Home » অর্থনীতি » শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (চতুর্থ পর্ব)

শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (চতুর্থ পর্ব)

বিত্ত ও মুনাফাই একমাত্র আরাধ্য দেবতা

হায়দার আকবর খান রনো

Last-4রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর সমালোচক ছিলেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের সমস্ত জীবনের শিকড় যেখানে, সেখান থেকে সাত হস্ত দূরে আমাদের শিক্ষার ধারা বর্ষিত হইতেছে। আমরা যে শিক্ষায় আজন্মকাল যাপন করি, সে শিক্ষা কেবল যে আমাদিগকে কেরানীগিরি অথবা কোন একটা ব্যবসায়ের উপযোগী করে মাত্র।” (‘শিক্ষার হেরফের’ রবীন্দ্র রচনাবলী খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ২৮৫, বিশ্বভারতী ১৯৭৩)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও বলেছেন, এই শিক্ষা “কেবল ধনোপার্জন এবং বৈষয়িক উন্নতির সাধনেই ব্যস্ত” রাখে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সেটাই তো স্বাভাবিক। শিক্ষা প্রসঙ্গে শোষকশ্রেণীর মতাদর্শ আমাদের অস্থি মজ্জায় এমনভাবে মিশে আছে যে আমরা শিক্ষার লক্ষ্যকে এইভাবে ব্যক্ত করি – ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ী ঘোড়া চড়ে সে।’ এর মধ্যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য নেই, প্রকৃত জ্ঞানার্জনের কোন লক্ষ্য নেই।

তাহলে প্রকৃত শিক্ষা কি? এর একটা সংজ্ঞা দিয়েছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী– “সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা যা আলো হয়ে জ্বলে, যার নিজের মধ্যে আলো থাকে এবং যা অন্যকে আলোকিত করে।” (সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কর্তৃক প্রকাশিত শিক্ষা সম্মেলন স্মারক গ্রন্থপৃষ্ঠা ২৫৭)

সেই শিক্ষা আমরা কোথায় পাবো পুঁজিবাদী সমাজেযেখানে বিত্ত ও মুনাফাই একমাত্র আরাধ্য দেবতা? নিজেকে ও অপরকে আলোকিত করার মতো শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সমাজতান্ত্রিক সমাজে। বহুজাতিক করপোরেশনে উচ্চ বেতনে চাকুরি লাভ করাটাই শিক্ষার চরম সার্থকতা নয়। দার্শনিক হেগেল বলেছেন, “সুশিক্ষিত মানুষ বলতে আমরা তাদেরকেই বুঝাই যারা অপরে যে কাজ করে সেই সকল কাজই করতে পারেন।” কথাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ যে কাল মার্কস তাঁর বিখ্যাত পুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে হেগেলের এই বক্তব্যটি ফুটনোটে উদ্ধৃত করেছেন। (পুঁজি প্রথম খণ্ড, পরিচ্ছেদ ১৪, মস্কো থেকে প্রকাশিত ইংরেজী সংস্করণ, ১৯৬১ সাল, পৃষ্ঠা ৩৬৩ ফুটনোট)

সেই রকম সত্যিকারের আলোকিত ও সুশিক্ষিত মানুষ তৈরীর চেষ্টা হয়েছিল একদা সমাজতান্ত্রিক সমাজে। প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টান্তই দেখা যাক। সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল বহু দিক দিয়েই পুঁজিবাদী জগত থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। প্রথমত, শিক্ষা ছিল সার্বজনীন এবং তাও পরিপূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় খরচে। আমাদের দেশে রাষ্ট্র যদি শিক্ষার ব্যয়ভার (অর্থাৎ টিউশন ফি, বই খাতা ইত্যাদি) গ্রহণ করেও তবু অনেক বালকবালিকা কিশোরকিশোরী সেই সুযোগ নিতে পারবে না। কারণ, পরিবারের খাবার জোগাড়ের জন্য ঐ বয়সেই তাকে শ্রমশক্তি বিক্রি করতে হয়, তাও সস্তায়। যেহেতু সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রতিটি মানুষের জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনসমূহ রাষ্ট্রই মেটায় এবং শ্রেণী শোষণ ও বৈষম্য বলে কিছু নেই, সেহেতু শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমাদের মতো এই ধরনের সমস্যার উদ্ভব হবার কোন কারণই নেই। তিরিশের দশকে রাশিয়া ভ্রমনকালে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, সেই দেশের অনাথ বালকবালিকারা অন্যান্যদের মতো লেখাপড়াই শুধু শিখছে না, তাদের চেহারায় তিনি দেখেছেন সম্ভাবনার উজ্জলতা, “অনাদরের অসম্মানের কুয়াশা ঢাকা চেহারা একেবারেই নয়।” (রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্র রচনাবলী, খণ্ড২০, পৃষ্ঠা ২৯৮)

দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রকৃত আলোকিত মানুষ তৈরীর বিশাল উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে এক সময় বিজ্ঞানের দিক দিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্বকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেকথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আর্ট, সাহিত্য, ইতিহাস, অর্থনীতি, দর্শন, ভাষা, এমনকি ক্রীড়া এই সকল দিক দিয়েও তারা অনেক অগ্রসর ছিলেন। স্তালিন চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক মানুষ তৈরী করতে, সেই মানুষ যারা শোষণ মুনাফা কাকে বলে তা জানবে না, যারা মনুষ্যত্বের চরম বিকাশ ঘটাবে। এই প্রসঙ্গে মার্কসের একটা বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। ফরাসী দার্শনিক প্রুধোর মতো পেটিবুর্জোয়া তাত্ত্বিকদের প্রসঙ্গে মার্কসের উক্তি ছিল, “তারা এমন সমাজের কল্পনা করতে পারেন না, যেখানে মানুষ আর বুর্জোয়া নয়।” (আন্নাকভের কাছে লেখা চিঠি, ২৮ ডিসেম্বর ১৮৪৬ সাল)। সোভিয়েতে সেই সমাজ ও সেই মানুষ তৈরীর প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছিল যা পুরোটা না হলেও অনেকাংশে সফল হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক যুগে সোভিয়েতচীন প্রমুখ দেশে জাতি বিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, পুরুষতান্ত্রিকতার অবসান ঘটেছিল, বিকশিত হয়েছিল শ্রমিক শ্রেণীর মহান আন্তর্জাতিকতাবাদ। সেই জন্য লেনিনস্তালিনের সোভিয়েতে এবং মাও সেতুংএর চীনে মতাদর্শগত সংগ্রাম ও প্রলেতারীয় সাংস্কৃতিক বিষয়কে শিক্ষার অঙ্গীভূত করা হয়েছিল। রাশিয়ার বিজ্ঞানের উন্নতির কথা সকলেই স্বীকার করেন। কিন্তু একটা মজার কথা বলেছে ভারতের শিক্ষা সংক্রান্ত এক রিপোর্টে। ১৯৬২ সালের রাজরায় সিংহের রিপোর্টে যা বলা হয়েছে তার কয়েকটি বাক্যের বঙ্গানুবাদ নিচে তুলে ধরা হল। (সৈয়দ শাহেদুল্লাহ্’র মাধ্যমিক শিক্ষা সংক্রান্ত এক প্রবন্ধে উদ্ধৃত আছে, ইংরেজীতে)

সাধারণত সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যকে ইউএসএসআরএর বিজ্ঞানপ্রযুক্তির ক্ষেত্রের সাফল্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আমাদের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিভাত হয় যে, সে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবুও সোভিয়েত শিক্ষা পাঠ্যক্রমে কোন বিশেষ বিষয়ের শ্রেষ্ঠ অবস্থান যদি খুঁজতে হয়, তাহলে সেটা হচ্ছে ভাষা।”

তৃতীয়ত, সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য এই ধরনের বিভাজন নেই। সকল ছাত্রছাত্রীকে একটা বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত প্রকৃতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, কলা, সাহিত্য সবই পড়তে হয়। মানুষ হিসাবে বড় হতে হলে রবীন্দ্রনাথ যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন অথবা হেগেল যে ধরনের শিক্ষার কথা ভেবেছেন, তা করতে হলে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভক্তিকরণ কখনই সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তো প্রথম থেকেই নানা ধরনের বিভাজন রয়েছে, বিষয়বস্তুগত, পদ্ধতিগত, মানগত।

আমাদের দেশে আরও বলা হয় যে, ভোকেশনাল ট্রেনিংকে গুরুত্ব দেয়া হোক। অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তি ও পরিকল্পনাবিদ প্রায়শ একথা বলে থাকেন। এর আসল মানে হল, ব্যয়বহুল লেখাপড়া যারা চালিয়ে যেতে পারবে না, তাদের মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্তও অতিক্রম করার দরকার নেই। বালক কিশোর বয়সেই নানা ধরনের টেকনিশিয়ান, মিস্ত্রী তৈরী করা হোক। অর্থাৎ তাদেরকে সেই ধরনের শিক্ষাদান করা হোক, যা ছিল এইচ জি ওয়েলসের ভাষায়, “নিম্ন শ্রেণীর জন্য নিম্নমানের শিক্ষা।” তার মানে এই নয় যে, সমাজতান্ত্রিক দেশে টেকনিশিয়ান, মিস্ত্রী, প্রশিক্ষিত শ্রমিক ছিল না। অবশ্যই ছিল এবং এখনও আছে। তবে সকলকেই বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত একই ধরনের একই মানের শিক্ষা দেয়া হয়। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত নেতারা বিশ্বাস করতেন, “মানুষের শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করার ও আয়ত্ত করার ক্ষমতা অপরিসীম।” ফলে তরুণ বয়সে বিভক্তি হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক ও প্রতিক্রিয়াশীল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ ইভান পেট্রোভিচ পাভলভের (১৮৪৯১৯৩৬) চিন্তা দ্বারা সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের নির্মাতাগণ যথেষ্ট প্রভাবিত ছিলেন। পাভেলভ বলেন যে, জন্মগত প্রকৃতি প্রদত্ত যোগ্যতার চেয়ে পরিবেশ ও শিক্ষাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের স্নায়ুগুলি প্রায় অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন। মানুষের বুদ্ধির ৯৯ শতাংশ নির্ভর করছে শিক্ষা ও অনুকূল পরিবেশের উপর, যে সুযোগটা সকলকে সমানভাবে দিতে হবে, অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত।

তার মানে এই নয় যে, সেই দেশে দৈহিক শ্রমের কাজকে ছোট করে দেখা হয়। বরং উল্টো। শ্রমের মর্যাদা মার্কসবাদী কমিউনিস্টরাই যে সবচেয়ে বেশী দিয়ে থাকে, এটা নতুন করে বলার দরকার নেই। ১৯৯০ সালে কিউবায় গিয়ে আমি দেখেছি, সেখানে একেবারে নিচু ক্লাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল ছাত্রছাত্রীকে বয়স অনুসারে কিছুটা উৎপাদনমূলক দৈহিক শ্রমক করতে হয়। এই প্রসঙ্গে কার্ল মার্কসের চিন্তাটাও জানা দরকার। মার্কস মনে করতেন, স্কুলের ক্লাসের পড়ার সঙ্গে উৎপাদনমূলক দৈহিক শ্রম যুক্ত হলে তা শিশুদের ও তরুণদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের পক্ষে সহায়ক। (দেখুন : ক্যাপিটাল, প্রথম খন্ড, পঞ্চদশ অধ্যায়, মস্কো থেকে প্রকাশিত ১৯৬১, ইংরেজী সংস্করণ পৃষ্ঠা ৪৮৩)। কমিউনিস্ট ইশতেহারের কর্মসূচিতে (দশ নম্বর কর্মসূচি) একদিকে শিশু শ্রমের অবসান এবং সকল শিশুর জন্য পাবলিক স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষার দাবী তোলা হয়েছে, অপরদিকে একই সঙ্গে “শিল্পোৎপাদনের সঙ্গে শিক্ষার সংযুক্তি”র কথা বলা হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই আদর্শকে বাস্তবায়িত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা নেয়া হয়েছিল।।

(চলবে…)