Home » রাজনীতি » দেশী-বিদেশী খুন :: মানুষ চায় আতংকের সমাপ্তি

দেশী-বিদেশী খুন :: মানুষ চায় আতংকের সমাপ্তি

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 2স্বল্পদিনের ব্যবধানে অনেকগুলো খুনের ঘটনা ঘটে গেল। এর মধ্যে নিরীহ দেশী নাগরিকও আছেন। বিদেশী নাগরিকরাও আছেন। তারাও নিরীহ। না, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ব্যাপারের সাথে জড়িত নেই। ছিনতাই, ডাকাতি, অজ্ঞান পার্টির কাজ ইত্যাদি যে কমেছে তাও নয়। ঢাকা এখন বড় অনিরাপদ শহরে পরিণত হয়েছে। তার মূল কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দারুন অবনতি ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাসক দলের রাজনৈতিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে এবং তাদের অসৎ অংশ আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করছে। কেউ কেউ ভাড়াটিয়া খুনিতে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এই গোপন তথ্যটিও বেরিয়ে এসেছিল। সব মিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পেশাদারী যোগ্যতা হারিয়েছে কিনা সে প্রশ্নটি দেখা দিয়েছে। তাই ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় যেখানে কড়া নিরাপত্তা থাকার কথা, সেখানেই জনৈক ইতালীয় নাগরিক সিজারে তাভেলা বড় রাস্তায় খুন হলেন এবং খুনিরা খুব সহজেই পালিয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ধাওয়া করে ধরতে পারেনি। এখনো পারেনি খুনিদের চিহিৃত করতে বা খুজে বের করতে। পুলিশের পেশাদারী দক্ষতা এতেই বোঝা যায়। পুলিশ প্রধান যেখানে ক্রমাগত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান, সেখানে পুলিশ প্রশাসনের দশা তো এই হবেই।

এর চারদিনের মাথায় আবার খুন হলেন আরেকজন বিদেশী নাগরিক। তিনিও নিরীহ জাপানি নাগরিক কুনিও হোশী। কৃষিকর্ম নিয়ে গবেষণা করছিলেন। রংপুরের এক গ্রামে। সেখানেই একই কায়দায় তিনি খুন হলেন। একইভাবে পুলিশ কোন হদিস খুজে পাচ্ছে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন যে, এটি বিএনপিজামায়াতের কাজ। দলীয় অনুসারীরাও একই সুরে গান গাইতে শুরু করলেন, এটা মাছেলের কাজ। মা ও ছেলে বলতে কাদের ইঙ্গিত করা হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। কোন রকম প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই ব্যক্তি বিশেষের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে রায় দিয়ে ফেলা যে কতোটা অপরিনামদর্শী ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় বহন করে তা বলাই বাহুল্য। আজকাল সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই যে ‘হুকুমের আসামি’র কথাটা শোনা যাচ্ছে, এই দুই ক্ষেত্রেও কি তা প্রযোজ্য হবে? লন্ডনে বসে মা ও ছেলে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদেরই নির্দেশ মোতাবেক খুন হয়েছেন দুই নাগরিক। ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে যদি এই ধরনের মনগড়া কথা বলা হয়, তা এক ধরনের প্রশাসনিক আদেশে পরিণত হয়। বলাই বাহুল্য তাতে প্রশাসনিক কাজে নিরপেক্ষতা, পুলিশের পেশাদারী দক্ষতা এবং তদন্তের সুষ্ঠুতা কিছুই থাকে না। আর সরকারের কর্তাব্যক্তিদেরও বোঝা উচিত এই ধরনের হালকা কথা জনগণকে বিশ্বাস করানো যায় না, বিদেশীদেরও আশ্বস্ত করতে পারে না।

যে মা ও ছেলেকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সুষ্ঠু তদন্ত তাদের আমলেও হয়নি। তাদের আমলেও দেখেছি ২১ আগস্টের ভয়াবহ হত্যাকান্ড। ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলা। সেই ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, তদন্তের নামে কি রকম মিথ্যাচার হয়েছিল। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। যে দুই বড় বুর্জোয়া দলের পেছনে রয়েছে জনগণের বড় দুই অংশ, এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীরাও দুই দলে বিভক্ত (সামান্য ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে), সেই দুটি দল গালিগালাজের বক্তৃতাবাজী ছাড়া নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি। কিন্তু এছাড়া কি গণতন্ত্র হয়?

মা ও ছেলেকে জড়ানোর ব্যাপারটি বাড়াবাড়ি এবং জনগণ তা বিশ্বাস করছে না। কিন্তু এটাকে জঙ্গী মৌলবাদীদের কাজ মনে করার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে। তবে সবটাই তদন্ত সাপেক্ষ। এই দুই হত্যাকান্ডের পর পরই আরেকটি হত্যা প্রচেষ্টার কথা জানা গেল। এবার স্বদেশী কিন্তু এক অমুসলমান খ্রিস্টান পাদ্রী টার্গেট হলেন। পাবনার ঈশ্বরদীতে এক বাঙ্গালী খ্রিস্টান পাদ্রীকে গলাকেটে হত্যার প্রচেষ্টা নিয়েছিল কতিপয় দুর্বৃত্ত। পুলিশ এখন বলছে এটা জঙ্গী মৌলবাদী জেএমবি’র কাজ।

সরকার কখনো বলে এই দেশে মৌলবাদ নেই। আবার কখনো বলে মৌলবাদ এবং তাদের সহযোগী বিএনপি যতো সব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কখনো কখনো নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মহম্মদ ইউনূসের নামও যুক্ত হয়। একেকবার একেক কথা বললে এবং কথার পেছনে জোরালো যুক্তি ও সঠিক তথ্য না থাকলে দেশের নাগরিক ও বিদেশীরা বিভ্রান্ত হন। তাই দেখা গেল, হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল নিরাপত্তার অভাবের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের সফর বাতিল করেছিল। আমরা যথার্থই প্রতিবাদ জানিয়েছি। তখনো শুনেছি, অধ্যাপক ইউনূস নাকি এই ষড়যন্ত্রে ছিলেন। যাই হোক, তার ঠিক কয়েকদিন পরই ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক খুন হলেন। অস্ট্রেলিয়ার সন্দেহ গাঢ়তর হলো। আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলাম। তবু অস্ট্রেলিয়া সন্তুষ্ট হয়নি। তার পরপরই আরেক খবর শোনা গেল। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেই পুলিশ দফতরের সামনেই দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। আমরা হয়তো একটু মুচকি হেসে বলেছি, ‘এইবার দেখ, কোন দেশে কতোটা নিরাপত্তা রয়েছে’। এই সব হচ্ছে ছেলেমানুষী তর্ক। কথার পিঠে কথা। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হবে না। আমেরিকার সমাজে সবচেয়ে বেশি ক্রাইম হয়। খুনের সংখ্যাও আমাদের দেশের চেয়ে বেশি। তবু কেউ মার্কিন দেশে সফর বাতিল করে না। কারণ এত সবের পরও এমনকি আমেরিকার পুলিশের বর্ণবিদ্বেষ (কালো প্রেসিডেন্ট সত্ত্বেও) ও মুসলিম বিদ্বেষের কথা জানা সত্ত্বেও আমার দেশের মানুষ নিরাপত্তার অভাবে সে দেশের ভ্রমণ বাতিল করে না। এতো জানার পরও ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা সেই দেশে লেখাপড়া করতে যায়। কারণ সেই দেশে এতো অপরাধ প্রবণতা সত্ত্বেও ন্যূনতম পর্যায়ে আইনের শাসন আছে এবং তাদের পুলিশি তদন্তের উপর নির্ভর করা যায়।

আমাদের দেশে ঠিক তার উল্টোটাই হচ্ছে নিত্যদিনের ঘটনা।

এখানে আইনের প্রণেতারাই প্রকাশ্যে আইনকে অমান্য করে। একেবারে সমসাময়িক ঘটনা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মনজরুল ইসলাম লিটন গুলি করে আহত করেছে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শাহাদত হোসেন সৌরভকে। সংসদ সদস্যের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। বালক সৌরভের কি দুটি পা হারাতে হবে? র‌্যাবের অবৈধ গুলিতে আহত লিমনের দশাই কি হবে? সে খবর দিতে পারবেন চিকিৎসকরা। এদিকে পুলিশ কিন্তু ধরতে পারেনি সংসদ সদস্যকে। শোনা গেছে তিনি প্রায়ই মদ্যপ থাকেন। সুস্থ অবস্থায় এমন কাজ তিনি করতে পারেন না। সকাল বেলায় বড় রাস্তায় বেরিয়েছিল চাচার সাথে বালক সৌরভ। পেজারো গাড়ি থামিয়ে উক্ত চাচাকে ডাক দেন সংসদ সদস্য। ডাক শুনেই দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল চাচা। হয়তো চাচার মনে ভয় ছিল অথবা কোন অপরাধবোধ ছিল। সেই কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে সংসদ সদস্য গুলি ছোড়েন যা গিয়ে লাগে বালকের দুই পায়ে। শোনা যায়, এই রকম মদ্যপ ও বিশেষ মেজাজের মানুষ তিনি। আওয়ামী লীগের নমিনেশন তাহলে এমন লোকেরাই পেয়ে থাকেন। তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ জবাবদিহিতার তো বালাই নেই। জনগণের ভোট নিয়ে তো আজকাল আর নির্বাচিত হতে হয় না।

তাই অনির্বাচিত সরকারের ক্ষমতার কাছাকাছি লোকদের মেজাজ একটু এই রকম হবেই। কিছুদিন আগে দেখেছিলাম, একইভাবে এক সংসদ সদস্যের পুত্রের ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল। তাই গুলি করে হত্যা করেছিল জনকণ্ঠের এক কর্মচারী ও একজন রিকশাওয়ালাকে। তারও বৈধ পিস্তল ছিল। পরে অবশ্য সেই সংসদ সদস্যের পুত্র গ্রেফতার হন। কিন্তু এই সকল ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক পরিবেশটা কি রকম। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে ধরাকে সড়া জ্ঞান করা যায়। পুলিশ বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দেয়া এবং আইন বহির্ভূত হত্যা যা র‌্যাবপুলিশ করে চলেছে। আর ঠিক এই রকম বিশৃঙ্খল ও আইনের শাসন শূন্যতার মধ্যেই ষড়যন্ত্র কার্যকরি হয়। দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার মধ্যে অনেকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া কিছু বলা যাবে না। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের এই রকম রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবেশেই ষড়যন্ত্র কার্যকরি হয়।

বিচার বহির্ভূত হত্যার কথা যখন উঠলো, তখন আরেক সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের কর্মকর্তা ওমর সিরাজ বন্দী অবস্থায় হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। ক্রসফায়ারে মৃত্যু, বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু, তথাকথিত গণপিটুনির নামে বন্দুক দিয়ে গুলি করে হত্যা, গুম ও নিখোজ ইত্যাদির পাশাপাশি আজকাল শোনা যাচ্ছে বন্দী অবস্থায় হার্টফেল করে মারা গেছে আসামী। মানুষ কিন্তু সরকারের একটি কথাও বিশ্বাস করে না। তবু যে কেন সরকার ও প্রশাসন ক্রমাগত মিথ্যাচার করে চলেছে তা আমার বোধগম্য নয়। আইনের শাসন নেই, তবু গণতন্ত্রের ভড়ং দেখানোর কি মানে হয়? বন্দী অবস্থায় হার্টফেলের ঘটনা ঘটেছিল খালেদা জিয়ার রাজত্বকালে ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময়। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্লিনহার্ট অপারেশন চলে যাতে বন্দী অবস্থায় হার্ট অ্যাটাকে (?) মারা গেছেন ৫৭ জন। এর চেয়ে বড় যে অপরাধ সেদিন খালেদা জিয়া ও সংসদ করেছিলেন তা হলো দায়মুক্তির আইন পাস করা। যারা নির্যাতন করেছিল বা যাদের নির্যাতনের কারণে বন্দী মারা গেছে, যৌথ বাহিনীর সেই সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করা চলবে না। তবে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ আমলেও বন্দী অবস্থায় হার্টফেলের অনেক খবর এসেছিল। বিশেষ করে বিডিআর সদস্যদের বিচারের সময় অনেকে হার্টফেল করে মারা গেছেন। অনেকে আত্মহত্যা করেছেন, এমন অনেকগুলো খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বিচারের বাণী’ আসলেই কাদছে। তবে ‘নিরবে নিভৃতে’ নয় সোচ্চারে। এবং তা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই আমলেই।

সব মিলে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেখানে আর যাই হোক, গণতন্ত্র বলে কোন কিছু নেই। আর এই রকম পরিবেশে উগ্রপন্থা বিস্তার লাভ করে, মৌলবাদ মাটি পায় এবং দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্রের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরী হয়। বাংলাদেশে এর সবকয়টিই পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। অন্যথায় দেশের কপালে আরও কি আছে তা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য।।