Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নবতরঙ্গের সার্থক রূপকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুঁফো

নবতরঙ্গের সার্থক রূপকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুঁফো

ফ্লোরা সরকার

Last-6এই মাত্র রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেলো যে মেয়েটি, অযথা দীর্ঘ নয় কিন্তু কী সুগঠিত তার শরীর আর ঘন কালো চুল, নিখুঁত নিভাঁজ তার পোশাক, চলার ছন্দের সঙ্গে দুলে উঠছে স্কার্টের ঝুলন্ত ঝালর, মুখে আলদা হাসি নেই তবু সহাস্য মুখ, সামান্য নির্বিকল্প, কিছুটা উদাসীন। নারীত্বের প্রতীক হয়ে এই যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেলো নারীটি, কামনার চেয়ে যে বেশি কিছু এর জন্যে, এই মুহূর্ত্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি হলাম আমি’ নিজের কথা বলতে গিয়ে ফ্রাঁসোয়া ত্রুঁফো ঠিক এভাবেই দেখেছিলেন মেয়েটির সৌন্দর্য, যা কেবল একজন শিল্পীর পক্ষেই দেখা সম্ভব। শুধু দেখেই ক্ষান্ত হননি, দীর্ঘ চার মাস ধরে ভেবেছেন অজানা সেই মেয়েটিকে নিয়ে তারপর চিত্রায়ন করেছেন তার ছবিতে। কীভাবে? তার নিজের মুখেই আমরা শুনি – ‘অনতিদীর্ঘ, সুগঠিত শরীর, ঘন কালো চুল ও নিভাঁজ পোশাকের নায়িকাকে অনুসরণ করলো আমার নায়ক, পেছন থেকে চলে এলো পাশে, ফিস ফিস করে কিছু বললো মেয়েটিকে, তাতে নির্বিকার ভাবে তার দিকে তাকিয়ে তার কোটের কলার ধরে ঝাঁকুনি দিলো মেয়েটি, বলে উঠলো । কী বলবে, তা নিয়ে গত চারমাস ধরে ভেবেছি আমি, তারপর অবশেষে গত রাতে সম্ভাব্য সংলাপ লিখে দিয়েছি নায়িকার হাতে। নায়িকা বলে উঠলো, ‘ কে হে? কি ভাবো নিজেকে? কি চাই শুনি? ভাবো কি মেয়েদের? শোয়ার জন্যে ল্যা ল্যা করছে, এ্যাঁ?ডন জুয়ান ভাবছো নিজেকে? বাড়িতে আয়না নেই, না? দ্যাখো নিজের মুখটা, দ্যাখো একবার’ বলতে বলতে ছেলেটিকে টেনে একটা দোকানের কাঁচের জানালার সামনে নিয়ে আসলো নায়িকা। হাঁসফাঁস আর ছটফট করতে করতে, মেয়েটার হাত ছাড়িয়ে ভীড়ের মধ্যে পালিয়ে গেলো ছেলেটা। আমি বললাম, কাট্। দৃশ্য শেষ হলো। মন থেকে মনন, মনন থেকে ক্যামেরায় ধরা পড়লো আমার কল্পনা। যা ছিলো দিবাস্বপ্ন তা বাস্তব হলো। আমার জন্যই হলো। আমি এই ছবির পরিচালক। এইজন্যে এই মুহূর্ত্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি হলাম আমি।’ এখন আমরা বুঝতে পারছি ত্রুঁফো কেনো নিজেকে সব থেকে সুখী মনে করেছিলেন। কারণ তিনি ঐ ছবির পরিচালক। এই পরিচালক পদটিকে বড় করে তোলা হয়েছিলো বলেই সেই ‘অথিঁয়’ তত্ত্বের সূচনা হয়েছিলো। যে অথিঁয় তত্ত্বের অর্থ হলো, পরিচালকই হলেন একটি সিনেমার অথিঁয়। পরিচালক তার ব্যক্তিগত সাক্ষ্য রেখে যান বিভিন্ন ছবিতে। অন্যদিকে যে অথ্যরের সূচনা হয়েছিলো, ফরাসি নব তরঙ্গ বা নিউ ওয়েভের হাত ধরে। যে নব তরঙ্গের প্রতিনিধিরা ছিলেন পঞ্চাশের দশকে, ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত কাইয়ে দু সিনেমার সিনেমাসমালোচক বৃন্দ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলো সবে উঠে দাঁড়াবার শক্তি খুঁজছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি তাদের দরিদ্র করে তুলেছিলো। এরকম অবস্থায় সিনেমার মতো ব্যয়বহুল শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য একটা ব্যপার। কিন্তু সেই, যেকাজ ভালোবাসেতা না করে থাকতে পারেন না। সিনেমা প্রেমিরাও সিনেমা নির্মাণ না করে থাকতে পারছিলেন না। অন্যদিকে, এমন ব্যয়বহুল শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করাও বেশ দুঃসাহসিক কাজ। ফলে ইতালিতে ‘নিওরিয়ালিজম’ নামে এক বিশেষ ধারার সিনেমা নির্মাণ শুরু হলো। যেখানে, স্টুডিও, ক্যামেরা, লাইটিং, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের ব্যয় ইত্যাদি কমানো যায়। ছবি নির্মানের জন্যে তারা বের হয়ে পড়লেন স্টুডিওর বাইরে রাস্তায়, দোকানপাট বা ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্ট ইত্যাদি জায়গায় শুটিং করতে, যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলোয় শুটিং করা, প্রফেশনাল শিল্পীদের বদলে নিয়ে এলেন অ্যামেচার শিল্পীদের। সেসব পরিচালকদের কথা হলো, গল্পের গাঁথুনি যদি ঠিক থাকে, সিনেমাকে যদি বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসা যায়, হলের পর্দায় ছবির গতি যদি গতিময় থাকে, তাহলে কেনো ছবি চলবে না? সম্ভবত নিওরিয়ালিজমের এই প্রেরণা থেকেই কাইয়ে দুই সিনেমার চিত্রসমালোচকেরা উৎসাহিত হয়েছিলেন। তাছাড়া সিনেমার খরচের বিষয়টা তো ছিলোই। চিত্র সমালোচক আদ্রে বাঁজা এবং হেনরি ল্যাঙ্গইসকে সাধারণ ভাবে ফরাসি নব তরঙ্গের ছবির পুরোধা হিসেবে ধরা হলেও, ত্রুঁফোর নামটিও সেই সঙ্গে মিশে যায়। খুব অল্প বয়সেই ত্রুঁফোর সঙ্গে দেখা হয় আদ্রে বাঁজার। যিনি ত্রুঁফোকে কাইয়ে দু সিনেমা পত্রিকায় শুধু নিয়োগ দেননি, ফরাসি নব তরঙ্গ ধারার সঙ্গেও একাত্ম করে তুলেন। ত্রুঁফো বাঁজাকে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করতেন। কাইয়ে দু’ সিনেমা পত্রিকার সঙ্গে আরো কিছু চলচ্চিত্র সমালোচক যারা পরবর্তীতে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে নাম করেছিলেন, যেমন জ্যঁ লুক গোদার, এরিক রোমার, ক্লোদ শ্যাবরল, জাক রিভেতির প্রভৃতির সঙ্গে ত্রুঁফোর নামটিও ফরাসি সিনেমার নব তরঙ্গের ইতিহাসে চিরদিনের জন্যে লিখিত হয়ে যায়। যদিও ত্রুঁফো নব তরঙ্গের সার্থকতা দানের পেছনে আদ্রে বাঁজা ছাড়াও কৃতজ্ঞতা জানান আমেরিকান নির্মাতা মরিস অ্যাঞ্জেল নির্মিত ‘লিটল ফিউজিটিভ’ ছবির জন্যে, যে ছবি তাকে এই ধারার ছবি করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।

তবে এটাও ঠিক নব তরঙ্গ একেবারে পরিকল্পনা মাফিক গড়ে ওঠেনি চিত্রসমালোচক এবং তাত্ত্বিক রবার্ট কার্ডুলোকে দেয়া তার জীবনের শেষ সাক্ষাতকারে (১৯৮৪, মে) ত্রুঁফো এভাবেই কথাটা বলেছিলেন। তাছাড়া ১৯৬১ সালের আরেকটি সাক্ষাতকারে ত্রুঁফো বলেছিলেন, ‘নব তরঙ্গ বা নিউ ওয়েভ কোনো আন্দোলনও না, কোনো ঘরানাও না, এমনকি কোনো দল বা গ্রুপও না, এটা হচ্ছে একটা কোয়ালিটি বা গুন।’ আসলে, কাইয়ে দু সিনেমায় কাজ করতে করতেই এসব নির্মাতারা বুঝেছিলেন, প্রচলিত ফরাসি ছবিতে কোথায় কোথায় গলদ আছে। সরাসরি গল্প বলাকে তারা বর্জন করলেন, গল্প বা ফিকশানকে তারা প্রামান্যচিত্রের মতো করে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করলেন, শটের চেহারা বদলে নিয়ে এলেন লম্বা ট্রাকিং শটে, যেমন ১৯৬৭ সালে নির্মিত গোদারের ‘উইকেন্ড’ ছবির ট্র্যাফিক জ্যামের দৃশ্যটির কথা আমরা স্মরণ করতে পারি, মানব অস্তিত্বের অ্যাবসাডির্টিকে প্রাধান্য দিলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। চলচ্চিত্র যখন তার যাত্রাপথের মধ্যগগণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই সময়ের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে বলতে হয়, ছবিগুলির বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তারা সেই সময়ে এক যুগান্তরকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন। অন্যদিকে, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দেখলে বলতে হয়, নব তরঙ্গের ছবিগুলির আঙ্গিকগত দিকগুলো কিছুটা সেকেলে হয়ে গেছে, কিন্তু বিষয়বস্তুর দিক থেকে এখনও চির তরুণ, চির নবীন।

ত্রুঁফোর ‘ফোর হানড্রেড বেলাজ’ (১৯৫৯) শুধু একটি সার্থক নব তরঙ্গ ধারার ছবিই নয়, ছবিটা যারা একবার দেখেছেন, কখনো তারা বিস্মৃত হননি। তাছাড়া ছবির শেষ শটে যে ফ্রিজ শট ব্যবহার করা হয়, ত্রুঁফোই প্রথম নির্মাতা যিনি এর ব্যবহার প্রথম করেছিলেন। তার অন্যান্য ছবি জুলস অ্যান্ড জিম, ফারহেন হাইট ৪৫১, দ্যা ওয়াইল্ড চাইল্ড, দা সফ্ট স্কিন সহ, তার প্রায় প্রতিটি ছবি নান্দনিক এবং উৎকর্ষের দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। তবে এসব ছবি যে শুধুমাত্র নব তরঙ্গ ধারার কারণেই হয়েছে তা কিন্তু না, কারণ ত্রুঁফো, কার্ডুলোকে দেয়া একই সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘আমি এখনো মনে করি, ভালো ছবি হলো সেই বাজে ছবিগুলো, যেগুলোকে একটু ভালো করে বানানো হয়েছে।’ বিনয়ী ত্রুঁফো যাই বলুক না কেনো, আমরা তার ছবিতে সম্পর্কের দুর্দান্ত কিছু ইমেজ পাই, যেমন জুলস অ্যান্ড জিম (১৯৬১) ছবিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের, ফারহেনহাইট ৪৫১ (১৯৬৬) ছবিতে বইয়ের সঙ্গে পাঠকের, ডে ফর নাইট (১৯৭৩) ছবিতে শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর বা বাস্তবের সঙ্গে বিভ্রমের, ফোর হানড্রেড বোলজ’ এ ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক ব্যবস্থার।

চার্লি চ্যাপলিনের ‘মর্ডান টাইম্স’ এর সমালোচনা দিয়ে ত্রুঁফোর সমালোচনার লেখা শুরু হয়েছিলো। সমালোচক হিসেবে একজন তুখোড় সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সমালোচনাকে তিনি কখনো বিচারিক জায়গা থেকে দেখেননি, দেখেছেন যোগাযোগের জায়গা থেকে। ঠিক তার সিনেমার মতো দর্শকের সঙ্গে ছবির যোগাযোগ বা সংযোগের জায়গা থেকে তিনি সমালোচনাকে দেখেছেন। আর তাই অন্যান্য পরিচালকদের প্রতি ছিলো তার অসীম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর নিরপেক্ষতা। তার নিজের মুখেই শোনা যাক কিভাবে তিনি অন্যান্যদের দেখতেন – ‘ব্রেসঁ তার ছবিতে পেশাদার অভিনেতার সাহায্য নেন না, তার মতো করে তিনি সঠিক। হিচককের পিরিয়ড ফিল্ম তৈরিতে আপত্তি রয়েছে, তার মতো করে তিনি সঠিক। যে সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার লড়াই, সেই সমাজের জন্য গদার আর ছবি করতে চান না, তার মতো করে তিনি সঠিক। বুনুয়েল তার ছবিতে আর সঙ্গীতের ব্যবহার রাখছেন না, তার মতো করে তিনি সঠিক। রোজেলিনি কাহিনীহীন চিত্রনির্মাণে আসক্ত, তার মতো করে তিনি সঠিক। হাওয়ার্ড হক্স্ সবসময়ই মানুষের চোখের উচ্চতায় ক্যামেরাকে স্থাপন করেন, তার মতো করে তিনি সঠিক।’ একজন বড় মাপের মানুষের পক্ষেই এভাবে দেখা সম্ভব। গত ২১ অক্টোবর ছিলো তার মৃত্যুবার্ষিকী। খনজন্মা (০৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২ ২১ অক্টোবর, ১৯৮৪) এই মহান চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রতি রইলো আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।