Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প (প্রথম পর্ব)

বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প (প্রথম পর্ব)

হায়দার আকবর খান রনো

Dis 4ভারতের মোদী সরকার সে দেশের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিষয়টি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী প্রয়াত আবদুল কালামও এই প্রকল্পের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এই আন্তঃনদী প্রকল্প এক বিশাল মহাপ্রকল্প। এক অর্থে তাকে দানবীয় প্রকল্পও বলা যায়। কেন মহান না বলে দানবীয় বলছি, তা নিচে ব্যাখ্যা করা হবে। এই প্রকল্পের মূল বিষয়টি হচ্ছে, উত্তরপূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও উত্তর ভারতের গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সুদূর দক্ষিণাত্যে এবং পশ্চিমে রাজস্থানে। এ এক উদ্ভট ও অদ্ভূত প্রকল্প।

আধুনিক পরিবেশ সচেতন বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতিকে কাজে লাগানো দরকার মানুষের কল্যাণে। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে ধ্বংস করা হবে মানব জাতির জন্যই অমঙ্গলকর। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে উত্তরের পানি দক্ষিণে টেনে নেয়ার এবং পূর্বের পানি পশ্চিমে সরানোর যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তা যেমন উদ্ভট, তেমনি প্রকৃতি বিরোধী। প্রকৃতিকে নিয়ে মারাত্মক খেলা খেলতে গেলে তার পরিণতিও হবে মারাত্মক। ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প তেমনি একটি মারাত্মক প্রকল্প।

এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো এই যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ পানিশূন্য হবে এবং মরুভূমির দেশে পরিণত হবে। এই প্রকল্প নিয়ে ভারতের জনগণের অভিমতটা কি তা এখনো জানা যায়নি। তবে ভারতের একার ব্যাপার এটি নয়। এই প্রকল্প গ্রহণ করার আগে অবশ্যই অবশ্যই বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করতে হবে এবং বাংলাদেশের অনুমতি নিতে হবে। কারণ ব্রহ্মপুত্র ও অন্যান্য যে সকল নদীর পানি সরিয়ে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে নেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেই ব্রহ্মপুত্র ও অন্যান্য নদী বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে বঙ্গোপাসাগরে পড়েছে। এছাড়া এ সবগুলোই আন্তর্জাতিক নদী। তাই ভাটির দেশ বাংলাদেশের সাথে কোনো সমঝোতায় না এসে একক সিদ্ধান্তে ভারত এই কাজ করতে পারে না। শুধু নৈতিক দিক নয়, আন্তর্জাতিক আইনের দিক বিবেচনা করলেও ভারত তা করতে পারে না। এই নিবন্ধে () ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মূল দিকসমূহ () বাংলাদেশে তার ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব () আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়টি এবং () করণীয় সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা হবে।

ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মূল দিকসমূহ

আগেই বলা হয়েছে যে, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই দুই বড় নদী ও তাদের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা খাল দ্বারা সংযোগ করে এদিককার পানি ওদিকে নেয়ার এক বিশালকার প্রকল্প হচ্ছে নদী সংযোগ প্রকল্প। এই ভাবে ৩৭টি নদীকে ৩০টি খাল দ্বারা সংযোগ করা হবে। খালগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২ হাজার কিলোমিটার। গড়ে একেকটি খাল চারশ কিলোমিটার লম্বা। খালগুলো হবে ৫০ থেকে ১০০ মিটার চওড়া। গভীরতা ছয় মিটার। অর্থাৎ একেকটি খাল যেন একেকটা নদী। বলাই বাহুল্য, এতে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ধ্বংস হবে। যাই হোক, সেটা ভারতের ব্যাপার। তবে সেক্ষেত্রেও ভারতের জনগণের মতামত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এতো বড় প্রকল্পের মৌল বিষয়টি হলো ব্রহ্মপুত্রের নদীর পানি গঙ্গাতে এনে ফেলা এবং তারপর গঙ্গার বর্ধিত পানি পশ্চিমে রাজস্থানের মরু অঞ্চলে এবং দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাওয়া। ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গায় পানি সরাতে হলে দুটি বড় খাল খনন করতে হবে। তাহলো () মানসসংকোষতিস্তা সংযোগ খাল ও () যোগীঘোপাতিস্তাগঙ্গা সংযোগ খাল। এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রহ্মপুত্র নদ গঙ্গা নদীর চেয়ে নিচু দিয়ে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গঙ্গার পাড়ের উচ্চতা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রের পানিকে পাচটি ধাপের মাধ্যমে একশত মিটার উচ্চতায় তুলে তারপর গঙ্গায় ফেলা হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির বিরাট বাহাদুরী। কিন্তু আমাদের যাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে, তারা ভারতের প্রকৌশলীদের এতো সব কাণ্ডকারখানা দেখে মোটেও মুগ্ধ হচ্ছি না। কারণ এই সবই আমাদের মরণফাদ। এ যেন রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা নাটকের সেই রাক্ষুসে বাধ।

ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা ও পরে তিস্তা থেকে ফারাক্কা বাধের উজানে পানি আনা হবে। পাঠক ভুলেও ভাববেন না যে, ফারাক্কা বাধের উজানের অতিরিক্ত পানির ছিটেফোটা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। না, ভারতের সরকার বাংলাদেশের প্রতি এতোটা উদার এখনো হয়নি। ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণ রেখা ও মহা নদীর সাথে সংযোগ করা হবে।

উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্নাটক রাজ্যে এই বর্ধিত পানি যাবে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী ও ভাইগাই নদী সংযোগের মাধ্যমে। এই ভাবে আসাম থেকে পানি নিয়ে যাওয়া হবে দক্ষিণ ভারতে।

প্রকল্পের অন্য একটি অংশে গঙ্গা নদীর কয়েকটি উপনদী যথা গণ্ডক, ঘাগরা, সারদা ও যমুনা যুক্ত করা হবে এবং যমুনা থেকে খাল কেটে পানি সুদূর রাজস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। পাঠক, এখানেও কিন্তু উত্তরপূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্রের অবদান আছে। কারণ গঙ্গা নদী থেকে যে পানি পশ্চিম ভারতে সরানো হবে, তা পূরণ করা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের পানি দ্বারা। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র দুটোই বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে সাগরে পড়ছে। অতএব এই দুই নদীর পানির উপর আমাদেরও অধিকার আছে। কিন্তু বৃহৎ শক্তি হওয়ার মুখে যে ভারত রাষ্ট্র, তা বাংলাদেশের অধিকারকে গায়ের জোরে গ্রাহ্যের মধ্যেই নিচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধও বটে।

ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আরেকটি অংশ হলো একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সাবরমতি নদীর পানি দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই প্রকল্পে খাল খননের পাশাপাশি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেই পানিকে কোথাও কোথাও নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক গতির বিপরীত দিকে জোর করে প্রবাহিত করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে বাধ, ব্যারাজ ও জলাধার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও করা হবে। তাতে যদি ভারতের জনগণের কল্যাণ হয়, আমাদের নিশ্চয়ই আপত্তি নেই। কিন্তু তা যদি বাংলাদেশকে পানিশূন্য ও মরু অঞ্চলে পরিণতি করে, তাহলে অবশ্যই আমাদের যে তীব্র বিরোধিতা থাকবে তা বলাই বাহুল্য। এবার দেখা যাক, ভারতের এই মহা প্রকল্প কিভাবে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে।

বাংলাদেশে ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাত্রিক দেশ। বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ নদীবাহিত পলি মাটি দিয়ে গড়া। তাই এতো উর্বর বাংলাদেশের মাটি। সুজলাসুফলা বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে (তা যাতে বাস্তবায়িত না হয় সে জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে) বাংলাদেশ মরু দেশে পরিণত হবে। এর চেয়ে খারাপ আর কি হতে পারে আমাদের দেশের জন্য। বাংলাদেশে আছে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। তার মধ্যে ৫৪টি এসেছে ভারতের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে। ভারত প্রায় সবকয়টি নদীতেই বাধ দিয়েছে অবশ্যই অবৈধভাবে। এ জন্য ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে। তার ক্ষতিকর প্রভাব এখনই পড়তে শুরু করেছে। বাকি যেটুকু আছে তাও পানিশূন্য করার ষড়যন্ত্র হলো ওই সর্বনাশা ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প।

বাংলাদেশে পানির ক্ষেত্রে নদী প্রবাহের অবদান ৭৬.৫ শতাংশ, বৃষ্টিপাত ২৩ শতাংশ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অবদান ১.৫ শতাংশ। নদী প্রবাহের ক্ষেত্রে তিনটি নদীর অবদান ৯০ শতাংশ। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনা। ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি তো আগেই সরানো হয়েছে যার বিষময় প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই পড়েছে দক্ষিণ বাংলায়। গজলডোবায় বাধ তৈরি করে তিস্তার পানিও সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের অনেক নদী শুকিয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় এখন কেবলই ধুধু বালু। আমাদের পানি প্রবাহের প্রধান অংশ যে ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদী যমুনা, সেটাও মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প দ্বারা।

বাংলাদেশের পানি যদি উজানে আগেই টেনে নেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাবে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাবে। নলকূপের মাধ্যমে আমরা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করি প্রধানত কৃষি কাজে, সেচের জন্য যা ধান চাষের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। তাছাড়া খাবারের পানিও সরবরাহ হয়। এ কারণে পাতাল পানি গড়ে প্রতি বছর ৫ মিটার নিচে নেমে যায়। বৃষ্টিপাতের ফলে এক মিটার রিচার্জ হয়। বর্ষাকালে বন্যার কারণে নিচু জমি ও জলাভূমি প্লাবিত হওয়ায় ৪ মিটার রিচার্জ হয়। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা আর হবে না। এই ভাবে পাতাল পানি ৮ মিটারের বেশি নিচে নেমে গেলে নলকূপে আর পানি উঠবে না। সেচের পানি ও খাবারের পানির অভাব হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই রকম পরিস্থিতিতে মরু প্রক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

একটা কথা বলা হয় যে, বাংলাদেশে নাকি পানির অপচয় হয়। প্রচুর পরিমাণ পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। যারা এমন কথা বলেন, তারা চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন। কারণ নদীতে প্রচুর পানি থাকলেই নদী প্রবাহের জোর থাকবে, যা সাগরের জোয়ারের নোনা পানিকে উপরে উঠে আসতে বাধা দেয়। ইতোমধ্যেই ফারাক্কা বাধের কারণে দক্ষিণ বাংলায় জোয়ারের পানি অনেক বেশি ভেতরে প্রবেশ করছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। যদি কোনোভাবে (এমন দুর্ভাগ্য যেন না ঘটে) ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সিলেট পর্যন্ত চলে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের অন্যান্য আরও ক্ষতিকর দিক আছে। মোটা দাগে বড় দিকগুলোই আলোচিত হলো।।

(চলবে…)