Home » রাজনীতি » দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন :: আ’লীগই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন :: আ’লীগই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে

আমীর খসরু

Dis-2এই প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবস্তর অর্থাৎ ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে ও দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতোদিন দলের সমর্থন প্রবল এবং প্রচণ্ড থাকলেও, নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হতো দলীয় পরিচয়ের বাইরে অর্থাৎ নির্দলীয় ভিত্তিতে। গত ১২ অক্টোবর খুবই তাড়াহুড়ো করে মন্ত্রীসভার বৈঠকে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরেই দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনের অনুমোদন দেয়া হয়। তাড়াহুড়াটা এমন যে, পৌরসভা নির্বাচনের জন্য আগামী সংসদ অধিবেশনে আইন পাস পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, অধ্যাদেশ জারি করা হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের অধীনে অতীতে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবগুলো নির্বাচনের নজির খুবই ন্যাক্কারজনক এবং একই সাথে ভীতিকরও। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, ভোটারবিহীন, একদলীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের যেমন ধারণা ও অভিজ্ঞতা আছে, তেমনি উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ অন্যান্য যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এই সরকারের অধীনে, সে সম্পর্কেও আমরা তিক্ত অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ। ভোটারবিহীন নজির সৃষ্টিকারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাচ দফায় ৪৫৮টি উপজেলায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করেছিল। এই নির্বাচনটিতেও দলীয় বাহিনীর সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহারসহ নৈরাজ্যপূর্ণ, তাণ্ডবের এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় কিছুসংখ্যক মানুষ স্বাভাবিক কারণেই ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে কি ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তাও বোধকরি সবারই মনে আছে। জাতীয় নির্বাচনটি যে সত্যিকার অর্থেই একেবারেই সৃষ্টি ছাড়া খারাপ উদাহরণ সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল, তা আবারও বদ্ধমূলভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয় উপজেলা নির্বাচন। পরবর্তীকালের সিটি করপোরেশন নির্বাচন সমূহ আবারও প্রমাণ করে যে, এই সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন তো সম্ভবই নয়, এটা চিন্তা করাও সমীচীন হবে না। কারণ অবাধ, সুষ্ঠু, সব দলের অংশগ্রহণে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান করা আইনি বিধানসম্মত ও গণতান্ত্রিক চর্চার অন্তর্ভূক্ত ক্ষমতাসীনদের চিন্তায়, চেতনা, মনোজগতসহ সামগ্রিক সংস্কৃতিতে এই বিষয়টি আদৌ প্রবাহমান ও ক্রিয়াশীল নয়।

ক্ষমতাসীনরা ন্যায্য ও অবাধ নির্বাচনকে তাদের জন্য একটি বাড়তি ঝামেলা ও বিড়ম্বনার বিষয় বলেই মনে করে এমনটা বিভিন্ন নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে। সরকার এই কারণেই দলীয় ভিত্তিতে ও প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথটি বেছে নিয়েছে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন ও প্রতীক ব্যবহার করলে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের যেসব পূর্বশর্তগুলো থাকে অর্থাৎ প্রার্থীর যোগ্যতা, দল এবং প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণাবলী সর্বোপরি জনপ্রিয়তার তার আর কোনো প্রয়োজন হবে না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বার বার উদাহরণ দেয়া হচ্ছে, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বহু দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তাহলে প্রশ্ন উত্থাপন জরুরি যে, . যুক্তরাজ্য, ভারতসহ ওই সমস্ত দেশগুলোতে ৫ জানুয়ারির মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন, ভোটারবিহীন, একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কিনা বা এমন উদাহরণ তাদের যুগযুগান্তরের রাজনৈতিক ইতিহাসে রয়েছে কিনা? . ওই সব দেশে বিরোধী দল ধ্বংস ও বিনাশ করে একদলীয় শাসন ও এককের সীমাহীন ক্ষমতা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার নজির রয়েছে কিনা? . স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার আদৌ হস্তক্ষেপ করে কিনা? . এমন নির্বাচন কমিশন ওই সমস্ত দেশে আছে কিনা? . যেসব দেশের কথা বলা হয়েছে সে সব দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ পুরো প্রশাসন এমন পক্ষপাত দোষেদুষ্ট কিনা? . ওই সব দেশে বিরোধী পক্ষের কেউ জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ী হলে তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলামোকদ্দমা দিয়ে, গ্রেফতার করে বরখাস্ত করার নজির রয়েছে কিনা? জবাব যদি হ্যা হয়, তাহলে দেশবাসী সবাই সরকারের সাথে স্বহমত পোষণ করতে রাজি আছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেও ক্ষমতাসীনরা বলেছিল, ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির পশ্চিমী দুনিয়াসহ বহু দেশে রয়েছে। তবে বাংলাদেশের নজির তারা ওই সময়ই দেখেছেন।

পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেবে এমন একটি মত রয়েছে দলের মধ্যে। ওই অংশের মতে ভবিষ্যতের যেকোনো নির্বাচনেই তারা অংশগ্রহণ করবেন, বয়কট করবেন না। এটা যথাথ ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। যদি ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের সময়ে রণেভঙ্গ দিয়ে চলে না গিয়ে তারা মাঠে থাকতেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতেন তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো।

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পক্ষে একটি ইতিবাচক হাওয়া থাকলেও, মামলামোকদ্দমা, হয়রানি, নির্যাতন, গ্রেফতারসহ নানা আতংক বিরাজ করছে। অনেক গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীও নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। তাছাড়া বহু নেতাকর্মী হয় জেলে রয়েছেন, না হয় মামলা মাথায় নিয়ে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে পালিয়ে এলাকা ছাড়া অথবা স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের সাথে আপোষরফা করে নিশ্চুপ। বিএনপির জন্য দাপটের সাথে নির্বাচন অনুষ্ঠান তো দূরের কথা, প্রার্থী খুজে পাওয়াই সমস্যা হয়ে দাড়াবে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীনরা সীমাহীন লাভবান হবে এমনটাই তারা ধারণা করছে। কিন্তু বাস্তবে বিএনপিসহ বিরোধী দল যতোটা না ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে। কারণ এমনিতেই ক্ষমতাসীন দল হিসেবে তাদের মধ্যেকার বড় ধরনের অন্তদ্বর্ন্দ্ব বিদ্যমান। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনে এটি আরও প্রকট এবং ভয়াবহ রূপ নেবে। দলের বর্তমানে বিদ্যমান থাকা নানা উপদলীয় সংঘাত, সহিংসতা, কোন্দল ব্যাপকতর হবে। আর এতে দলের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সক্রিয়তা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও জটিলতা আরও ব্যাপকতর ও প্রকট হবে। কারণ ক্ষমতাসীনদের আগ্রহী প্রার্থীরা মনে করছেন, দলীয় মনোনয়ন পেলেই তিনিই নিশ্চিতভাবে নির্বাচিত হবেন। কাজেই পদপদবী আর ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে তা হাতছাড়া করার এমন মানসিকতা অধিকাংশেই দেখাবেএটা ভাবা ঠিক হবে না। কোনো উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেও এটা কার্যকর হবে তা ভাবাও উচিত হবেনা। কাজেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ববিবাদ বিস্তৃত হবে ব্যাপকতর হারে। তারা এক দলে থাকলেও আরও অনৈক্য, আরো দ্বন্দবিবাদ, সংঘাত ভবিষ্যতে তাদের পিছু ধাওয়া করবে।

এ কথাটি মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং এ থেকে সৃষ্ট চরম শূন্যতার সময়ে এক দলই সর্বোময় ক্ষমতার অধিকারী ও সর্বেসর্বা থাকে। সব কিছু নির্ধারিত হয় এক, একক এবং একপক্ষের মাধ্যমেই। সেখানে অন্য দলের সাথে প্রতিযোগিতা নেই, কারণ তাদের কোনো প্রতিপক্ষই নেই। দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান তাই দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এসব কারণে চরম মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করার সাথে সাথে দেশের রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও সংকটকে যেমন প্রকটতর করবে। তেমনি এটি প্রলম্বিতও হবে। রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও চরম শূন্যতা ক্ষমতাসীনদের সংঘাত, বিবাদকে নিয়ে যাবে চরম থেকে চরমতম পর্যায়ে।