Home » শিল্প-সংস্কৃতি » গৃহযুদ্ধে শরণার্থী হওয়ার কাহিনী ‘ওয়েস্ট বৈরুত’ (শেষ পর্ব)

গৃহযুদ্ধে শরণার্থী হওয়ার কাহিনী ‘ওয়েস্ট বৈরুত’ (শেষ পর্ব)

ফ্লোরা সরকার

Last 6আমরা আলোচনা করছি জিয়াদ দোয়েরি পরিচালিত ‘ওয়েস্ট বৈরুত’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে যাতে বৈরুতের গৃহযুদ্ধ, এ কারণে অসহায় মানুষদের যে সীমাহীন দুঃখ, কষ্ট, বেদনার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। গৃহযুদ্ধ সাধারণ মানুষের সৃষ্টি নয়, এটি সৃষ্টি করা হয়েছে, চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ভিন্ন কূটকৌশলে সাধারণ মানুষদের উপরে। গৃহযুদ্ধ অসংখ্য মানুষকে যেমন বিপন্ন, বিপর্যস্ত করে ফেলে তেমনি অনিবার্য ফলাফল হিসেবে মানুষ হয়ে পরে রিফিউজি বা শরণার্থী। ওয়েস্ট বৈরুত নিয়ে আলোচনার শেষ পর্বে শরণার্থী হওয়া মানুষদের কান্না, দুঃখ, বেদনা নিয়ে আলোচনা করবো।

মূলত এক কিশোরের চোখ দিয়ে দেখা তার দেশের গৃহযুদ্ধের কাহিনী। গৃহযুদ্ধ শুরুর পরেই, ছবির কিশোর নায়ক তারেকের স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, স্কুলের অবস্থান পূর্ব বৈরুতে অবস্থিত হবার কারণে। বাসযাত্রীদের গণহত্যার (যে গণহত্যা বাস্তবে সংঘটিত হয়েছিলো এবং প্রায় ৩১ জন খুন এবং অনেকে আহত হয়েছিল) পরদিন তারেককে তার বাবা রিয়াদ যখন স্কুলে নিয়ে যেতে চান, একটা চেক পয়েন্টে কিছু সেনা তাদের বাঁধা দেয় এবং একজন সেনা বলেন – ‘ওদিকে যাওয়া যাবেনা। বারন আছে’। রিয়াদ, ‘কারা বারন করেছে’? সেনা, ‘খ্রিস্টানরা’। রিয়াদ, ‘কিন্তু ঐদিকটা তো আমার জন্মস্থান‘। সেনা, ‘শুধু খ্রিস্টারা ওদিকে যেতে পারবে’। রিয়াদ, ‘কিন্তু আমরা তো বৈরুতেরই বাসিন্দা’। সেনা, ‘বৈরুত ! এখন কোনো বৈরুত নেই। আজ থেকে এই জায়গা শুধু পূর্ব আর পশ্চিম। যাও, এখান থেকে’। গাড়ি ঘুরায় রিয়াদ, সঙ্গে থাকা তারেকের মা রিয়াদকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমরা কোন্ অংশে’? রিয়াদ, ‘সম্ভবত পশ্চিম বৈরুত’। ছবির নামকরণের কারণই একই সঙ্গে আমাদের জানা হয়ে যায়।

শুরু হয় তারেকের স্কুলহীন, গোলাগুলির এক অস্থির সময়। গৃহযুদ্ধ কিশোরকিশোরীদের কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে একের পর এক চিত্রায়িত হতে দেখা যায়। তারেক এবং তার বন্ধু ওমর সারাদিন অর্থহীন সব কাজ করে বেড়ায়। এমনকি উঠতি বয়সের যৌন ফ্যান্টিসি থেকেও তারা নিষ্কৃতি পায়না। ছোট্ট একটা দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে পরিচালক চমৎকার করে তা দেখিয়ে দেন। যেখানে দেখা যায়, ওমরের বাড়িতে তার বাবার বয়স্ক এক বন্ধুর যুবতী বউকে দ’ুজনই যৌনতার জায়গা থেকে দেখে এবং উপভোগ করে। শুধু তাই নয় সেই যুবতীর কিছু ছবির ভিডিও করে। এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ছবির দ্বিতীয় পর্ব।

সেই ভিডিও ডেভেলপ করার জন্যে, তাদের পূর্ব বৈরুতে যাবার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু যেহেতু পূর্ব বৈরুতে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়, তাই তারেককে শরণাপন্ন হতে হয় ‘মে’ নামের এক প্রতিবেশী কিশোরীর কাছে। যে কিশোরী খ্রিস্টান, কিন্তু তারা গণহত্যার আগের দিন বাসা ভাড়া নিয়ে পশ্চিম বৈরুতে উঠে এসেছিলো। সারা ছবিতে মেয়েটির ভয় সন্ত্রস্ত্র মুখটা আমাদের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়, কারণ মেয়েটি খ্রিস্টান হওয়ায় সে এবং তার মা’র এই অংশে থাকা অবৈধ। কিন্তু মুসলিম তারেক আর খ্রিস্টান মে’র মাঝে যেন সেই ভয়াবহতার চিহ্ন মাত্র দেখা যায়না। যদিও, ওমরের কাছে প্রথম দিকে মেয়েটির খ্রিস্টানত্ব তাকে পীড়া দেয়, বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। কিন্তু সেই বিরক্তি, মে’র খ্রিস্টান হবার কারণে নয়, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে। কারণ ছবির এক জায়গায় যখন দুই বন্ধু কথা বলে, আমরা বুঝতে পারি, ধর্ম নিয়ে তাদের কারোই কোনো মাথা ব্যাথা নেই। শুধু তাই নয়, সুরা ফাতেহা পর্যন্ত দুজনের কারোরই মুখস্ত নেই। ওমর তারেককে বলে, তার বাবা প্রতি শুক্রবার মসজিদে যেতে বলে, রোজা রাখতে বলে, যা তার ভালো লাগেনা। কিন্তু ধর্মের প্রতি অনীহা বা ঘৃণাও মানুষকে তার ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, সেটাও পরিচালক দেখিয়ে দিতে ভুল করেন না। ছবির একটা দৃশ্য, যেখানে বাবা আর ছেলে অর্থাৎ রিয়াদ আর তারেক এক সঙ্গে বাথরুমে শেভ করতে করতে যে কথাগুলো হয়, ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্য। নানা কথার পর, তারেক বলে, ‘আমি মোটেও আরব না। আমি একজন লেবানিজ, ফোনেশিয়ান’। রিয়াদের কানে ‘ফোনেশিয়ান’ অর্থাৎ ‘সমুদ্র সম্রাট’ শব্দটা কাজে বাজে। তারেককে জিজ্ঞেস করে, শব্দটা সে কোথায় পেয়েছে। আরব ইতিহাস থেকে পেয়েছে বলে তারেক জানায়। তখন রিয়াদ ছেলেকে চমৎকার কিছু সংলাপ বলেন, ‘তোমার ঐতিহ্য নিয়ে তোমার অহংকার থাকা উচিত। তুমি কি জানো, আমরা মানে আরবরা যখন চিকিৎসা আর প্রকৃতিবিজ্ঞান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনও ইউরোপিয়রা গুহায় বাস করতো? যদিও সেই ইতিহাস হাজার বছর আগের’। তারেক তখনই বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘হ্যা, হাজার বছর আগে। কিন্তু এখন কিভাবে আছি’? রিয়াদ অস্বীকার করেননা, বলেন, ‘তোমাকে আমি দোষ দেইনা। তুমি ঠিকই বলেছো। আরবরা আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শুধু আরবরাইনা, গোটা পৃথিবীই আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই, এখান থেকে নিস্তারের একমাত্র পথ লেখাপড়া করে শিক্ষিত হওয়া, না হলে, তোমাকে তোমার আত্মীয় খালিদের মতো সারাজীবন দোকানদার হয়ে থাকতে হবে’।

রিয়াদ ছেলেকে লেখাপড়ার সমাধান দিলেও, শিক্ষা দূরে থাক, ক্রমেই সেই শহরে থাকাটাই তাদের জন্যে অযোগ্য হয়ে ওঠে। গৃহযুদ্ধ মানুষকে শুধু শারীরিক ভাবে পঙ্গু করেনা, মানসিক দিক থেকে আরো ভয়াবহ ভাবে পঙ্গু করে দেয়। তারেকের মা, হালা, তাই শহর ছেড়ে চলে যাবার জন্যে অস্থির হয়ে ওঠেন। শুরু হয় ছবির তৃতীয় এবং মূল পর্ব। রিয়াদ তাকে ক্রমেই বোঝাতে থাকেন, ইতিহাসের পাতা থেকে সালতারিখ তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের দেশ এখন আরেকটা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তোমার মনে আছে, ১৯৫৮, ’৬৪, ’৭৩ এর কথা? এসব মূলত কুকুর লড়াই ছাড়া আর কিছু না। দেশের মাটি খুব শক্ত, পাথরের চেয়েও শক্ত। এখানে কখনো ফাটল ধরে না। আমি তোমাকে প্রমাণ করে দিবো’। বলে রিয়াদ, বাটিতে রাখা কিছু ফল নিয়ে এসে, হালাকে বলে, ‘মৌসুমের প্রথম শস্য। কৃষকরা বলেছে, এবার এই ফল বাজার মাত করে দেবে’। খুব অর্থপূর্ণ সংলাপ। দেশের মাটি ঠিক থাকলে, সেই দেশের কোনো ভয় থাকেনা। এবং সেই মাটি রক্ষা করার দায়িত্ব সেই দেশের জনগণের। স্থুল এবং মোটা এক প্রতিবেশিনী যে কিনা প্রতিদিন মোরগের ডাকে ক্ষেপে গিয়ে মোরগকে চিৎকার করে অভিসম্পাত দেয়, আর তারেকের ঘুম ভেঙ্গে দেয়, একদিন সে যখন মোরগকে অভিশাপ দিয়ে বলে, তোর দক্ষিনে চলে যাওয়া উচিত’, তারেক বিরক্ত হয়ে তার মাথায় পানি ঢেলে বলে, ‘তোমরও সেখানে যাওয়া উচিত’। তারেকের মা তারেককে বলেন, ‘এভাবে কাউকে বলোনা। একদিন আমরাও রিফিউজি হয়ে যেতে পারি’। এই রিফিউজি হবার ত্রাস ছবির গতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে। যুদ্ধরত দেশে, না সেখানে থাকা যায়, না দেশ ছাড়া যায়। এ যে কতটা অমানবিক, কতটা ত্রাসের, যারা সেসব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়, তারাই শুধু উপলব্ধি করতে পারেন। ছবির শেষে, হালা একেবারে হাল ছেড়ে দিলে, রিয়াদ তাকে বলেন, ‘কার বিরুদ্ধে লড়বে? সাম্রাজ্যবাদ? কোথায় যাবে, জর্ডান, গ্রিস অথবা প্যারিস? তুমি কি জানো সুইজারল্যান্ডে আমাদের ওরা কি বলে ডাকে? ‘উন্নত শ্রেণীর রিফিউজি’ ! লন্ডন এয়ারপোর্টে আমাদের পেছনে গন্ধ শুঁকে শুঁকে যেসব কুকুরেরা সন্দেহ করে, সেসব কুকুর আমাদের পেছনে লেলিয়ে দেয়। আমেরিকায় আমাদের বলা হয়, ‘ মরুভূমির নিগার ’। আমরা এমনকি কমিউনিস্টদের কাছেও তদবির করেছি, যাতে ওরা বর্ডার পার করে দেয় আমাদের। প্রতিটি দেশে আমরা আজ কালো তালিকাভুক্ত। আমরা শুধু সন্ত্রাসী এবং ড্রাগ ডিলার নামে পরিচিত। এসবকি আমাদের ছোট করে দেয়না? হীন করে না? তারপরেও হালা যখন বলেন, ‘এই দেশ থাকার অযোগ্য’। রিয়াদ দৃঢ়চিত্তে উত্তর দেন, ‘একটা বিষয় তোমাকে বুঝতে হবে। আমি অন্য কোনো দেশের অধীনে যাবোনা। এখানেই থাকবো। তোমরাও থাকবে’।

ছবি শেষ হয়। আমাদের চোখের সামনে শত শত রিফিউজির চিত্র ভেসে উঠে। কিন্তু রিফিউজি যে কোনো সমাধান নয়, পরিচালক আমাদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন। দেশের মাটি রক্ষা করার দায়িত্ব দেশের জনগণের, শুধুমাত্র কোনো মুসলিম, খ্রিস্টান বা ইহুদির নয়। সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু দেশের মাটি ত্যাগ করা সব থেকে কঠিন। ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে, এই কঠিন কাজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তারেক আর তার বাবামা যেভাবে তাকিয়ে থাকেন, দর্শকও একাত্ম হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্য আজ যেন এক বিষাদ বেদনার আখ্যান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।।

(সমাপ্ত)