Home » আন্তর্জাতিক » ভারত সরকারকে ইরোম শর্মিলা

ভারত সরকারকে ইরোম শর্মিলা

চরম দমনপীড়নকারী আইন বদলান’

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

Last 3অনড় তিনি। ‘আয়রন লেডি’ ভেঙ্গে পড়বেন না। বরং আরো জোরালোভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। যারা তাকে ভাঙ্গার চেষ্টা করছে, তিনিই তাদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার সংগ্রাম করছেন। যে কানুনের দোহাই দিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই নিয়ম দিয়েই তিনি সেটা কাটাবার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

তার সেই অবস্থান সম্প্রতি আবারো দেখা গেল দিল্লির একটা আদালতে। যে বিতর্কিত আর্মড ফোর্সেস (স্পেশাল পাওয়ার্স) অ্যাক্ট (এএফএসপিএ) বাতিলের জন্য তিনি আন্দোলনে নেমেছিলেন, দিল্লির আদালতে উপস্থিত হয়ে সেই দাবি আবারো উপস্থাপন করলেন তিনি।

তার নাম ইরোম শর্মিলা চানু। ৪২ বছর বয়স্ক মনিপুরের অধিকারকর্মী। এএফএসপিএ বাতিলের দাবিতে শর্মিলা প্রায় ১৫ বছর ধরে অনশন করে আছেন। নাকে লাগানো টিউব দিয়ে খাবার গ্রহণ করেন। সাধারণত একটি চাদর জড়িয়ে থাকেন। এই সাদামাটা অবয়বই তাকে মুক্তিকামী মানুষের প্রতীকে পরিণত করেছে। ভারতের প্রান্তিক রাজ্যগুলোর মানুষ যে দুর্বিসহ জীবনযাপন করে, যে ভয়াবহ বৈষম্য, নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়, তিনি সেটাই সবার মাঝে তুলে ধরছেন।

মনিপুরে নিজের বাড়ির কাছে একটি বাসস্টপেজে সেনাবাহিনীর হাতে ১০ ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা দেখার পর বদলে যান তিনি। ঘটনাটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভয়াবহ আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টএর আওতায় ঘটানো হয়েছিল। ভারতের উত্তরপূর্বের বড় অংশ ও কাশ্মিরে এ আইন বলবৎ রয়েছে। এ আইনের ক্ষমতাবলে ওই অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুসন্ধান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে প্রবেশ ও দেখামাত্র গুলি করতে পারে। এ আইনটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই আইন বাতিলের দাবিতেই তিনি আন্দোলন করছেন। তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যাচেষ্টা করার মামলা হয়েছে। ওই মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য তাকে আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে শর্মিলা বলেন, পুলিশ তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে, তাকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে।

তিনি দিল্লির মেট্টোপলিটান ম্যাজিট্রেট আকাশ জৈনকে বলেন, তিনি ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর যন্তরমন্তরে অনশনে বসেছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাকে বলপ্রয়োগ করে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।

তিনি জানান, ‘এটা ঠিক যে, আমি ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর দিল্লির জন্তরমন্তরে অনশনে বসেছিলাম। তবে আমি অনশন করছি ২০০০ সাল থেকে। এটা আমার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করেনি, আমি কখনো মেডিক্যাল চেকআপ নিতে অস্বীকার করিনি।’

তিনি বলেন, ‘আমি এএফএসপিএ বাতিল কিংবা মনিপুর থেকে প্রত্যাহারের দাবি করছি, কারণ এটা মনিপুরের সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। হাজার হাজার নির্দোষ মানুষ নিহত হয়েছে, শত শত মনিপুরী নারী ধর্ষিতা হয়েছে। এএফএসপিএ’ থাবার কারণে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।’ তিনি আদালতে বলেন, তিনি এএফএসপিএ’ বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন। তার আন্দোলনের কারণে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে নজর কাড়ছে। তিনি এর আগে আদালতে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন, তিনি মুখে খেতে খুবই আগ্রহী। আইনটি বাতিল করা হবে, এমন আশ্বাস দিলে তিনি এখনই অনশন ভেঙ্গে ফেলতে রাজি। তিনি বলেন, ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের মানুষ ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

তিনি জানান, তিনি কখনো আত্মহত্যা করতে চাননি। তিনি স্রেফ এএফএসপিএ’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

দোষী সাব্যস্ত হলে ইরোম শর্মিলার সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদহবে। মনিপুরে দায়ের করা অন্য একটি মামলায় তিনি বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে পরিচিত ইরোম শর্মিলা এর আগে আদালতে জানিয়েছিলেন, তিনি অহিংস প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

এ কথা তিনি আগেও বলেছেন। আদালতও অনেক সময় তার বক্তব্য সমর্থন করেছে। ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে আনা আত্মহত্যা চেষ্টার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মনিপুরের সেসন জজ বলেছিলেন, ইরোম শর্মিলা ‘আইনসম্মত উপায়ে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য’ সংগ্রাম করছেন। রায়ের পর আইনজীবী খাইদেম মানি বলেছিলেন, ‘আমরা আদালতে যুক্তি দিয়েছিলাম যে অনশন ধর্মঘট অবৈধ বা অসাংবিধানিক নয়। এমনকি মহাত্মা গান্ধী যখন ন্যায়সঙ্গত কারণে অনশন করেছেন, তখনো ব্রিটিশরা সেটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেনি।’ তবে ভারতীয় প্রশাসন তাকে ছেড়ে দেয়নি। আবারো তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে আটকে রেখেছে। আর তিনিও আন্দোলন ছেড়ে দিচ্ছে না।

২০০০ সালের নভেম্বর থেকে শর্মিলা অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। তারপর থেকে পুলিশি হেফাজতে নাকে নল লাগিয়ে জোর করে তরল খাবার খাওয়ানো হয়। মাঝে ২ অক্টোবর ২০০৬ গান্ধির জন্মদিন উপলক্ষে মুক্তি পেয়ে গোপনে দিল্লি গিয়ে ‘জন্তরমন্তর’এর পাদদেশে অনশন শুরু করেন। পুলিশ তাকে আবার গ্রেফতার করে তাদের হেফাজতে হাসপাতালে ভর্তি করে। মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল কিংবা ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যেখানেই তাকে রাখা হোক না কেন, তার স্থান হয় বিশেষ নিরাপত্তা ওয়ার্ডে নিঃসঙ্গভাবে। কেউ দেখা করতে এলে কঠোর নিরাপত্তা নজরদারির মধ্যে সুযোগ দেওয়া হয়। যে অপরাধে তাকে আটক রাখা হয়েছে, তাতে পুলিশ সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য তাকে গ্রেফতার করতে পারে। তিনি তার বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টিকারী অনশন ভাঙ্গতে অস্বীকার করার প্রেক্ষাপটে তাকে ওই সময় প্রতি মাসেই গ্রেফতার করা হয়। তার আটকাদেশ বাড়ানোর জন্য প্রতি ১৫ দিন পর পর তাকে আদালতে হাজির করা হয়। অর্থাৎ আইনটিকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে।

ইরোম শর্মিলা চানু দাবি করেছিলেন, মনিপুরে নিজের বাড়ির কাছে একটি বাসস্টপেজে সেনাবাহিনীর হাতে ১০ ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। এ ঘটনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভয়াবহ ‘আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট’এর আওতায় ঘটানো হয়েছিল। ভারতের উত্তরপূর্বের বড় অংশ ও কাশ্মিরে এ আইন বলবৎ রয়েছে। এ আইনের ক্ষমতাবলে ওই অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুসন্ধান, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে প্রবেশ ও দেখামাত্র গুলি করতে পারে। এ আইনটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ডিসেম্বরে ভারতীয় সরকার বলেছিল, আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকে অপরাধের আওতামুক্ত করা হবে। তবে ওই আইন এখনো পাস হয়নি।

পৃথিবীর কোনো দেশেই অনশন আন্দোলনকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে অভিহিত করা হয় না। এমনকি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থাগুলোও একে আত্মহত্যা চেষ্টা নয় বলে অভিহিত করেছে। ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনকে ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশেন সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘অনশন ধর্মঘট আত্মহত্যার মতো নয়। অনশন ধর্মঘটকারী ব্যক্তি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তা করে থাকে, তবে সাধারণভাবে তার আশা ও ইচ্ছা থাকে বেঁচে থাকার।’ অনশন ধর্মঘট প্রশ্নে পাল্টা ঘোষণায় ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এই যুক্তি মেনে নিয়েছে।

তাকে আবার গ্রেফতার করে মূলত আদালতের রায়ের প্রতিই অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে ভারতীয় পুলিশ। অবশ্য ভারতীয় পুলিশের কাছ থেকে এমনটাই আশা করা যায়। কাশ্মির, আসাম, মনিপুর, মেঘালয় প্রভৃতি সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আছে অনেক দিন ধরেই। ব্রিটিশদের বিদায়ের প্রাক্কালে সেখানকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসব রাজ্যকে ভারতভুক্ত করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই তারা তা মেনে নিতে পারেনি। তাই চলছে ত্রাস সৃষ্টির অব্যাহত চেষ্টা। ভারতীয় মিডিয়াও তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে। ভারতের মনিপুর রাজ্যের মানবাধিকারকর্মী ইরোম শর্মিলা চানুকে ফের গ্রেফতার করা হয়েছে। কোনো অপরাধ না করেও ওই সময় পর্যন্ত ১৪ বছর ধরে অনশনে থাকা ‘মনিপুরের আয়রন লেডি’ শর্মিলা এবার মুক্তি পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু না। ভারতে কংগ্রেস কিংবা বিজেপি, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সবার নীতিই এক। শাসকদের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বললে নিস্তার নেই। অনশন করার মতো সম্পূর্ণ অহিংস আন্দোলনও করা যাবে না। এরপর দফায় দফায় তিনি গ্রেফতার হচ্ছেন।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি বলেছে, শর্মিলাকে আটক করার ঘটনাটি অযৌক্তিক, যা ভারতের ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়াকে উপহাস করার শামিল।

রাজনৈতিক ক্রুসেডার এবং নাগরিক অধিকার কর্মী ছাড়াও শর্মিলা কবিও। তিনি তার কবিতাসংগ্রহ ‘ফ্রাগরেন্স অব পিস’ প্রকাশ করেছেন ২০১০ সালে। এতে তার ১২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কবিতাগুলো তার মাতৃভাষা মেইতেইলনে লেখা হয়েছিল। তার কবিতায় আবেগ, প্রতিবাদ আর আশার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তিনি ২০০৭ সালে মানবাধিকারের জন্য গৌয়াঞ্জু পুরস্কার এবং ২০১০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।।