Home » আন্তর্জাতিক » দিল্লির চাপ মোকাবেলায় নেপালের নতুন সরকার কতোটা সক্ষম

দিল্লির চাপ মোকাবেলায় নেপালের নতুন সরকার কতোটা সক্ষম

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last-1নেপালে ভারতের অবরোধ এবং এর ফলে সৃষ্ট সাধারণ মানুষের ভারত বিরোধী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য কিছু দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। মধ্যপন্থার কমিউনিস্ট নেতা কে পি ওলির নেতৃত্বে এই নতুন সরকারের ব্যাপারে ভারত এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছে না। ভারত নতুন এই সরকারকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। নেপালের নতুন সংবিধান যা নিয়ে ভারতের আপত্তি উত্থাপন এবং এই আপত্তি উপেক্ষিত হওয়ার পরে অবরোধ আরোপ করা হয়। নতুন এই সরকারে যারা আছেন তারা ভারতের মনোভাবে বেশ ক্ষুব্ধ মনোভাব দেখিয়েছিলেন। এ কথাটি সবার জানা যে, নেপালী কংগ্রেস ভারতের অতি পছন্দের আজ্ঞাবাহী দল। এই অবরোধের সময়ে নেপালী কংগ্রেসের সভাপতি এবং সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালাও অবরোধের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। সুশীল কৈরালা একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থার সাথে দেয়া সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন, যে ঘটনা ঘটেছে তাতে ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এসব প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভারত পছন্দ নেপালী কংগ্রেসের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। ভারত নিশ্চয়ই খুশি হতো নেপালী কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তেমন নয়। এদিকে, নেপালের প্রভাবশালী বিশ্লেষক এবং হিমাল সাউথ এশিয়া পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কনক মোনি দিক্ষিত বলেছেন, নেপালের সংবিধানের উপরে ভারত যেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে তাতে নেপালী জনগণ আশাহত হয়েছেন। তবে ভারত মনে করে নতুন সরকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীয় এবং থারু সম্প্রদায়ের সাথে সমস্যাগুলো মিটিয়ে ফেলবে। এছাড়া ভারতের মনোজগতে নেপালে চীনের প্রভাব বেড়ে গেছে কিনা সে চিন্তাটিও ক্রিয়াশীল রয়েছে।

তবে নেপালী জনগণ দেখতে চাইছেন নতুন এই সরকারটি কতোটা সক্ষমতার সাথে ভারতীয় আধিপত্যমূলক কর্মকামোকাবেলা করতে পারবে। এটাও ঠিক একটি ভূবেষ্টিত দেশ হিসেবে নেপালের পক্ষে সহজে কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে ভারতের ধারণা যে ভুল প্রমাণিত হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

নিত্যপণ্য আর পেট্রোলিয়াম সরবরাহ বন্ধ করে দিলে নেপাল আর কী করবে? এক দিনের মধ্যে বিনা শর্তে আত্মসমপর্ণ ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে কি? নেপালে অঘোষিত অবরোধ আরোপের সময় সম্ভত এটাই ছিল নয়া দিল্লির ভাবনা। কিন্তু তা হয়নি। আর এ কারণেই অবরোধপরবর্তী নেপালে ‘ভারতবিরোধী বিক্ষোভ’ এবং ‘ভারত বিরোধী আবেগও মনোভাব যে তুঙ্গে উঠে তা দেখে নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রনজিত রাই পর্যন্ত প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

নেপাল যে নতুন সংবিধান তৈরি করেছে, তা অত্যন্ত প্রগতিশীল, অনেক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র পর্যন্ত সেদিকে যেতে পারেনি। ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীশিশুসহ সবাইকে সমান অধিকার প্রদান করার মতো অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সবাই খুশি হলেও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশী আর থারু সম্প্রদায় খুশি হয়নি। আর তার জের ধরে ভারতও নারাজ হয়েছে। পরিণতিতে সাথে সাথে অবরোধ।

তবে এই অবরোধই নেপালকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আরেক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে। অবশ্য তাই বলে এই নয় যে, নেপাল ভারতবিরোধী হয়ে ওঠবে। তারা বরং বর্তমান সঙ্কট নিরসনের একটা পথও বের করে ফেলবে। নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী ‘মদেশী বিরোধী’ হিসেবে পরিচিত হলেও সমঝোতার দিকে এগুবেন বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছে। উপমহাদেশের রাজনীতিকে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে নেবে নেপাল।

আর ভারতও সম্ভবত একটা সুরাহা চাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিহার রাজ্যের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ওলির ভারত সফরের মাধ্যমে নেপালে নিত্যপণ্যের সরবরাহ করার বাধা দূর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এটা নির্ভর করছে ওলি মদেশী ইস্যুটি বিবেচনা করেন।’

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওলির নির্বাচিত হওয়ার আগেই তার সাথে মদেশী জনাধিকার ফোরামলোকতান্ত্রিকএর চেয়ারম্যান বিজয় কুমার গাচ্চাদারের মধ্যে রাজ্যের সীমানা এবং মদেশী ও থারু সম্প্রদায়ের সমস্যাবলী নিয়ে আট দফা সমঝোতা হয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা এই মন্তব্য করেছেন।

নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে টেলিফোন করেছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোদি তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। ভারতের নেপাল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এস ডি মুনি অবশ্য বলেছেন, ভারতের নতুন সংবিধানকে ভারত স্বীকৃতি দেওয়ার পরই কেবল নেপালভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গতিশীল হতে পারে। মুনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না ওলির সাথে দিল্লির কোনো সমসা আছে। কারণ তিনি এর আগে গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি মনে করি না, তিনি ভারতবিরোধী নেতা।’ তিনি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, তার নেতৃত্বে মদেশী সমস্যার সমাধান হবে।

আবার চীনের সাথে নেপালের যোগাযোগও রয়েছে। ভারতে নিযুক্ত নেপালি রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়ের সাথে ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি ইউ চেঙের বৈঠক নিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তিনবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে শুক্রবার চীনা দূতাবাসে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে উপাধ্যায় সাক্ষাত করতে সক্ষম হন। তিনি বৈঠকটি সম্পর্কে ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আমি এখানে নেপালি রাষ্ট্রদূত হওয়ার পর সফররত কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং অন্য রাষ্ট্রদূতদের সাথে সাক্ষাত করার নিয়ম রক্ষার বৈঠক।’

৬৩ বছর বয়স্ক ওলি কট্টর ভাবাপন্ন লোক হিসেবেই পরিচিত। তবে এর মধ্যেই তিনি বলেছেন, তিনি জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখবেন। তিনি নেপালি জনগণকে আশ্বাস দিয়েছেন, দুই সমৃদ্ধ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সাথে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশ ঘটাবেন। সিনহুয়ার সাথে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি নেপালের দীর্ঘ দিনের এক চীন নীতি বজায় রাখবেন, চীনের মূল স্বার্থের পরিপন্থী বৈদেশিক শক্তির কোনো কাজ তার দেশের ভূখণ্ডে হতে দেবেন না।

পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ : নতুন প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ শর্মা ওলির সামনে রয়েছে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওলিকে দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে হবে। রোববার সিনহুয়াকে রাজনৈতিক ভাষ্যকার সমত গিমির একথা বলেন। প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসন করে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। দ্বিতীয়টি হলো, আলোচনার মাধ্যমে বিক্ষুব্ধ মদেশীদের সাথে সমস্যার নিরসন করা। তৃতীয়টি হলো, নতুন সংবিধান পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। নেপালিরা খুব তাড়াতাড়ি এই সংবিধানের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। ওলির সামনে চতুর্থ চ্যালেঞ্জটি হলো রাজনৈতিক বিভেদ দূর করে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা। এক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো নেপালি কংগ্রেস। তারা এককভাবে বৃহত্তম দল হলেও এখন বিরোধী দলে রয়েছে। ফলে ওলির সামনে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া তিনি ক্ষমতায় এসেছেন বিভিন্ন গ্রুপের সমর্থন নিয়ে। এসব গ্রুপকে একত্রিত রাখাও কঠিন কাজ। গিমিরের মতে, ইউসিপিএন (মাওবাদী) হলো বামপন্থী দল, আবার রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি নেপাল হলো ডানপন্থী শক্তি। এছাড়া আরো কিছু ছোট ছোট দল রয়েছে। তারা নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন কাজ। পঞ্চম চ্যালেঞ্জটি হলো ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ লোককে পুনর্বাসন করা।

নেপালে কোন পরিস্থিতির সৃষ্ঠি করা হয়েছিল? নেপালের এখনও মনে হচ্ছে, তার শ্বাস চেপে ধরা হয়েছে। গ্যাসোলিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। কেবল পেট্রোলিয়াম সামগ্রী নয় ডায়ালাইসিস, আইসিইউ রোগীদের জন্য অপরিহার্য অক্সিজেন, রাসায়নিক এবং হাসপাতালের জরুরি সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ। বিমানের জ্বালানি পর্যন্ত নেই। কোনো কোনো বিমান সংস্থা নয়া দিল্লি থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তাতেও ভারতের কড়াকড়ি। নেপালগামী বিমানের দিল্লি ত্যাগের আগে অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর প্রায়ই দেখা যায়, অনুমতি পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এটা আসলে নেপালে বিমান চলাচল নিরুৎসাহিত করার প্রয়াস। এর সবই হচ্ছে দেশটির প্রায় সব নিত্যপণ্যের একমাত্র সরবরাহকারী প্রতিবেশী ভারতের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কারণে। অনেক নেপালিই বিশ্বাস করে, তাদের সরকার ২০ সেপ্টেম্বর নতুন সংবিধান গ্রহণ করার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে ভারত প্রতিশোধ নিচ্ছে। নয়া দিল্লির দৃষ্টিতে নতুন সংবিধানে নেপালের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়েছে।

মদেশীরা কয়েক মাস ধরেই সহিংস বিক্ষোভ করছিল। নেপালি আইন প্রণেতারা যখন কয়েক নতুন সংবিধান তৈরি করছিলেন, তখনও তা চলছিল। এতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়। তবে আইন প্রণেতাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধান পাস হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সহিংসতা বেড়ে যায়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানী কাঠমান্ডুগামী ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো নেপাল সীমান্তে থমকে যায়। এই বুধবার শ’ খানেক ট্রাক প্রবেশ করলেও এক হাজারের বেশি যান এখনো ওষুধ, গ্যাসোলিন, রান্নার জ্বালানি, পচনশীল পণ্য নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় করছে সবুজ সঙ্কেতের।

ভারত ও নেপাল উভয় সরকারই বলেছে, তারা মতপার্থক্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে, শিগগিরই আবার সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু কোনো পক্ষই বলতে পারেনি, কখন থেকে তা হবে। অনেকেই মনে করছে, কাঠমান্ডুকে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের দাবি মানতে বাধ্য করার লক্ষ্যে তাদেরকে সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে। ‘ভারত কেন আমাদের ওপর অবরোধ আরোপ করল?’ ভারত বলছে, নেপালে চলমান সহিংস বিক্ষোভের মুখে পড়ে যাওয়ার ভয়ে ট্রাকচালকরা নেপালে ঢুকতে চাচ্ছে না। নেপাল সরকার বলছে, ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারাই ট্রাকগুলোকে সীমান্ত পার হতে দিচ্ছে না।

ক্ষুদ্র, ভূবেষ্টিত হিমালয়দূহিতা নেপাল তার তেল এবং বেশির ভাগ পণ্যের জন্য দক্ষিণের বৃহৎ প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ দুটি পরস্পরের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাদের মধ্যকার সীমান্ত খোলাই থাকে। ৩০ লাখের বেশি নেপালি উত্তর ভারতে যাতায়াত করে চাকরি সূত্রে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেপাল মনে করছে, ভারত তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। আর নিজের প্রভাব বলয়ের দেশ বিবেচিত নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে ভারত। চলতি বছরের প্রথম দিকে নেপালের বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর এশিয়ার এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশী তাদের এ যাবৎকালের বৃহত্তম সাহায্য বহর নিয়ে দেশটিতে হাজির হয়েছিল। গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নরেন্দ্র মোদি ঢাকঢোল পিটিয়ে কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন, যা ছিল ১৭ বছরের মধ্যে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নেপাল সফর। এর দুই বছর আগে চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও গিয়েছিলেন দেশটিতে। কিন্তু নেপালভারত সম্পর্কে যে উষ্ণতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা শীতল হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ভারতের নির্মম কূটনীতিতে অতীষ্ঠ হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা করতে থাকে নেপাল।

এখন ভারতের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে চীনের রুটগুলো দ্রুতগতিতে খুলছে। অবস্থা ভিন্ন দিকে যাচ্ছে দেখে ভারতও অবরোধ শিথিল করে নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। কেবল এই রুটগুলো খোলাই নয়, আরো নানাভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মাওবাদী প্রধান প্রচন্ড চীন সফরে। নতুন সংবিধান অনুমোদনের এক দিন পর নয়া দিল্লি যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তাতে নেপাল পুরোপুরি হতবাক হয়ে পড়ে। তারা মনে করছে, এটা নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবেই বলেছে, নয়া দিল্লি ‘বারবার জোরালোভাবে বলে আসছিল যে, নেপালের সব অংশকে তাদের সামনে থাকা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবশ্যই একমতে পৌঁছাতে হবে।’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরন সোমবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত কলামে প্রকাশিত এক লেখায় অভিযোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেন এই বলে যে, ‘নেপালের পুরনো উচ্চ বর্ণ এবং পাহাড়ি অভিজাতদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে একটি ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান চাপিয়ে দিতে এটাকে একটা সুযোগ মনে করেছিল।’ ভারত এই দুশ্চিন্তায় ভুগছে যে, নেপাল সীমান্তের সহিংসতা উত্তর প্রদেশ ও বিহারে বসবাসকারী লাখ লাখ মদেশীর মাধ্যমে উত্তর ভারতেও ছড়িয়ে পড়বে।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত মদেশীরা সংবিধানে নেপালকে সাতটি অংশে বিভক্ত করা এবং তাদের পূর্বপুরুষদের কোনো কোনো অংশ দক্ষিণাংশের সাথে জুড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। মদেশী এবং আরো কয়েকটি ছোট ছোট গোষ্ঠী রাজ্যগুলোকে আরো বড় এবং স্থানীয় ব্যাপারে আরো বেশি স্বায়াত্তশাসন চায়।

ভারতের খোলাখুলিভাবে অসন্তুষ্ট প্রকাশে নেপালিরা ক্ষুব্ধ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভারতবিরোধী মন্তব্যের বন্যা বয়ে গেছে। টুইটারে কয়েক দিন ধরে #BackoffIndia হ্যাশট্যাগের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। এমনকি নেপালে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো পর্যন্ত বন্ধ করা হয়েছিল, সিনেমা হলগুলোতে জনপ্রিয় ভারতীয় মুভি দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলএই বলে যে, সেগুলো চালানোর মতো জ্বালানি তাদের হাতে নেই।

নেপালি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লক্ষী প্রাসাদ ধাকল উল্লেখ করেছেন, চলমান বিক্ষোভের কারণে নয়, বরং সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার পরপরই পণ্যবোঝাই ট্রাকের প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। এই অবরোধের ভয়াবহ প্রকৃতি শুরুতে টের পাওয়া যায়নি। বলা হচ্ছিল, নেপালে সংবিধানবিরোধী বিক্ষোভের কারণে জ্বালানি এবং অন্যান্য নিত্যপণ্য যেতে পারছে না। এ ধরনের আকস্মিক অবরোধের জন্য প্রস্তুত ছিল না নেপাল। গত এপ্রিলে এক বিপর্যয়কর ভূমিকম্পে ৮,০০০ মানুষ নিহত হওয়ার সময় নেপালচীন যোগাযোগ রুটগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে অবরোধের মুখে অপেক্ষা করা ছাড়া নেপালের সামনে বিকল্প ছিল সামান্যই।

বর্তমান অবস্থা নেপালিদের কাছে ১৯৮৯ সালের অবরোধের তিক্ত স্মৃতি নতুন করে দেখা দিয়েছে। চীনা অস্ত্র সংগ্রহের শাস্তি দিতে ওই সময় ১৫ মাস অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল ভারত।

কাঠমান্ডুর শীর্ষ স্থানীয় পত্রিকা অন্নপূর্ণা পোস্টের সম্পাদক যুবরাজ ঘিমির বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা যাতে সীমান্ত এলাকায় বসতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা কি উভয় দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নয়? ভারতের অনুমোদনক্রমেই সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিক্ষোভ হচ্ছে। এটা কৌশলে আরোপ করা অবরোধ।’ আর ভারতে অনেকে বলছেন, নয়া দিল্লি মাত্র কয়েক দশক আগে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্রে ফেরা তার প্রতিবেশীর ওপর অনেক বেশি পেশী শক্তি প্রদর্শন করেছে।

এনডিটিভির ওয়েবসাইটে এক লেখায় বিরোধী দলের আইন প্রণেতা মনি শঙ্কর আয়ার বলেছিলেন, ‘আমাদের ক্ষমতাসীনরা যে নৃশংস আচরণ করেছেন, সেজন্য আমাদের উচিত হবে নেপালিদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য তাদের শুভ কামনা করা।’