Home » অর্থনীতি » মধ্য-আয়ের লক্ষ্য :: যেতে হবে অনেক দূর

মধ্য-আয়ের লক্ষ্য :: যেতে হবে অনেক দূর

ফাহমিদা খাতুন

Last 1বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশকে স্বল্প আয় থেকে নিম্নমধ্য আয়ের শ্রেণীতে উন্নীত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশ ২০০০এর দশকে দৃঢ় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, মাথাপিছু আয় অনেক বাড়িয়েছে। ১৯৭০এর দশকের মাত্র ২.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১০এর দশকে হয় ৬ শতাংশ, মাথাপিছু আয় ১৯৭৩ সালে যেখানে ছিল মাত্র ৯০ ডলার, ২০১৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১,৩১৪ ডলার।

একটি আধুনিক অর্থনীতির প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশটি ঐতিহ্যগত কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে শিল্প ও সেবা খাতে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটিয়েছে। আমদানি, রফতানি, প্রবাসীআয়, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের ব্যাপক বৃদ্ধি দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন ঘটেছে। অর্থনীতির ৬০ ভাগেরও বেশি বৈশ্বিকব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো অনেক সমস্যার মধ্যেও বাংলাদেশের অনুকূল নীতিগত পরিবেশ এবং নীতিমালার চলমানতা দেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। ১৯৮০এর দশকে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ’স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রামসের’ আওতায় বাজারমুখী অর্থনীতি গ্রহণ করার পর বাংলাদেশ বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এসবের মধ্যে ছিল কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারিকরণ, অর্থ খাতকে উদার করা, আমদানি কোটা প্রত্যাহার।

উদারিকরণপ্রক্রিয়া ১৯৯০এর দশকে সুসংহত হয়, ২০০০এর দশকে তা আরো বেগবান হয়। বাংলাদেশী মুদ্রা টাকা কারেন্ট একাউন্টে রূপান্তরযোগ্য করা হয়। ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অনুমোদন করার লক্ষ্যে পরিবর্তনশীল বিনিময় হার, আমদানি কর ব্যাপকভাবে কমানো, বিদেশী মূলধনের স্থানান্তর এবং সুদহারের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হয়। বৈশ্বিক নীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশে উচ্চতর প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) এবং অভিবাসী শ্রমিকদের প্রবাসীআয় (রেমিটেন্স) টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। এটা বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটায়।

আরএমজি আয় ও চাকরির (বিশেষ করে নারীদের জন্য) প্রধান উৎস হিসেবে খাতটি দারিদ্র বিমোচনেও অবদান রাখে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অংশগ্রহণের ফলে বিপুল প্রবাসীআয় সম্ভব হয়, যা উচ্চতর জাতীয় সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখে।

দেশের উচ্চতর আয় শ্রেণীতে অবস্থান করার মর্যাদাটি বৈশ্বিক ঋণবাজার থেকে বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগসহ আরো অনেক সুযোগ থাকার সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দেয়।

সামনে চলতে হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। আর সেজন্য পর্যাপ্ত সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশকে আরো প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চতর আয়ের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশী ঋণ পরিশোধের তহবিল, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উন্নয়ন তহবিল সংগ্রহের সামর্থ্য অবশ্যই অর্জন করতে হবে।

বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে, ‘মধ্য আয়ের ফাঁদ’ এড়িয়ে যেতে হবে। এটা নির্ভর করছে বাংলাদেশে কিভাবে সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ সংগঠিত হচ্ছে তার ওপর। সাম্প্রতিক ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি (যার কারণে বাংলাদেশ ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে) সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি হার ‘নতুন স্বাভাবিক’এ পরিণত হয়েছে, হারটির প্রয়োজন অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন সাধন। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক সুশাসন বিকাশের লক্ষ্যে জনপ্রশাসনে সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই তার দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়।

ভবিষ্যত প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা নির্ভর করছে আরো বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার দেশের সামর্থ্যরে ওপর। ২০০০এর দশকে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল পরিমিত মাত্রায়। অধিকন্তু, প্রধানত অপরিমেয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি খাতে বিনিয়োগের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এই বিনিয়োগ। অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগপরিবহন ও জ্বালানির মতো খাতেপ্রয়োজন। মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত বিকাশ, উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়ন বিকশিত করার জন্যও বিনিয়োগ দরকার। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে এসব খাত উন্নত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আরএমজি খাতের উৎপাদনশীলতা চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে এখন কেবল প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দিলে চলবে না, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য প্রবৃদ্ধির গুণগত মানও রক্ষা করতে হবে। এটাই নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশ তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে তার বিনিয়োগ গতিশীল করতে পারবে কি না, রফতানিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারবে কি না, সবার জন্য মানসম্পন্ন চাকরি সৃষ্টির মাধ্যমে বৈষম্য দূর করতে পারবে কি না।।

লেখক : সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিবি), বাংলাদেশের গবেষণা পরিচালক।

(ইস্ট এশিয়া ফোরাম এর সৌজন্যে)