Home » অর্থনীতি » আরেকদফা ধাক্কার মুখোমুখি অর্থনীতি

আরেকদফা ধাক্কার মুখোমুখি অর্থনীতি

এম. জাকির হোসেন খান

Dis-4বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০১৫ এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এর একটি কারণ হতে পারে, প্রতিযোগী দেশগুলোর আরো বেশি খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে বাংলাদেশ এগিয়ে এসেছে’। কারণ এতই প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ১৬টি সমস্যার মধ্যে প্রধান সমস্যা (৯৬%) দুর্নীতি তথা রাজনীতিবিদদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে। একইসাথে ক্ষমতাসীনদের বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করায় বিনিয়োগও বাড়ছে না বলে জানানো হয়। উল্লেখ্য, এর আগে বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) হালনাগাদ তথ্য নিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই দেখানো হয়েছে ১৫৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার বা প্রায় ৫ শতাংশ কম। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে দেশে ১৬০ কোটি ডলার নিট এফডিআই এসেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে গত বছর ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে এমনকি সহিংসতায় নাকাল এবং গোলযোগপূর্ণ পাকিস্তানে এফডিআই বাড়লেও বাংলাদেশে কেন তা বাড়ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী বছর দেশে এফডিআই বাড়বে’। অথচ সত্য হলো, ২০১৫ এর প্রথম প্রায় ৬ মাস রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করায় সে সময় প্রায় নতুন বিনিয়োগশূণ্য ছিলো দেশ। আর সেপ্টেম্বর মাসের পর সাম্প্রতিক সময়ে দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষ তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে ব্যবসা এবং বিনিয়োগে আরেকটি বড় ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে, তা পরিস্থিতি দেখেই আচ করা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে ২০১২ সাল থেকে একের পর এক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার যে চলমান অবস্থা তা নিরিখে দেশের অর্থনীতি কি এবার ঘুরে দাড়াতে পারবে?

পোষাক শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন একজন গার্মেন্টস মালিক বলেন,‘আমার প্রতিষ্ঠানে ৬ অক্টোবর বায়ার আসার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশি দুই নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ওই বায়ার তার সফর পিছিয়েছেন। তিনি আগামী ২৫ অক্টোবর পরবর্তী সফরের কথা জানিয়েছেন। শুধু আমি নই, আমার মতো অনেক পোশাক কারখানায় যেসব বায়ার অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আসার জন্য সময় নির্ধারণ করেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই সফর পিছিয়েছেন”। একের পর এক ধাক্কার অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে রপ্তানিতে। আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন প্রায় আশিভাগ অবদান রাখা দেশের পোশাক শিল্পের এবং এর সাথে জড়িত প্রায় ১ কোটি লোকের জীবিকা। উল্লেখ্য, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডে পর বিভিন্ন দেশের সতর্কতা জারির পর ক্রেতা আসা কমে গেছে পোশাক শিল্পের। গত কয়েক বছরে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস, ওয়েজবোর্ড নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ, জিএসপি সুবিধা স্থগিত, অ্যাকর্ডঅ্যালায়েন্স দ্বারা ত্রুটিপূর্ণ কারখানা বন্ধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিতিরতা ও হরতালঅবরোধ কারণে পোশাক খাত বড় ধরনের ধকলের শিকার হয়। বেশ কয়েকটি দেশ সতর্কতাও জারি করে। বিজিএমইএ সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘পরপর দুজন বিদেশী নাগরিক হত্যা অনেক উদ্বেগের বিষয়। এ হত্যাকাণ্ডের ফলে পোশাক শিল্পের বিদেশী ক্রেতারা তাদের নির্ধারিত সফর, বৈঠক বাতিল ও স্থগিত করা শুরু করেছে। যেসব দেশে আমাদের নতুন মার্কেট তৈরি হয়েছে, সেসব মার্কেটের জন্য সমস্যাটা বেশি। কেননা, দেশের এমন পরিস্থিতিতে তারা পিছু হটবে। ল্যাটিন আমেরিকাসহ বেশকিছু অঞ্চলে আমাদের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সমস্যাটা বেশি হতে পারে’। এর আগে ৫ অক্টোবর বিজিএমইএর সঙ্গে বায়ার্স ফোরামের মাসিক বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা ইস্যুতে তা স্থগিত করা হয়। বায়ার্স ফোরাম ২ বিদেশী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমানে অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে বৈঠক করা নিরাপদ নয়।

এ পরিস্থিতিকে বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘বায়ার্স ফোরামের বৈঠক স্থগিত হওয়া একটা অশনি সঙ্কেত। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারও পোশাক শিল্প সংকটের দিকে যাবে; যা পোশাক শিল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ। বায়ারদের অর্ডার দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। কিন্তু এ সময়ই তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটা আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য ভাল লক্ষণ নয়। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধিও কমবে’। এ পরিস্থিতিতে এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, সস্তা শ্রমের কারণে জীবনের নিরাপত্তাহীনতা নিয়েই বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাবে। এর আগে রানা প্লাজা ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে, যা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করে। এর মধ্যে দেশে সন্ত্রাসবাদের বিস্তারের ঝুকি পোষাক শিল্পের জন্য ইমেজ সংকট তথা মরার ওপর খড়ার ঘা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতিতে সুযোগ নিবে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভারত, মিয়ানমান এবং ভিয়েতনাম।

গত সপ্তাহে একটি কারখানার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসতে ব্রিটিশ এক ক্রেতার আসার কথা ছিল। ইতালীয় নাগরিক হত্যার পর ওই ক্রেতা আর আসেননি। চলতি সপ্তাহেই আরেকটি কারখানায় ডেনমার্কের একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আসার কথা ছিল। তারাও আসবেন না’ বলে জানায় বিজিএমইএ’র একজন কর্মকর্তা। এ প্রেক্ষিতে ডিসিসিআই এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘এ ধরনের ঘটনায় তৈরী পোশাকসহ অন্য খাতের অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশী হত্যার এ ঘটনা যাতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং রপ্তানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে’।

প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত ভাষণে সন্ত্রাসবাদেও বিরুদ্ধে যুদ্ধের দাবি করলেও গত সেপ্টেম্বও মাসে পাশ্চাত্যেও বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে জঙ্গী বা সন্ত্রাসী আক্রমণের আশংকা প্রকাশ করছে। তবে ক্ষমতাসীনরা এটাকে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখে এবং দেশে কোন আইএস জঙ্গী নেই বলে দাবি করছে। এমনকি তদন্ত শুরুর আগেই মূল উদ্বেগকে আমলে না নিয়ে বরাবরের মতো বিদেশি হত্যাকাণ্ডকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বলে দাবি করছে। আর এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাশ্চাত্য কিছু রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র হিসেবে দাবি করছেন।

দেশে বিনিয়োগের ঘাটতিতে দেশের বেকার সমস্যা বাড়লেও সেদিকে নজর না দিয়ে বা বিনিয়োগ পরিবেশকে উন্নত না করে ক্ষমতাসীনরা দিন কাটাচ্ছে। অথচ সম্ভাবনার বাংলাদেশকে পশ্চাতে ফেলে কম সম্ভাবনার দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তিউনিশিয়া, মিয়ানমারে ব্যাপকহারে আসছে বিদেশি বিনিয়োগ। বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষকরে লন্ডন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যে কোটি কোটি টাকা খরচ রোড শো করলেও তার কোনো ফল তো দেখা যায়নি, অথচ রাষ্ট্রের অর্থের শুধুই অপচয় হয়েছে।

বিমান বন্দর থেকে বিনিয়োাগ বোর্ড, তিতাস থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর, জমি থেকে পানি প্রাপ্তি সর্বত্রই আইনি মারপ্যাঁচ, আমলাতান্ত্রিক ফাঁদ আর মাঝে মাঝে রাজনৈতিক অস্থিরতা রুদ্ধ করছে বিদেশি বিনিয়োাগকারীদের পথ’এ প্রেক্ষিতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), কেআরআই ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, মিৎসুবিশি ইউএফজে রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটিং এবং মুডি হামাদা অ্যান্ড মাৎসুমুটু বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সমস্যা নিয়ে ২০১৪ এর এপ্রিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩টি বাধা চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, এসব সমস্যা দূর করা না হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রথম বিদেশি কারখানা ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও সিইও এবং চট্টগ্রামের কোরিয়ান ইপিজেডের মালিক কিহাক সাং জানান, ‘কোরিয়ান ইপিজেডের পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে তাঁর ১০ বছর ঘুরতে হয়েছে। যখন আমি ভিয়েতনামে যাই তখন ৯৫ শতাংশ সময় উৎপাদনে নজর দেওয়ার পেছনে ব্যয় করতে পারি, আর বাংলাদেশে সম্ভবত ব্যয় করতে পারি ২০ শতাংশ। বাকি সময় আমাকে সরকার সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করতে হয়। অথচ পাঁচছয় বছর আগেও ভিয়েতনাম খুব কঠিন জায়গা ছিল। আমাদের ক্রেতারা ভিয়েতনামের বদলে বাংলাদেশকে পছন্দ করতেন। সত্যি বলছি, তাঁরা এখন বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামকে পছন্দ করছেন’। প্রশ্ন হলো ভিয়েতনাম অসম্ভবকে সম্ভব করলো বাংলাদেশ কেন পারলো না? ২০১৫ এর বিনিয়োগের পরিমাণ কম হলে ২০১৬ সালেও তার সার্বিক দায় বিরোধী রাজনৈতিক দল বা উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ওপর চাপিয়ে অধিক দায়ের ঋণে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, এটা নিশ্চিত। অথচ এই মুহূর্তে আস্ফালন নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য এবং সমঝোতার। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা হাটছে ঠিক এর বিপরীতে। আর এর ফলে অর্থনীতিসহ পুরো দেশ এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে।