Home » আন্তর্জাতিক » চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩১)

চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন (পর্ব – ৩১)

সাংস্কৃতিক বিপ্লব :: ডান ও বাম বিচ্যুতির কথা

আনু মুহাম্মদ

Last 4রুশ ও চীন বিপ্লব এবং এসব দেশে বিপ্লবউত্তর গতিবিতর্কসংকট সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা ও গবেষণার জন্য ফরাসী মার্কসবাদী পন্ডিত চার্লস বেটেলহেইম (১৯১৩২০০৬) বিখ্যাত। রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব উত্তর বিতর্ক, ওঠানামা, শ্রেণী দ্বন্দ্ব ও শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে কয়েক খন্ডে তাঁর গ্রন্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ব্যাপারেও বিপ্লব ও বিপ্লব উত্তর পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ আছে তাঁর। ১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে এবং এরপর বেশ কয়েকবার তিনি চীন সফর করেন। তিনি ছিলেন ফ্রান্সচীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় বেটেলহেইম বেশকিছু শিল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং শ্রমিকদের ভূমিকার প্রতি বিশেষ নজর দেন। তিনি বলেন, প্রশ্ন থাকলেও শ্রমিকদের ‘বেশ কয়েকমাস লাগলো বিদ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে সরব হতে।’ সকল শিল্পকারখানাতেই শ্রমিকদের ‘ব্যবস্থাপনা কমিটি’ থাকতো, যারা ছিলো শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি আর যাদের ঐ পদ থেকে প্রত্যাহার করবারও সুযোগ ছিলো। এঁদের কাজ ছিলো প্রধানত পাঁচ এলাকায়: () মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক; () উৎপাদন ও কারিগরি বিষয়; () ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগসহ অর্থসংস্থানের বিভিন্ন দিক; () কাজের নিরাপত্তা; () সাধারণ কল্যাণ। এই কমিটি ছিলো বস্তুত ফ্যাক্টরি ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ শ্রমিকদের যোগসূত্র। এই কমিটি কারখানার পার্টি কমিটির নেতৃত্বেই কাজ করতো।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে পার্টি কমিটি যখন বহুস্থানে অকার্যকর হয়ে যায় তখন ‘সংশোধনবাদী ব্যবস্থাপনার’ বিরুদ্ধে অনেকগুলো কারখানায় বিপ্লবী কমিটি গড়ে ওঠে। এই কমিটিগুলোতে তিন অংশের প্রতিনিধিত্ব ছিলো, জনতা, পার্টিকর্মী ও পিপলস লিবারেশন আর্মির সৈন্য। তিন বয়স গ্রুপের মানুষ রাখা হতো কমিটিতে: তরুণ, মধ্যবয়সী ও প্রবীণ। পুরনো পার্টি কমিটিগুলো থেকে কিছু বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটে তখন। তবে বেটেলেহেইম ১ হাজার ১১৯টি কারখানায় জরীপ চালিয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন শতকরা মাত্র ১.২ ভাগ কারখানায় পার্টি কমিটিগুলোর পুরনো সদস্য বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে।

বেটেলহেইম লিউ শাউ চীর বক্তব্য সম্পর্কে বলেছেন, লিউ মুনাফা, বস্তুগত প্রণোদনা ও বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে সকল উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে মাও সে তুং এর লাইনকেই সঠিক বলেছেন তিনি। এর কারণটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, যদি মুনাফা প্রনোদনাই সকল উৎপাদন তৎপরতার পরিচালনা শক্তি হয়,তাহলে উৎপাদন সম্পর্কের বিপ্লবীকরণের বদলে শ্রমিকেরা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ এবং মুনাফাবৃদ্ধির উপযোগী উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হয়। ব্যক্তিগত প্রণোদনা ব্যবস্থা কার্যকর করতে গেলে পুরো ব্যবস্থার মধ্যে তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও হায়ারার্কির মাধ্যমে পুঁজিবাদী সম্পর্কেরই পুনরুৎপাদন ঘটায়। যদি এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম সজীব না থাকে তাহলে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান একটি সার্বক্ষণিক সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে যায়।

এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে যে, বাম বিচ্যুতির ঘটনাও ঘটছিলো সেবিষয়েও বেটেলহেইম বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন দুটো ঝোঁক চীনের বিপ্লবীদের মধ্যে সমস্যাজনক হয়ে ওঠেছিলো। একদিকে, মত ছিলো যে, ‘উৎপাদিকা শক্তি’ যথেষ্ট বিকশিত না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে কোন নতুন পরিবর্তনের চাপ তৈরি করা যাবে না। এই সময়ে অর্থনৈতিক দক্ষতাবৃদ্ধিকে প্রধান গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ ধরনের শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান তৈরি করতে হবে। এটাই লিউ ও তাঁর সহযোগীদের লাইন ছিলো। অন্যদিকে এর বিপরীতে বাম গোঁড়ামি বা উগ্রপন্থা দেখা যায়। যারা ঐ মুহূর্তেই ব্যক্তি মালিকানার সব চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কমিউনগুলোতে কাজ অনুযায়ী মজুরি প্রদানকেও তারা বাধা দিচ্ছিলেন। তাদের লাইন ছিলো সকল ব্যক্তিগত জমি ও চাষাবাদ তখনই বন্ধ করে দিতে হবে। কোন প্রস্তুতির বিষয় তাদের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা না করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, সামাজিকভাবে অপদস্ত করা এমনকি শারীরিক আক্রমণের ঘটনা তারা ঘটাতে থাকেন।

সাংহাইতে আয়রন এ্যান্ড স্টীল ইনস্টিটিউট মাসের পর মাস অচল থাকে এই ধরনের তৎপরতার জন্য। কয়েক মাস পর উগ্র বামপন্থী নেতাকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের পরই আবার তা চালু হয়। ঐ নেতা ওখানকার শ্রমিক ছিলেন না, ছিলেন বুদ্ধিজীবী।।

(চলবে…)