Home » অর্থনীতি » শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (পঞ্চম পর্ব)

শিক্ষা ও শ্রেণী সম্পর্ক (পঞ্চম পর্ব)

ইংলিশ মিডিয়াম থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা

হায়দার আকবর খান রনো

Last 5এমন আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যদিও জনগণকে ধোকা দেবার জন্য সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ আছে। আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই প্রকটভাবে শ্রেণী বৈষম্যের দিকটি প্রতিফলিত। উপরন্তু এই শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে আদর্শহীন, পশ্চাৎমুখী ও প্রতিক্রিয়াশীল। শিক্ষা এখন জ্ঞান চর্চার বিষয় নয়। এটি হচ্ছে এখন পণ্য মাত্র, বাণিজ্যিক বস্তু (Product)। ১৯৯০ সালে এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য যে দশ দফা দাবী পেশ করেছিল তাতে নিম্নোক্ত দাবীটিও ছিল।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারী, বেসরকারী, ব্যক্তিমালিকানাধীন, গ্রাম শহরসহ সকল বৈষম্য (ক্যাডেট কলেজ, কিন্ডার গার্টেন, রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল, প্রি ক্যাডেট, টিউটোরিয়াল হোম, মাদ্রাসা ইত্যাদি) দূর করে সারা দেশে অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচীর ভিত্তিতে একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা (One Channel of Education) চালু করতে হবে।”

এই কর্মসূচীর প্রতি তখন বিএনপিআওয়ামী লীগ উভয়ই সমর্থন জানিয়েছিল, যারা পরবর্তীতে একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু তখনকার দেয়া প্রতিশ্রুতি তারা ভুলে গেছেন। একমুখী শিক্ষানীতি তো নেই, বরং শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণী বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ১৯৯০ পরবর্তী সময়েই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, প্রাইভেটাইজেশন এবং শিক্ষার ব্যয় বহুল পরিমাণে বেড়েছে।

শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার পার্থক্য ঘুচিয়ে গোটা শিক্ষাকে জাতিয়করণ করা হোক। সমগ্র দেশে একই মানের এই ধরনের পাঠ্যসূচীর ভিত্তিতে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে শিক্ষা চালু করা হোক। শিক্ষক সমাজের এই দাবী সংবিধানে বর্ণিত সমাজতন্ত্রের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ।

হায়রে সমাজতন্ত্র! নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা ও সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া, তাদের রাষ্ট্র ও সরকারের কাছ থেকে কি বৈষম্যহীন শিক্ষা আশা করা যায়?

উচ্চবিত্তের সন্তানরা পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে। এ লেভেল, ও লেভেলে যারা পড়ে, তারা সত্যিকারের জ্ঞানার্জন কতটা করে, সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভাষা সম্পর্কে চরমভাবে অজ্ঞ থাকে। আরও বেদনাদায়ক এই যে, এই অজ্ঞতা নিয়ে তাদের কোন লজ্জাবোধও নেই। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উচু বেতনের চাকুরীই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই ধরনের তথাকথিত অভিজাত স্কুল মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় না, বরং নিম্ন রুচি ও সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। তবু শ্রেণী বিভক্ত সমাজে এরাই সবচেয়ে সুবিধাভোগী।

খুব মোটা দাগে ধরলে বাংলাদেশে তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এর মধ্যে উপবিভাগও আছে। () সাধারণ শিক্ষা সাধারণ স্কুলে (সরকারী বা এমপিওভুক্ত বেসরকারী) বা কলেজে (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন) যা পড়ানো হয়। এখানে পড়ে মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা। () ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষা যার অনেকগুলিই আমাদের জাতীয় শিক্ষা কোর্সের অন্তর্ভুক্ত নয়। ও লেভেল, এ লেভেল ইত্যাদি। এখানে পড়ে ধনী ঘরের সন্তানরা। () মাদ্রাসা শিক্ষা এখানে পড়ে একেবারে গরিব ঘরের সন্তানরা।

সাধারণ শিক্ষাও এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাজেটে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায়, ন্যায় সঙ্গত চাহিদার তুলনায়, মিলিটারী পুলিশ ও প্রশাসন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। সাধারণ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ও স্কুলের ক্ষেত্রেও বৈষম্য আছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমি যখন ম্যাট্টিক পরীক্ষা দিই, ১৯৫৮ সালে, তখন ফ্রার্স্ট, সেকেন্ড ইত্যাদি হতো সাধারণ অখ্যাত কোন গ্রামের স্কুল থেকে। এখন এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করে মাত্র কয়েকটি শহরের নামকরা স্কুল। মনে হয় যেন, এখন প্রতিভাবান সন্তানরা সকলেই শহুরে ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করছে। আসলে সাধারণ শিক্ষাও হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। যে অভিভাবক ভালো ও বিশেষ ধরনের কোচিং এর ব্যবস্থা করতে পারবে এবং প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারবে, তার ছেলে বা মেয়ের রেজাল্ট ভালো হবে। সাধারণ স্কুল বা কলেজের শিক্ষার মানও নিচে নেমে এসেছে। শিক্ষা সামগ্রী ও শিক্ষকের অভাব। এবং শিক্ষকের বেতনও যথেষ্ট কম। ১৯৯২ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সরকারীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও শিক্ষা সামগ্রির নিদারুণ অভাব, শিক্ষকদের কম বেতন ইত্যাদি সরকারের চরম অমনোযোগিতারই দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। গত বৎসর ঢাকা শহরেই একটা প্রাথমিক স্কুলের জায়গা জোর করে দখল করেছিল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, তাও আবার পুলিশের সহায়তায়। বহুক্ষেত্রে সরকার ব্রাক প্রমুখ এনজিও’র উপর ছেড়ে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার দায়দায়িত্ব। একে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই বলে। এই ধরনের বড় বড় এনজিও এখন নতুন ধরনের কর্পোরেট পুঁজি ও মহাজনী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাদের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার ভার পড়লে, সে শিক্ষার হাল যে কি হবে তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

সাধারণ স্কুলের মধ্যেও শ্রেণী বিভাজন আছে। সরকারী ও বেসরকারী স্কুল, এমপিও ভুক্ত এবং তার বাইরের স্কুল। তাছাড়াও আছে সরকারী ক্যাডেট স্কুল, অনেকটা ইংল্যান্ডের গ্রামার স্কুল অথবা ইটন, হ্যারো ধরনের অভিজাত স্কুল। আমরা দেখেছি, সোভিয়েত দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভক্তিকরণ হয় না। কারণ, অতো কম বয়সে মেধার পার্থক্যকীকরণের দ্বারা জাতিভেদ তৈরী করা অবৈজ্ঞানিক। সবর্দলীয় ছাত্র ঐক্য সঠিকভাবেই এই ধরনের পার্থক্যকীকরণের বিরোধীতা করেছে।

উচ্চবিত্তের সন্তানরা পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে। এ লেভেল, ও লেভেলে যারা পড়ে, তারা সত্যিকারের জ্ঞানার্জন কতটা করে সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভাষা সম্পর্কে চরমভাবে অজ্ঞ থাকে। আরও বেদনাদায়ক এই যে, এই অজ্ঞতা নিয়ে তাদের কোন লজ্জাবোধও নেই। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উচু বেতনের চাকুরীই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই ধরনের তথাকথিত অভিজাত স্কুল মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায় না, বরং নিম্ন রুচি ও সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে। তবু শ্রেণী বিভক্ত সমাজে এরাই সবচেয়ে সুবিধাভোগী।

মাদ্রাসায় পড়ে গরিব ছাত্ররা। তার মধ্যে কউমী মাদ্রাসায় পড়ে একেবারে নিঃস্ব ঘরের সন্তানরা। বলা হয় ধর্ম শিক্ষার জন্য মাদ্রাসার প্রয়োজন আছে। যে সকল ধনীরা নাম কেনার জন্য অথবা ভোট পাবার জন্য গ্রামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে অথবা মাদ্রাসায় দান খয়রাত করে, তাদের ছেলেমেয়েরা কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ে না। মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য দারুণ উৎসাহী মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের নেতাদের সন্তানরাও মাদ্রাসায় পড়ে না। তার মানে কি ধনীর সন্তানদের অথবা মৌলবাদী নেতাদের সন্তানদের ধর্ম শিক্ষার প্রয়োজন নেই? এর জবাবে তারা বলবেন, “আমরা ইংরেজী শিক্ষা বা আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি বাড়িতে মৌলভী রেখে ধর্ম শিক্ষা দিচ্ছি।” তাহলে সেটা কেন গরিবদের জন্য প্রযোজ্য হবে না? তারাও তো স্কুলে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ধর্ম শিক্ষা পাঠ করতে পারেন (যেহেতু বাসায় মৌলভী সাহেব রেখে পড়ানোর অর্থ তাদের নেই)। কেন তারা মাদ্রাসা শিক্ষার নামে বাংলা ইংরেজী সাহিত্য (আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে ইংরেজীকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত), গণিত, প্রকৃতি বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদি জ্ঞানবিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত হবে? মাদ্রাসার উচ্চতর ডিগ্রী নিলেও তারা সাধারণ জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকবে এবং ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানী এই রকম বড় কিছু হতে পারবে না। বুর্জোয়া অর্থে যদি বড় চাকুরীর কথাও ধরি, তাও পাবে না।

মাদ্রাসা শিক্ষায় নৈতিকতার শিক্ষাও হয় না। বরং হেফাজতইসলাম এর প্রধান শফি আহমদের মতো চরম নারী বিদ্বেষী লোকরা যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) সেখানে মাদ্রাসায় কি ধরনের পশ্চাৎপদ, প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষা ছোট ছোট ছেলেদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সেইজন্য অনেক মাদ্রাসা এখন ধর্মীয় জঙ্গীবাদের কারখানায় পরিণত হয়েছে। অনেকে বলেন মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ করা হোক। স্বাধীনতা পরবর্তী সকল শিক্ষা কমিশন প্রায় একই রকম কথা বলেছে। কিন্তু আমি বলবো অন্য কথা। তার চেয়ে বরং মাদ্রাসা শিক্ষা (এবং পাশাপাশি ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা) বাতিল করে একই কোর্সভুক্ত সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা করা হোক, (যা সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দাবী) এবং পাশাপাশি ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নিজ নিজ ধর্ম হিসাবে ধর্ম শিক্ষা (কেউ না চাইলে তাকে বাধ্য করা হবে না) রাখা হোক। সেটাই কি অধিক যুক্তিসঙ্গত নয়?

২০১৩ সালে নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা প্রদানকালে সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ গত শতাব্দীর বিশের দশকের কয়েকজন খ্যাতনামা মুসলমান ব্যক্তিত্বের (যথা, খান বাহাদুর নাসিরুদ্দিন আহমদ, মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রধান নেতা আবুল হুসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমদ) বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, তাঁরা সকলেই মাদ্রাসা শিক্ষার অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গে আলোচনা দীর্ঘায়িত না করে অর্ধ শতাব্দীরও আগে মহান শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ যা বলেছিলেন সেটাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, “সাবেক প্রথার বাংলাদেশে এখনও তিনটি শিক্ষাপ্রণালী আছে এবং তাহা সরকারের অনুমোদিত নিউ স্কীম মাদ্রাসা, ওল্ড স্কীম মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা। ইহা শিক্ষা ক্ষেত্রে শুধু গগোলই সৃষ্টি করিয়াছে এবং মুসলিম সমাজে অনৈক্য আনয়ন করিয়াছে। ….. আযাদ পাকিস্তানে ইহাদের অস্তিত্ব নিষ্প্রয়োজন, বরং হাস্যকর এবং লজ্জাকরও বটে। পৃথিবীর কোনও সভ্যদেশে সরকার একাধিক শিক্ষাপ্রণালী কখনও মঞ্জুর করেন না।” (“সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার আমাদের সমস্যা” শীর্ষক প্রবন্ধ, ১৯৫৯ সাল)।

(চলবে…)