Home » রাজনীতি » রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই জঙ্গীবাদ উত্থানের কারণ

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই জঙ্গীবাদ উত্থানের কারণ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

Dis 1পাকিস্তান নামক অত্যুদ্ভুত রাষ্ট্রটির জন্মের ৬৮ বছরের চার দশকই কেটেছে প্রত্যক্ষ সেনা শাসনে। বাকি তিন দশক সামরিক শাসন থাকুক বা না থাকুক, পাকিস্তানের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে সেনাবাহিনী এক অনিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর কোন দেশে পাকিস্তানী সেনাতন্ত্রের এই কর্তৃত্ববাদী মডেল দেখা যায় না। গত ডিসেম্বরে পেশোয়ারের একটি স্কুলে কথিত ধর্মীয় চরমপন্থীদের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর রাষ্ট্রের সব প্রটোকল ভেঙ্গে পাক সেনা প্রধান জেনারেল রাহিল শরীফ তার টুইট বার্তায় লিখেছিলেন, “Asked PM Nawaz Sarif to hang all terrorist. More than 3000 terrorist should be hanged in next 48 hours. Pak Army will come at you Taliban, will destroy you. And they will not target women and children. They are not coward like you.”

এই তালেবানরা গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান সরকারের মধ্যকার সরকার পাক সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টোলিজেন্সের (আইএসআই) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও সহায়তায়। সে কাহিনী কম বেশি সকলের জানা। পাক সেনাবাহিনী জঙ্গীদের নিয়ে খেলেছে বার বার। তারা প্রশিক্ষণ দেয়, অস্ত্র ও রসদসজ্জিত করে জঙ্গীদের। এ অভিযোগ এখন নিরেট বাস্তবতা এবং পাক জনগণ নিজেরা ও প্রতিবেশীরা এটি টের পাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। পাক সেনাতন্ত্রের আত্মঘাতী এই প্রবণতায় একজন পশ্চিমা কূটনীতিক মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুমি নিজের উঠানে বিষাক্ত সাপ পুষবে, অথচ ভাববে সেটা শুধু পড়শীদের কামড়াবে তা তো হয় না’! পাকিস্তানের এই মরন খেলা এখন দেশটিকে পরিনত করেছে উপদ্রুত ভূমিতে। একজন মানুষও কি এখন সে দেশটিতে নিরাপদ?

বাংলাদেশে কি এখন জঙ্গীবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে? সরকার দাবি করছে জঙ্গীবাদকে এ দেশে কখনও থিতু হতে দেয়া হবে না। যে কোন মূল্যে বিনাশ করা হবে। তারা বিএনপিজামায়াত জোটকে জঙ্গীবাদ পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে অভিযুক্ত করে আসছে। অন্যদিকে জঙ্গী প্রতিরোধে হালে বিএনপি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, ২০০১২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির একজন বড় নেতা ও কতিপয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা জঙ্গীবাদের বিষবৃক্ষটি রোপন করেছিলেন। এই আত্মঘাতী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয়া একজন বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমান বা মুফতি হান্নানেরা এখন নিদারুন বাস্তবতা। তা জঙ্গীবাদ, ধর্মীয় উগ্রপন্থা বা চরমপন্থা যাই বলা হোক।

বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমানসহ ছয় জনের ফাঁসি এদের সাংগঠনিক ভিত্তিমূলে কতটা প্রভাব রাখতে পেরেছে সেটি সকলেরই জানা আছে। কারণ এসব সংগঠনের জন্ম, বিকাশ ও লালনপালনের পেছনে থাকে রাজনীতি, বিশেষ করে ক্ষমতার রাজনীতি। বাদপ্রতিবাদ আর অঘটনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বেড়ে উঠছে হিংসাদ্বেষ আর প্রতিশোধের ঘটনা। প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষপ্রসূত রাজনীতি কি এদেশে পুষ্ট করে তুলছে ধর্মীয় চরমপন্থা? গণতন্ত্রহীনতা, সুশাসনহীনতা ও প্রতিহিংসাপরায়ন অবরুদ্ধ রাজনীতি আর বিচারহীনতার রকমফেরই কি জন্ম দিচ্ছে রক্তপাতময়তার?

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব🙂 সাখাওয়াত হোসেন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন, ‘দেশে জঙ্গীবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। বড় দুই দলের মধ্যে যে হানাহানি তাতে জঙ্গীরা সুবিধা নেবে এটাই স্বাভাবিক। সমাজের সবাই জঙ্গী বিরোধী ঠিক আছে, কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষ যখন রাষ্ট্রের দ্বারা মার খায়, তখন জঙ্গীরা কাকে মারলো বা কোথায় বোমা বিস্ফোরন ঘটালো তা নিয়ে সমাজ ভাবতে চায় না। বড় দুই দলের অসহনশীল সম্পর্কই জঙ্গীবাদকে উস্কে দিচ্ছে’। তার মতে, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গীবাদকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। ডিজিএফআই রাষ্ট্রের বাইরের সংস্থা নয়। এসব সংস্থাকে যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হবে, তখন অনেক ভয়ংকর কিছু ঘটবে’।

বাংলাদেশে এখন একটি সর্বনাশা বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইসলামিক ষ্টেট (আইএস) আছে, নেই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আইএসের অস্তিত্ব নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রী ও দলীয় বুদ্ধিজীবিরা তাঁর কন্ঠে কন্ঠ মেলাচ্ছেন। ভাবছি, প্রধানমন্ত্রী যদি বলতেন, আইএস আছে, অন্যরাও নিশ্চয়ই তাই বলতেন। আসুন, রেকর্ডপত্র দেখা যাক। ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার একটি মামলার তদন্ত শেষে গত ১৫ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ‘বিরাজমান সরকার ব্যবস্থাকে উৎখাত করে খিলাফত রাষ্ট্র গঠনের’ লক্ষ্যে তৎপরতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ উল্লেখ করে সিরিয়াইরাকভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস এর সমন্বয়ক শাফায়েত কবীরসহ চারজনের বিরুদ্ধে ঐ চার্জশিট দাখিল করা হয়। আদালত এটি আমলে নিয়েছে’। তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ ও বুদ্ধিজীবিরা যার অস্তিত্ব স্বীকার করছেন না, তা বাস্তবে আছে।

বেশ কিছুদিন দেশে আইএস এর উপস্থিতি ও তাদের দমনে নেয়া পদক্ষেপ সরকারীভাবে বলা হতো, প্রচার করা হতো। পরপর দুই বিদেশী নাগরিক খুনের দায় কথিত আইএস স্বীকার করে নেয়। এর আগেই নিরাপত্তাহীনতার উসিলায় অষ্ট্রেলিয় ক্রিকেট দল সফর বাতিল করে। পরে তাদের পদাঙ্ক অনুসরন করে দক্ষিণ আফ্রিকার নারী ক্রিকেট দল। এমতাবস্থায় সরকার আইএস এর অস্তিত্ব উড়িয়ে দিচ্ছে। জঙ্গীদের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তা নিয়ন্ত্রনে রয়েছে বলে সরকারের দাবি। এসব বক্তব্য এবং লুকোচুরি মনে করিয়ে দেয়, ছোটবেলায় পড়া রাখাল বালকের গল্প। যে প্রায়ই আওয়াজ দিত, বাঘ আসছে, বাঘ আসছে

২০০১২০০৬ শাসনামলে রাষ্ট্রসরকার জঙ্গীবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে সরাসরি, যা পরবর্তীকালে জনসম্মুখে প্রকাশিত। এর সবচেয়ে বড় প্রমান হচ্ছে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান এবং তৎকালীন বিরোধী নেতার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা। ১/১১ এর সিভিলমিলিটারী শাসনামলে বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে এর বিস্তার ঘটেছে, রোধ করা হয়নি। বর্তমান সরকার বিরোধী পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার অবিরাম প্রচেষ্টা হিসেবে জঙ্গীবাদকে অন্যতম ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। আপাত:দৃষ্টিতে জঙ্গী দমনে তারা আন্তরিক, কিন্তু এই ট্রাম্পকার্ড নিয়ে খেলা আগামীর বাংলাদেশে কতটা বিপদজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করবে সে নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এর সবচেয়ে বড় উদাহরন পাকিস্তান রয়েছে আমাদের সামনে।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সবসময়ই জঙ্গীবাদ অথবা ধর্মীয় চরমপন্থাকে আশ্রয়প্রশ্রয় দিয়েছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অন্যতম কৌশল হিসেবে। কথিত ধর্মীয় সংগঠনগুলো নানা সময়ে নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি ইস্যুতে সংগঠিত হয়েছে, মদত পেয়েছে ক্ষমতাসীনদের, নেপথ্যে বেড়ে উঠেছে জঙ্গীবাদের চারা। রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য, বিদ্বেষ ও জিঘাংসা জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদকে বিশেষ স্পেস তৈরী করে দিয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশেষ সরকারী সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ মদত ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই স্পেস তৈরী হয়েছে। পাকিস্তান এক্ষেত্রে বার বার উদাহরন হয়ে আসবে। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকার এই প্রবণতা তৈরী হয়েছে জঙ্গীবাদকে কার্ড হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে।

এই বিপদজনক প্রবণতার মূল কারণ হচ্ছে, গণতন্ত্র চর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক রীতি না থাকা। ব্যক্তির ইচ্ছে মূখ্য হয়ে ওঠায় দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামোয় দলের ভেতরেবাইরে কোথাওই নেতাদের জবাবদিহি করতে হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কথিত গণতান্ত্রিক দলগুলোর দলীয় কর্মকান্ড, এমনকি জাতীয়স্থানীয় নির্বাচনে এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্যাডারদের মত ব্যবহার করে এদেরই হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। এজন্যই রাষ্ট্রে কখনই সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা পায়নি। বাইরে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের দাপট দেখালেও ভেতরে তা রাষ্ট্রের শক্তিমান প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে আপোষ করেই চলে।

এর যোগফল দাঁড়িয়েছে সরকার গঠনে জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহনমূলক ভোট এখন আর অত্যাবশ্যক নয়। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলো নানা উসিলা সৃষ্টি করে যে কোন প্রকারে ক্ষমতায় থাকাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারন করে। ভেতরেবাইরে নানারকম জাতীয়আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চলে আপোষরফা। রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদীতার এই চোরাবালিতে ক্ষমতায় জঙ্গীবাদের মত উপদ্র্রব নানা ফর্মে জিইয়ে রাখে। আর ব্যবহারিক প্রয়োগ জঙ্গীবাদকে করে তোলে শক্তিমান। এজন্য বেশকিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে। উত্তরগুলি জনান্তিকে উচ্চারিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এর পরিষ্কার উত্তর মেলে না। ফলে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়, রহস্য ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কথিত জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা মাঝেমধ্যেই ধরা পড়ে। অর্থ দাঁড়ায়, জঙ্গী কর্মকান্ড সচল রয়েছে। হিজবুত তাহরিরের কর্মকান্ড চলছে কিভাবে? অনলাইন সম্মেলনের পরেও তাদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা যাচ্ছে না? নিরাপত্তার চাদরের মধ্যে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে বারবার অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। একই জায়গায় বারবার কারা এরকম অস্ত্রভান্ডার তৈরী করছে? এই কার্যক্রম যারা চালাচ্ছে তাদের অর্থের উৎস কি এবং অভ্যন্তরে নিরাপদ জায়গা দিচ্ছে কারা? তাহলে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি জঙ্গী কার্যক্রম দমনে পুরোপুরি সফল নয়? এসবের ফলোআপ কি? একটি ঘটনার তদন্তও এগোয় না কেন? বিচার হয় না কেন? আবার জামিন পেলে এরা কোথায় চলে যায়? গোটা ব্যাপারটার মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা, কি রহস্য লুকিয়ে আছে?

দুষিত রাজনীতির ফাঁক গলে এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের কারণে বিশ্বব্যাপী জঙ্গীসন্ত্রাসবাদ বাড়ছে। এটি মাথাচাড়া দেয়া বা শক্তিশালী হওয়ার মূল কারণ নিহিত আছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাঝে। যেখানেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি স্থবির হয়ে পড়ছে সেখানেই জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র হয়ে উঠছে নিপীড়ক। বিভেদ, অনৈক্য, প্রতিহিংসাপরায়নতা বিস্তৃত হচ্ছে জিহাদের নামে জঙ্গী রাজনীতি। সুযোগ করে দিচ্ছে ও দেয়া হচ্ছে বিশ্ব মোড়লদের। আক্রান্ত দেশগুলির রাজনীতি, অর্থনীতি, সম্পদ, এমনকি জনগণও চলে যাচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রনে। দেখার বিষয় হচ্ছে, তথ্য প্রমান ছাড়াই দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যায়? নাকি বর্তমান সরকারের কঠোরকর্তৃত্ববাদী শাসন বিশ্বে ব্যতিক্রম হিসেবে এই দেশকে জঙ্গীসন্ত্রাসমুক্ত রাখতে সক্ষম হবে?