Home » অর্থনীতি » কোনো আলোচনা ছাড়াই বাধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত

কোনো আলোচনা ছাড়াই বাধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত

হায়দার আকবর খান রনো

Dis-3গত সপ্তাহে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের কি ভয়ংকর সর্বনাশ হতে পারে, তার একটি বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। এখানে খুবই সংক্ষেপে ভয়ানক ক্ষতির দিকগুলো পুনরায় উল্লেখ করা হচ্ছে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ যদি সত্যি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বাংলাদেশের উপর তার যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে সেগুলো নিম্নরূপ। তবে কায়মনবাক্যে কামনা করি তা যেন বাস্তবায়িত না হয়।

১। ভারত উজানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধ কুমার, করতোয়া ও মহানন্দা থেকে পানি প্রত্যাহার করলে এই সকল নদী এবং শাখা নদী অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিই বদলে যাবে। শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ মরু প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশংকা আছে।

২। নদীতে যতোটুকু ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত পানি থাকবে দিনে দু’বার জোয়ারে, তা সমুদ্রের জোয়ারের পানিকে বাধা দিতে পারবে না। ফলে জোয়ারের লবণাক্ত পানি উত্তরের দিকে উঠে আসবে, এমনকি সিলেট পর্যন্তও আসবে। এতে মিষ্টি পানির অভাব দেখা দেবে। চাষের ও খাবারের পানির অভাব ঘটবে। এতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। মিষ্টি পানির মাছও মারা যাবে। মৎস্যজীবীরা বেকার হবে। মাছেভাতে বাঙ্গালির পরিচয় মুছে যাবে।

৩। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে। রিচার্জ হবে না। তাতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

৪। যেটুকু ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যাবে নলকূপের মাধ্যমে, তাতেও আর্সেনিকের পরিমাণ খুব বেশি হবে। ফলে খাবার অযোগ্য হয়ে উঠবে।

৫। নদীবাহিত পলি দ্বারা যে নতুন ভূখণ্ড তৈরি হচ্ছে (বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এই ভাবেই গঠিত হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে), সেই ভূমি গঠন বন্ধ হবে। এক কথায় সবুজ বাংলাদেশ মরুদেশে পরিণত হবে।

৬। নদী পথ সঙ্কুচিত হবে। ইতোমধ্যেই প্রধানত ফারাক্কা বাধ ও তিস্তার উজানে বাধের কারণে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ২৪শতে (অর্থাৎ দশমাংশে) নেমে এসেছে।

এ কথা প্রায়ই বলা হয় যে, বাংলাদেশের নাকি অতো পানির প্রয়োজন নেই। কারণ বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে নদীর পানি সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। অতএব এটা নাকি পানির অপচয়। আসলে অপচয় নয়, বরং প্রয়োজন। বিপুল পরিমাণ পানির বিপুল প্রবাহ থাকে বলেই তো জোয়ারের সময় সাগরের লবণাক্ততা উপরে উঠে আসতে পারে না। এই সাধারণ ঘটনাটি যারা জানেন না অথবা জানলেও ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্ব দিতে চান না, তারাই এমন খোড়া যুক্তি দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ভারতের বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক বেশি পানি রয়েছে।

ভারতে পানির প্রাপ্যতা ও প্রয়োজন সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থিত করেছেন জাতিসংঘের সাবেক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস এ খান। অবশ্য তিনি মনগড়া তথ্য দেননি। তিনি ভারতেরই আরেক পানি বিশেষজ্ঞের দেয়া তথ্য পরিবেশন করেছেন মাত্র। সেই সূত্রটি হচ্ছে Water Perspectives, Issues and Concerns – by Ramaswamy R. Iyer, SAGE Publications, New Delhi.

এবার সেই তথ্যের ভেতরে প্রবেশ করা যাক। লেখক দেখাচ্ছেন ভারতের মোট পানির প্রাপ্যতা হচ্ছে ৬৩৭৩ বিসিএম। এর মধ্যে নদীর পানি ১৯৫৩ বিসিএম, বৃষ্টি ও বরফগলা পানির ৪০০০ হাজার বিসিএম এবং পাতাল পানি (রিচার্জযোগ্য) ৪২০ বিসিএম।

এখন দেখা যাচ্ছে, ভারতের জনগণ ও সরকারের পানির প্রয়োজন কতো। সেচ কাজের জন্য ৬৭৭ বিসিএম, খাওয়া ও গৃহস্থালী কাজের জন্য ৬৭ বিসিএম, শিল্প কলকারখানার জন্য ২৮ বিসিএম, পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৮ বিসিএম। তার সাথে যদি পানির অপচয় হিসাবে ১২০ বিসিএম যোগ করা হয় তাহলে সর্বমোট পানির প্রয়োজন ৯০০ বিসিএম’এর বেশি হবে না কোনোভাবেই।

তাহলে ভারতেরই বিশেষজ্ঞ প্রদত্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি যে, ভারতে যে পানি সম্পদ আছে তার মাত্র ১৫ শতাংশই সেচ, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাবারের জন্য কাজে লাগে। অন্যভাবে ভারতের যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন, তার সাত গুণ বেশি পানির প্রাপ্যতা রয়েছে। তাই জাতিসংঘের সাবেক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস এ খান যথার্থই বলেছেন, ‘ভারত তাদের দেশে প্রাপ্য পানির সামান্য অংশ অর্থাৎ ১৫ শতাংশ ব্যবহার করলে ভারত থেকে আসা ৫৪টি নদীর একটিতেও বাধ এবং ব্যারেজ দিয়ে উজানে পানি সরাবার ভারতের কোনো প্রয়োজন নেই’।

গঙ্গা ও তিস্তার অভিজ্ঞতা : অথচ বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত প্রায় সকল নদীতেই উজানে ভারতে বাধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তাও আবার বাংলাদেশের সাথে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই, যা তারা আইন সঙ্গতভাবে করতে পারে না।

আমরা এখানে সবকটি নদী নিয়ে আলোচনা করছি না। গঙ্গা ও তিস্তার অভিজ্ঞতাটুকুই যথেষ্ট হতে পারে।

ভারতপাকিস্তানের মধ্যে শত্রুতামূলক সম্পর্ক থাকলেও সিন্ধু অববাহিকায় নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে যা এখনো কার্যকর আছে। কিন্তু গঙ্গার পানি চুক্তি হয়নি। ফারাক্কা বাধ তৈরি যখন হয় তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। তার আগেও ভারত সরকার পাকিস্তান সরকারের সাথে আলোচনা করেনি। পাকিস্তান সরকারও তৎকালীন পূর্ব অংশের বা আজকের বাংলাদেশের পানি সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশাতেই ১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ফারাক্কা বাধের পরীক্ষামূলক একটি এডহক চুক্তি হয়। মাত্র ৪১ দিনের জন্য বাংলাদেশ ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু এরপরেও ভারত অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহার করতে থাকে। তখনি মওলানা ভাসানী তার ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ করে জনগণকে নদীর পানির ব্যাপারে সচেতন করে তোলেন। ১৯৭৭ সালে আবার দুই দেশের মধ্যে ৫ বছরের জন্য চুক্তি হয়। ৫ বছর অতিক্রান্ত হলে ভারত কোন রকম চুক্তি ছাড়াই গঙ্গার পানি উজানে সরাতে আরম্ভ করে। পদ্মা শুকিয়ে যায় শুষ্ক মৌসুমে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি করে। বস্তুতঃ ফারাক্কার প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। সেই সকল নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্দরবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট ক্ষতির পরিমাণ বিপুল।

তিস্তা নদীর ক্ষেত্রেও ভারত একইভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশীসুলভ সদ্ভাব ও সদাচরণের নীতি লঙ্ঘন করে বৃহৎ শক্তির দম্ভ দেখিয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের অংশ হিসাবে ভারত সরকার ইতোমধ্যেই উজানে ভারতের গজলডোবায় বাধ দিয়ে তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তিস্তা নদীর ১৮০ কিলোমিটার ভারতে এবং ১৩০ কিলোমিটার বাংলাদেশে পড়েছে। তিস্তার অববাহিকা অঞ্চলের (২২,৫০০ বর্গ কিলোমিটার) ৩৬ শতাংশ ভারতে পড়েছে। ৬৪ শতাংশ বাংলাদেশে। তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখে ভারত তিস্তার পানি সরাতে পারে না। কিন্তু অতীতে গঙ্গার ক্ষেত্রে যা করেছে, এখন তিস্তার ক্ষেত্রেও তাই করছে। চীন ব্রহ্মপুত্রে বাধ দিচ্ছে বলে ভারত হৈ চৈ করে। কিন্তু ভারত নিজে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ করে বসে আছে। তিস্তায় বাধের কারণে তিস্তার পানি দ্বারা পুষ্ট অন্যান্য নদীর পানিও শুকিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যে তিস্তা সেচ প্রকল্প করেছিল (যার সকল উপাত্ত ভারত সরকারকে দেয়া হয়েছিল), তা শেষ হয়ে গেল। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা শুধু ধু ধু বালি। এর অর্থনৈতিক, ভূপ্রকৃতিগত ও সামাজিক যে ক্ষয়ক্ষতি তার পরিমাণ কতো তা বিশেষজ্ঞরা হিসেব করবেন। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ বুঝেছি, এর পরিমাণটি বিশাল। বন্ধুদেশ ভারত বাংলাদেশের এতো বড় সর্বনাশ করতে পারে তা ভাবতেও অবাক হচ্ছি।

(চলবে…)