Home » বিশেষ নিবন্ধ » বিদেশী হত্যা :: সরকারই তালগোল পাকাচ্ছে

বিদেশী হত্যা :: সরকারই তালগোল পাকাচ্ছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis 3এই বছরই পর পর চারজন ব্লগার হত্যাকারীদের এখনো পর্যন্ত চিহ্নিত ও ধরা সম্ভব হয়নি। তার মধ্যে একজন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুর হত্যাকারীকে রক্তমাখা চাপাতিসহ হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন দুজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি। তারপরও পুলিশ, গোয়েন্দা তদন্ত শেষ করে উঠতে পারেনি। তবে এটা স্পষ্ট যে, ব্লগার হত্যাকারীদের সাথে জড়িত রয়েছে মৌলবাদী জঙ্গীরা।

সম্প্রতি দু’জন বিদেশী নাগরিকও নিহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখে ঢাকায় কূটনৈতিক পাড়ায়, যেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা থাকার কথা সেখানেই নিহত হয়েছেন বাংলাদেশে কর্মরত ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লা। তার কয়েকদিনের মাথায় বাংলাদেশে কৃষি গবেষণায় কর্মরত কুনিও হোশী নিহত হলেন একই রকম। তার দু’দিন বাদে ঈশ্বরদীতে বাঙ্গালী খ্রিস্টান পাদ্রীকে হত্যার প্রচেষ্টা নিয়েছিল কয়েকজন দুর্বৃত্ত। তাকে গলা কেটে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। খ্রিস্টান যাজক লুক সরকারকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। পড়ে ধরা পড়ার ভয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এ সবই প্রাথমিক দৃষ্টিতে মনে হয় যেন একই সূত্রে বাধা। মৌলবাদী জঙ্গীদের কাজ।

সরকার কিন্তু দু’জন বিদেশী নাগরিকের ক্ষেত্রে জঙ্গী মৌলবাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছেন। কেন, কি ভিত্তিতে তা আমাদের বোধগম্য নয়। ঢাকার পুলিশ কমিশনার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, ইতালীয় নাগরিক হত্যার সাথে মৌলবাদী জঙ্গীরা সংশ্লিষ্ট নয়। তিনি আরও বলেছেন, যারা পাশ্চাত্যের দেশের নাগরিকদের জীবন নিরাপদ দেখাতে চায় না, তারাই এই কাজ করেছে। সে জন্য তদন্তে সময় লাগবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সুষ্ঠু তদন্তে কিছুটা সময় লাগতেই পারে। কিন্তু তিনি এতো দ্রুত কি করে এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, এটা জঙ্গী মৌলবাদের কাজ নয়? কারণ বোধ হয় এই যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলে দিয়েছেন এটা বিএনপির কাজ। সরকারের কর্মকর্তারাও বলতে শুরু করেছেন, এটা লন্ডনে বসে মা ও ছেলের কাজ। অতএব এটাই এখন সরকারী বা সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। পুলিশকে তো সেটাই বলতে হবে। কোন তদন্ত ছাড়াই এমন গুরুতর অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তোলা মারাত্মক ইঙ্গিত বহন করছে। সম্ভবত সেই মা ও ছেলেকে হুকুমের আসামি করা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে ‘হুকুমের আসামি’ কথাটা খুব বেশি শোনা যাচ্ছে এবং তার অপপ্রয়োগও হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। যদি সুষ্ঠু তদন্তে যথেষ্ট প্রমাণ সহকারে দেখানো যায় যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুন্ন করতেই এই কাজ করেছে, তাহলে তাদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চয়ই আমরা চাইবো। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই কোনো রকম তদন্ত ছাড়া কারোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ কিভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এবং পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা সম্ভব হলো?

আসলে পুলিশও রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। নিরপেক্ষ তদন্তও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। আর নিরপেক্ষতা হারিয়ে তারা পেশাদারী দক্ষতাও হারিয়েছে।

জঙ্গী প্রশ্নে সরকার প্রথম থেকে তালগোল পাকিয়ে আসছেন। কখনো বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গী নেই। সম্ভবত বিদেশীদের খুশি করার জন্য। আবার কখনো বা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি জঙ্গীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। অবশ্যই বিএনপির সঙ্গী হচ্ছে জামায়াত। তারাও মৌলবাদী। তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। কারো কারোর ফাসি হয়েছে। জঙ্গী মৌলবাদ ইতোমধ্যেও অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করেছে। হতে পারে সরাসরি আইএসএর কোন শাখা নেই। কিন্তু একই মতাদর্শের একই ধরনের সন্ত্রাসী গ্রুপ তো আছেই। জামায়াত নিয়েও প্রশ্ন আছে। গণতান্ত্রিক মহল থেকে বার বার দাবি ওঠা সত্ত্বেও সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। হতে পারে এটাও একটা রাজনৈতিক কৌশল।

কিন্তু পুলিশ তো রাজনৈতিক কৌশল নিতে পারে না। তারা কিভাবে সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতো একই ভাষায় কথা বলেন? তাতে আর যাই হোক, তদন্তও সুষ্ঠু হয় না। আইনের শাসনও থাকে না।

বিদেশী নাগরিকদের হত্যার ঘটনার আগেই নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল। তখন রাষ্ট্রের উচ্চ মহল থেকে বলা হলো এটাও ষড়যন্ত্র। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যার সাথে জড়িত আছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস। কথার জন্য লাইসেন্স বা করের প্রথা এখনো চালু হয়নি। তবে বাজে কথা, বিশেষ করে কারোর জন্য মানহানিকর কথা বলা হলে শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু সেটাও ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাই তারা যখন যাকে খুশি ষড়যন্ত্রকারী বা হুকুমের আসামি বানাতে পারে। কিন্তু তা জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে না। বিদেশীরাও তাতে আশ্বস্ত হবেন না।

বস্তুত সরকারই উল্টোপাল্টা কথা বলে, পুলিশের নিরপেক্ষ তদেন্ত হস্তক্ষেপ করে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। এতে শুধু সরকারের নয়, দেশেরই ক্ষতি হবে। দেশের ভালো মন্দ নিয়ে কি সরকার ভাবে?