের দেশ কঙ্গো। এরপরেই রয়েছে সেনেগাল। বাংলাদেশ আছে তৃতীয় অবস্থানে। বিপণন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কারমুডি’র এক সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

১৮টি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশের ওপর পরিচালিত ‘ফুয়েল প্রাইস অ্যান্ড জেনারেল অ্যাফোর্ডেবিলিটি’ শীর্ষক ওই সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দৈনিক মাথাপিছু গড় আয়ের (২২ দশমিক ৭৪ মার্কিন ডলার) ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় করতে হয় এক লিটার পেট্রোল কিনতে। ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যের দিক দিয়ে শ্রীলঙ্কা নবম ও পাকিস্তান ত্রয়োদশ স্থানে রয়েছে।

মুনাফায় সরকার

বিশ্বব্যাংক গত ফেব্রুয়ারি মাসের আন্তর্জাতিক বাজার দর ধরে বিপিসির মুনাফার একটি হিসাব তৈরি করেছে। সে সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের বেশি। ওই সময়ে প্রতি লিটার অকটেন ও পেট্রলের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৫৬ টাকা ৮৫ পয়সা। গ্রাহকের কাছে তা বিক্রি করা হয়েছে যথাক্রমে ৯৯ ও ৯৬ টাকা। বিপণন কোম্পানি ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাদ দিয়ে বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ৩৫ টাকা ৪৯ পয়সা। একইভাবে প্রতি লিটার কেরোসিনে বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ১৩ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিজেলে ১৪ টাকা ৬৮ পয়সা, ফার্নেস অয়েলে ১৯ টাকা ৫৭ পয়সা এবং প্রতি লিটার জেট ফুয়েলে (বিমানের জ্বালানি) বিপিসির মুনাফা হচ্ছে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা।

আবার একই সঙ্গে সরকারও এ থেকে কর হিসেবে আদায় করছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। যেমন, অকটেন ও পেট্রলে সরকার প্রতি লিটারে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসাবে আদায় করছে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা এবং বাকি ডিজেল থেকে শুরু করে বাকি পণ্যে প্রতি লিটারে কর নিচ্ছে ৮ টাকা ৩২ পয়সা।

এত মুনাফার পাশাপাশি সরকারের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে ভর্তুকি বাজেট থেকে। গত ২০১৪১৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেলে সরকারের ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অথচ সর্বশেষ হিসাবে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় সবদিক থেকেই সরকারের লাভ ও সুবিধা বেড়েছে। অথচ ভোক্তার সাশ্রয় হয়নি এক টাকাও।

জেট ফুয়েলের দাম বেশি হওয়ায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিদেশি অনেক বিমান সংস্থা এখন বাংলাদেশ থেকে তেল নিতে আগ্রহী নয় বলে জানা যাচ্ছে। এখান থেকে তেল নিলেও যতটা সম্ভব কম নেয়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান দাবি করেন, তাঁরা আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে ঢাকায় জেট ফুয়েলের দাম প্রতি লিটারে ২ থেকে ১২ টাকা (তিন থেকে আট মার্কিন সেন্ট) পর্যন্ত বেশি।

দেশে জ্বালানি তেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে, ৪৫ শতাংশ। এরপরেই বিদ্যুৎ খাতে ২৫ শতাংশ, কৃষি খাতে ১৯ শতাংশ, শিল্প খাতে ৪ শতাংশ এবং গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতে ৭ শতাংশ। সুতরাং জ্বালানি তেলের দাম কমলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে। এর মধ্যেই সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে, যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে জীবনযাত্রার ওপর।।