Home » অর্থনীতি » দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব, বলছে আইএমএফ

দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব, বলছে আইএমএফ

আসিফ হাসান

Last-2ইরানি প্রপাগান্ডা মেশিনের খবর নয়, খোদ আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) আশঙ্কা। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, সৌদি রাজতন্ত্র যেভাবে চলছে, তাতে আমূল পরিবর্তন না আনা হলে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যাবে তারা। আন্তর্জাতিক ঋণদান সংস্থা আইএমএফএর উদ্ধৃতি দিয়ে রিজিওন্যাল ইকোনমিক আউটলুক ফর দি মিডল ইস্ট জানিয়েছে, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের জিপিপিতে বাজেট ঘাটতি হবে ২১.৬ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা দাঁড়াবে ১৯.৪ শতাংশে। এই ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। আর অক্টোবরের প্রথম দিকে আইএমএফ তার ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভে’তে বলেছে, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের ‘জেনারেল গভার্নমেন্ট ওভারঅল ফিসক্যাল ব্যালেন্স’ হবে মাইনাস ২১.৫ ভাগ, ২০১৬ সালে ১৯.৪ শতাংশ নেগেটিভ ব্যালেন্স, যা ২০১৪ সালের মাত্র .৪ শতাংশ থেকে বিপুল বৃদ্ধি।

এতে বলা হয়েছে, তেলের দাম এখনকার মতো কম থাকলে এবং সেই সঙ্গে সৌদি আরব তার বর্তমানের অর্থনৈতিকনীতি অব্যাহত রাখলে দেশটি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাবে। বর্তমানে দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ ৬৫৪.৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সেটাও খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

আল জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, সৌদি অ্যারাবিয়ান মনিটারি এজেন্সি এর মধ্যেই বৈদেশিক আর্থিক সংস্থার পরিচালিত তহবিল থেকে ৭০ বিলিয়ন তুলে নিয়েছে। তেলের দাম সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দেশটির আয়ের ৯০ ভাগই আসে তেল থেকে। এই তেলের দামই কমছে। আইএমএফর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক মাসুদ আহমদের মতে, তেলের দাম কমায় কেবল চলতি বছরই সৌদি আরব ৩৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

আবার খরচ বাড়ছে। চলতি বচরের প্রথম দিকে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের অভিষেক অনুষ্ঠানকে আরো স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৩২ বিলিয়ন ডলার বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে সৌদি আরব এখন রাশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে ওঠে এসেছে। ২০১৫ সালে এই খাতে তাদের বাজেট ছিল ৮০.৮ বিলিয়ন ডলার। আবার ইয়েমেনে যে যুদ্ধ চলছে, সেটার ব্যয় প্রায় পুরোটাই মেটাতে হচ্ছে সৌদি আরবকে। অথচ এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

এসব জটিলতার মধ্যে সৌদ পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিবাদও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে। অনেকেই পরিবারটির মধ্যে বড় ধরনের বিদ্রোহের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এক যুবরাজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি অন্য রাজপুত্রদের বিদ্রোহে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ফলে ভেতর থেকেও বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়েছে রাজতন্ত্রটি।

ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানোর জন্য গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব বেশি বেশি তেল তুলছে। এতে তেলের দাম আরো পড়ে যাচ্ছে। আয়ের ঘাটতি পোষাতে তখন তাকে আরো বেশি তেল তুলতে হচ্ছে। আবার তেল কেবল রফতানির বিষয়ই নয়, দেশটির নিজের ব্যবহারও বাড়ছে। সেই চাহিদাও সামাল দেওয়ার জন্যও বেশি বেশি তেল তোলার দরকার হচ্ছে। এতে করে তাদের মজুত ভয়ঙ্করভাবে কমে যাচ্ছে। জার্নাল অব পেট্রোলিয়াম সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং আশঙ্কা করছে, তেল তোলা এভাবে বাড়াতে থাকলে ২০১৮ সাল নাগাদ সৌদি আরবের উৎপাদন ভয়াবহ পর্যায়ে কমে যাবে।

সৌদি আরবে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে। আয় কমা এবং ব্যয় বাড়ার কারণে দেশটি যদি খাদ্য ভর্তুকি হ্রাস করে, তবে জনগণের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হতে পারে। এখনই দেশটিতে বেকারত্ব রয়েছে ব্যাপক হারে। দেশটিতে সার্বিকভাবে বেকারের সংখ্যা প্রায় ১২ ভাগ। আবার তরুণদের মধ্যে তা ৩০ ভাগ।

এর সাথে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা। জলবায়ুর কারণে খাদ্য ও পানি নিয়ে নতুন সঙ্কটের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম পানি সঙ্কটের দেশটিতে জনপ্রতি বছরে পানি ব্যবহার করা হয় ৯৮ কিউবিক মিটার। এই পানির প্রায় ৭০ ভাগ আসে লবণমুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প। আয়ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকলে এটাও চালিয়ে রাখা সরকারের জন্য কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে সৌদি আরবের অবস্থা যে ভালো নয়, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। মিরাকলজাতীয় কিছু না ঘটলে আগামী দশকে দেশটি মারাত্মক বিপদে পড়া নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে।