Home » অর্থনীতি » বন্ধ হচ্ছে শ্রমবাজার, কমছে জনশক্তি রফতানি :: নেপালও এগিয়ে

বন্ধ হচ্ছে শ্রমবাজার, কমছে জনশক্তি রফতানি :: নেপালও এগিয়ে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Dis-5বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি ও তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থ রিজার্ভের প্রধান উৎস। সম্প্রতি কমে গেছে দেশের আয়ের প্রধান খাত জনশক্তি রফতানি। আর বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অভিবাসন ব্যয় অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়াও অনেকাংশে এর একটি কারণ। এই দুঃসময়ে এর সাথে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যর্থতা। ফলে আমাদের অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালও।

২০১১১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে কাজ শিখে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানি হয়েছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৪০২ জন। ২০১৪১৫ অর্থবছরে মাত্র ৪ লাখ ৬১ হাজার ৮২৯ জন। সেই হিসাবে ৩ বছরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি কমেছে ৩৩ শতাংশ। অপরদিকে, ২০১১১২ অর্থবছরে কাজ নিয়ে নেপাল থেকে বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৭১৬ জন। আর ২০১৪১৫ অর্থবছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১২ হাজার ৩০৫ জনে। ৩ বছরের ব্যবধানে নেপালের জনশক্তি রফতানি বেড়ে দাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে।

বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির জন্য সবচেয়ে বড় দু’টি শ্রমবাজার হচ্ছে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। অধিক অভিবাসন ব্যয় ও কূটনৈতিক ব্যর্থতায় বিশ্বের এ বড় দুটি শ্রমবাজার হাত ছাড়া হয় বাংলাদেশের। আর এই জনশক্তি রফতানিতে ধস নামার কারণেই মূলত কমে যায় এ সংখ্যা। ফলে উভয় বিষয়টিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। খরচ কমানো ও জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধির ব্যাপারে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের পর ইউএইতে জনশক্তি রফতানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দূতাবাস বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে সমস্যা সমাধান হতে পারতো। কি কারণে যে তারা তা করেনি সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের আরেকটি বড় শ্রম বাজার হলো মালয়েশিয়া। সেই মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারও আজ বন্ধের পথে।

দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানিতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঝুলে গেছে। সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কেবল আশ্বাস ছাড়া আর প্রাপ্তি নেই। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, বেশ ক’টি দেশে জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। বাস্তবে মন্ত্রণালয়ের কথার সঙ্গে জনশক্তি রফতানির বাজারের কোনো মিল নেই। বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে দফায় দফায় প্রতিনিধি দল পাঠানো ছাড়া তেমন কোন অর্জন নেই। আবার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি দল এসেও জনশক্তি নেয়ার আগ্রহের কথা কেবল শুনিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু পরে আর ওই আগ্রহ থাকছে না। এ বছর শুধু আশ্বাসে আশ্বাসেই কেটে গেছে। উল্লেখযোগ্য কর্মী নিয়োগ হয়নি কোন দেশেই। এমন এক পরিস্থিতিতে চলছে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার।

সূত্র জানায়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজনের সমন্বয়হীনতায় জনশক্তি রফতানির বাজার সৃষ্টি হচ্ছে না। মালয়েশিয়াসৌদি আরবসহ বাংলাদেশের কোন শ্রমবাজারে বর্তমানে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। মালয়েশিয়া সম্প্রতি ৫ লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিলেও সেই ঘোষণার কোন বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল কেবল দফায় দফায় বৈঠকই করে যাচ্ছে। কার্যত কোনো সুখবর নেই। ১৪ লাখের বেশি তরুণ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করে বসে আছেন। তাদের অনেকের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে যদি তারা বিদেশে চাকরি নিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে তারাও বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

সরকার বলছে, জনশক্তির বাজার তৈরি করতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। কর্মীদের বিদেশী ভাষায় পারদর্শিতা, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক এ্যাক্রিডিটেশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এ্যাফিলিয়েশন করা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার আলোকে বিদ্যমান কোর্স কারিকুলামকে নিয়মিত আপগ্রেড করা, বেসরকারী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত প্রশিক্ষণের মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখার জন্য নিয়মিতভাবে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এর সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না।

বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল মালয়েশিয়া। দেশটিতে ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত রয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে বড় এ শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। চার বছর পর ২০১২ সালের নভেম্বরে উভয় দেশের সরকারের সঙ্গে জি টু জি (সরকারীভাবে) পদ্ধতি কর্মী প্রেরণে সমঝোতা হয়। ২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে এ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার কর্মী নিয়োগ হয়েছে। জিটুজিতে ১০ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল।

গত ১০ আগস্ট মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই কোনো জনশক্তি রফতানিকারকদের কাছে টাকা না দেয়ার জন্য কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মী নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে এমনটিই বলা হচ্ছে বরাবরের মতোই। মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যারা সরকারীভাবে নিবন্ধন করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিযোগ হবে বলে সরকার বলছে। নতুন করে যারা নিবন্ধন করবেন, তারাও মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তা হলো কর্মী পাঠানোর বিষয়ে কম মূল্য নির্ধারণ করা হবে। যদিও বৈঠকে কর্মী পাঠানোর খরচ নির্ধারণ হয়নি। মালয়েশিয়ায় আগামী তিন বছরে ১৫ লাখ কর্মীর চাহিদা আছে। চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকেই দেশটি কর্মী নিয়োগ দেবে বেশি। এ জন্য আমাদের সরকারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো উন্নততর করা হচ্ছে। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলে কর্মী নিয়োগে সুবিধা হবে।

অন্যদিকে সৌদি আরবে বর্তমানে পুরুষ কর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে না। সৌদি কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার নারী কর্মী নিয়োগের জন্য গত বছর একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী তারা এ পর্যন্ত তিন হাজার নারী কর্মী নিয়েছে। বাকি ৭ হাজার কর্মী কবে নিয়োগ দেবে তার কোন সময় সীমা এখনও জানানো হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেরা এসেই কর্মীদের ইন্টারভিউ নেয় এবং সেখান থেকে তারা কর্মী নিয়োগ করে। এভাবেই চলছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে সৌদি আরব জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে গৃহস্থালী কর্মে গৃহকর্মী আর তারা নেবে না।

বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হলেও কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী নিজে কয়েকটি দেশ সফরে গিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আলাপআলোচনা করেছেন। কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় কয়েকটি দেশ জনশক্তি নেয়ায় আগ্রহ দেখালেও এর সুফল এখনও পাওয়া যায়নি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে ১০ লাখের মতো বাংলাদেশী কমর্রত রয়েছেন। ২০১১ সালে দেশটিতে ২ লাখ ৮২ হাজার ৭৩৯ জন বাংলাদেশী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে কর্মী গেছেন ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২। কিন্তু ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশটির শ্রমবাজার। ২০০৭ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতের শ্রমবাজার। দেশটিতে দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত বাজারটি উন্মুক্ত হয়নি। একই অবস্থা বাহরাইন, লেবানন, ওমান ও জর্দানেও।

বিএমইটি সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ বাংলাদেশী কর্মী বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হওয়ার পর জনশক্তি রফতানির হারও কমে গেছে। ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৪, ২০১০ সালে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২, ২০১১ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২, ২০১২ সালে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ এবং ২০১৩ সালে ৪ লাখ ৯ হাজার ২৫৩ কর্মী বিদেশে গেছেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৯৮ কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় লাখের মতো কর্মী বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন।